ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে টানা ১১ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে রেডিওথেরাপি সেবা। এতে চমর দুর্ভোগে পড়েছে ওই অঞ্চলের ক্যান্সার রোগীরা। তাদেরকে চিকিৎসার জন্য ছুটতে হচ্ছে ঢাকায়। এতে বাড়তি যাতায়াত ও চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ সামলাতে গিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে অসংখ্য পরিবার। অর্থাভাবে অনেক রোগী সময়মতো রেডিওথেরাপি নিতে না পারায় জটিল হচ্ছে রোগ, হারাচ্ছেন সুস্থ হওয়ার মূল্যবান সুযোগ।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সাল থেকে রেডিওথেরাপি বিভাগের মেশিন বিকল হয়ে পড়ে। এরপর থেকে সেটি আর সচল করা সম্ভব হয়নি। নতুন ভবন নির্মাণ শেষে অত্যাধুনিক রেডিওথেরাপি ইউনিট চালুর পরিকল্পনা থাকলেও নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় এখনো সেবা চালু করা যায়নি।

ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরপাড়া এলাকার ক্যান্সার রোগী সুফিয়া বেগমের স্বামী সজল আলী (৫৫) বলেন, স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য নিয়মিত ঢাকায় নিতে হচ্ছে। প্রতিবার যাতায়াত, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে পরিবারকে আর্থিক সংকটে পড়তে হয়েছে। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় চারবার ঢাকায় নিয়েছি। প্রতিবার প্রায় ২০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। গরিব মানুষের পক্ষে এই ব্যয় বহন করা খুবই কষ্টকর।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান মুক্তাগাছা উপজেলার রায়খোলা এলাকার বাসিন্দা রায়হান। তিনি বলেন, তার বাবার ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় গিয়ে রেডিওথেরাপি নিতে হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যাতায়াত ও চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে পরিবারের ছয়টি গরু পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। তিনি বলেন, মাকে রেডিওথেরাপি দিতে হবে। আমরা মধ্যবিত্ত পরিবার। ঢাকায় যাওয়া-আসা ও চিকিৎসার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। যদি ময়মনসিংহেই সেবা চালু থাকত, তাহলে অনেক কষ্ট কম হতো।

হাসপাতালের চিকিৎসকদের ভাষ্য, ক্যান্সারের অনেক রোগীর অস্ত্রোপচারের পর রেডিওথেরাপি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো এই চিকিৎসা না পেলে রোগীর জটিলতা বাড়তে পারে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে বিভাগটি চালু হওয়ার পর প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ জন রোগী রেডিওথেরাপি সেবা নিতেন। পরে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা বাড়ায় প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ জন রোগী বিভাগের বহির্বিভাগে আসতেন। এর মধ্যে ৮ থেকে ২০ জন রোগীর রেডিওথেরাপির প্রয়োজন হতো। বর্তমানে সেই রোগীদের প্রায় সবাইকে ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।

রেডিওথেরাপি বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. আহমেদ জাবির বলেন, প্রায় ১১ বছর ধরে রেডিওথেরাপি সেবা বন্ধ রয়েছে। এতে রোগীদের দুর্ভোগ অনেক বেড়েছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭০০ শয্যার ক্যান্সার ইনস্টিটিউট নির্মাণের কাজ চলছে। ২০২১ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্প ২০২৩ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে ১৩ তলা ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। পূর্ত বিভাগের কাজ শেষ হলে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে। এরপর রেডিওথেরাপিসহ আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসা সেবা চালু করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, ময়মনসিংহ বিভাগের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উন্নত ক্যান্সার চিকিৎসার অপেক্ষায় আছেন। প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ হলে রোগীদের আর ঢাকামুখী হতে হবে না।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. জাকির হোসেন বলেন, নির্মাণাধীন ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের কাজ শেষ হলেই রেডিওথেরাপি সেবাসহ পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার চিকিৎসা কার্যক্রম চালু করা যাবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ধীরগতির কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে। তবে দ্রুত কাজ শেষ করে রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

হোসাইন সুলভ/কেএইচকে/জেআইএম