মোশন সিকনেস বা গতিজনিত অসুস্থতা একটি সাধারণ সমস্যা, যা গাড়ি, বাস, ট্রেন, নৌকা বা বিমানে ভ্রমণের সময় অনেকের হয়ে থাকে। এটি সাধারণত প্রাণঘাতী না হলেও ভ্রমণকে অত্যন্ত অস্বস্তিকর করে তোলে। অনেকেই এ কারণে ভ্রমণ এড়িয়ে চলেন বা ভ্রমণের আগে মানসিক চাপ অনুভব করেন। তবে সঠিক জ্ঞান, কিছু প্রস্তুতি এবং কিছু অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে এ সমস্যা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিরোধ করা সম্ভব। লিখেছেন ডা. নাজমা আক্তার
* মোশন সিকনেস কী
মোশন সিকনেস হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে মস্তিষ্ক, চোখ, কানের ভেতরের ভারসাম্য ব্যবস্থা (inner ear) এবং শরীরের অন্যান্য সেন্সরি সিগন্যালের মধ্যে অসামঞ্জস্য হয়। যখন আপনি চলন্ত গাড়ি বা নৌকায় থাকেন তখন আপনার চোখ চলাচল অনুভব করে কিন্তু শরীর স্থির মনে হতে পারে। আবার ভেস্টিবুলার সিস্টেম (inner ear) নড়াচড়া অনুভব করে। এ ‘মিসম্যাচ’ থেকেই মোশন সিকনেস হয়।
* কারণ
মূল কারণ হলো মস্তিষ্কে সেন্সরি তথ্যের অসামঞ্জস্য। শিশু ও গর্ভবতীরা তুলনামূলক বেশি সংবেদনশীল। কিছু মানুষের inner ear বেশি সংবেদনশীল থাকে। তবে কিছু নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে যেমন : গাড়িতে বই পড়া বা মোবাইল দেখা এ সমস্যা বাড়াতে পারে। দীর্ঘ সময় চলাচল করলে এ ঝুঁকি বাড়ে। এমনকি উদ্বেগ বা ভয় মোশন সিকনেস বাড়াতে পারে।
* মোশন সিকনেসের লক্ষণ
মোশন সিকনেস সাধারণত ধীরে ধীরে শুরু হয়। সাধারণ লক্ষণ যেমন-মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব বা বমি, ঠান্ডা, মাথাব্যথা, দুর্বলতা, অতিরিক্ত লালা ঝরা, ক্লান্তি ইত্যাদি।
* মোশন সিকনেস প্রতিরোধের প্রস্তুতি
▶ ভ্রমণের আগে কিছু প্রস্তুতি নিলে মোশন সিকনেস অনেকাংশে কমানো যায়
▶ হালকা খাবার খান : ভ্রমণের আগে ভারী, তেলযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন
▶ পর্যাপ্ত ঘুমান : ঘুম কম হলে মোশন সিকনেস বাড়ে
▶ খালি পেটে ভ্রমণ করবেন না : হালকা খাবার খেয়ে বের হন
▶ অ্যালকোহল ও ধূমপান এড়িয়ে চলুন : এগুলো উপসর্গ বাড়াতে পারে।
* ভ্রমণের সময় করণীয়
▶ সঠিক আসন নির্বাচন করুন : ব্যক্তিগত গাড়িতে সামনের সিট, বাসে জানালার পাশে, নৌকায় মাঝামাঝি অংশ ও বিমানে ডানার কাছাকাছি সিট নির্বাচন করুন।
▶ দিগন্তের দিকে তাকান : চোখ স্থির রাখলে মস্তিষ্কের সিগন্যাল স্থিতিশীল থাকে।
▶ মোবাইল বা বই পড়া এড়িয়ে চলুন : চলন্ত অবস্থায় পড়াশোনা করলে সমস্যা বাড়ে।
▶ মাথা স্থির রাখুন : অতিরিক্ত নড়াচড়া এড়িয়ে চলুন।
▶ তাজা বাতাস নিন : সম্ভব হলে জানালা খুলে বাতাস নিলে উপকার পাওয়া যায়।
* প্রাকৃতিক উপায়ে মোশন সিকনেস মোকাবিলা
আদা মোশন সিকনেস কমাতে কার্যকর। আদা চা, আদা ক্যান্ডি বা কাঁচা আদা চিবানো বমি ভাব কমাতে সাহায্য করে। পুদিনা পাতা ও লেবুর গন্ধ বা রস অনেক সময় বমি ভাব কমায়। ধীরে ধীরে শ্বাস নিলে মাথা স্থির থাকে ও বমি ভাব কমায়।
* মেডিকেল চিকিৎসা ও ওষুধ
যদি মোশন সিকনেস বেশি হয়, চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ ব্যবহার করা যায়। এ ওষুধগুলো ঘুম ঘুম ভাব তৈরি করতে পারে, তাই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করা উচিত নয়।
* দীর্ঘ ভ্রমণের জন্য বিশেষ টিপস
▶ বিরতি নিন : দীর্ঘ যাত্রায় মাঝে মাঝে বিরতি নিন।
▶ পানি পান করুন : ডিহাইড্রেশন এড়ান।
▶ ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন।
* মোশন সিকনেস প্রতিরোধের মানসিক কৌশল
▶ মন শান্ত রাখুন, কারণ উদ্বেগ বাড়লে সমস্যা বাড়ে।
▶ ভ্রমণকে স্বাভাবিকভাবে নিন ও ভয় না পেয়ে স্বাভাবিক থাকুন।
▶ গান শুনুন কারণ হালকা সংগীত মনকে শান্ত রাখে।
* কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
বারবার বমি হলে, পানিশূন্যতা হলে, ভ্রমণ ছাড়াও মাথা ঘোরালে আর খুব দুর্বল লাগলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
* সাধারণ ভুল ধারণা (Myths vs Facts)
▶ ভুল ধারণা : শুধু শিশুদের হয়
▶▶ সত্য : মোশন সিকনেস যে কোনো বয়সে হতে পারে।
▶ ভুল ধারণা : এটি গুরুতর রোগ
▶▶ সত্য : এটি সাধারণত বিপজ্জনক নয়।
▶ ভুল ধারণা : একমাত্র ওষুধেই সমাধান।
▶▶ সত্য : আচরণ পরিবর্তনেও মোশন সিকনেস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব
মোশন সিকনেস একটি সাধারণ কিন্তু বিরক্তিকর সমস্যা, যা সঠিক সচেতনতা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ভ্রমণের আগে প্রস্তুতি, ভ্রমণের সময় সঠিক অভ্যাস এবং প্রয়োজনে প্রাকৃতিক বা চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করলে এ সমস্যা থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম বিভাগ, মার্কস মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা।








