প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে বিশাল এক গ্রহাণুর আঘাতেই পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে গিয়েছিল অতিকায় ডাইনোসরদের রাজত্ব। সৌরজগতে এখনো ওঁত পেতে ঘুরে বেড়াচ্ছে এমন হাজারো প্রাণঘাতী গ্রহাণু। যেকোনো মুহূর্তে সামান্য কক্ষচ্যুত হয়ে এর কোনোটি যদি পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ে, তবে আবারও নিমিষেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে আমাদের এই চিরচেনা পৃথিবী! কিন্তু এদের আঘাতে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা কতটা? শুধুই কি গ্রহাণু, নাকি মহাকাশে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর আরও কোনো গুপ্তঘাতক?

এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফিলিপ প্লেইট তাঁর ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড বইয়ে। সূক্ষ্ম রসিকতা ও নিখাদ বিজ্ঞানের দারুণ মিশেলে লেখা রোমাঞ্চকর এই বইয়ের কিছু অধ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে বিজ্ঞানচিন্তায়। প্রথম অধ্যায় অনুবাদ করছেন ইশতিয়াক হোসেন চৌধুরী। আজ পড়ুন প্রথম অধ্যায়ের অষ্টম পর্ব।

মৃত্যুদূতের নাম গ্রহাণু – ৭

প্রিয় পাঠক, কখনো বি৬১২ ফাউন্ডেশনের নাম শুনেছেন? ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক এই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে বিশ্ববিখ্যাত ফরাসি রূপকথা দ্য লিটল প্রিন্স-এর কেন্দ্রীয় চরিত্রের এক কাল্পনিক গ্রহাণুর নাম অনুসারে। ২০০২ সালে নাসার সাবেক নভোচারী এড লু এবং রাস্টি শোয়েকার্টের হাত ধরে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও সাবেক নভোচারীদের সমন্বয়ে গঠিত সংস্থাটিতে বর্তমানে মোট সদস্যসংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি। এর মূল লক্ষ্য হলো গ্রহাণু বা ধূমকেতুর মতো মহাজাগতিক বস্তুর আঘাত থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করার কার্যকর কৌশল খোঁজা।

বি৬১২ ফাউন্ডেশনের ওয়েবপেজে একবার ঢুঁ মারলে যে কেউই অবাক হতে বাধ্য। সেটি গ্রহাণুর আগ্রাসন রুখে দেওয়ার নানা বিজ্ঞানভিত্তিক আইডিয়ায় ভরপুর। অধিকাংশ আইডিয়াকে কল্পবিজ্ঞানের মতো শোনালেও কিছু কিছু কৌশল আমাদের বর্তমান প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সঙ্গে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ রকেট ব্যবহারের কথা বলা যেতে পারে। এতে সফল হতে গেলে আমাদের প্রথমেই গ্রহাণুর বুকে নিরাপদে একটি রকেট অবতরণ করাতে হবে। অতঃপর নিয়মিত বিরতিতে এর ইঞ্জিন চালু করে নিচের দিকে বা পৃষ্ঠে শক্তিশালী ধাক্কা দিতে হবে। হাতে যথেষ্ট সময় নিয়ে বছরের পর বছর এই একই কাজ করে যেতে থাকলে ধীরে ধীরে মহাজাগতিক বস্তুটি নতুন কক্ষপথে সরে আসবে। আর মহাবিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পাবে মহাবিশ্বে আমাদের একমাত্র ঠিকানা—পৃথিবী!

গ্রহাণুর নিজস্ব আহ্নিক গতিও কৌশলটি কার্যকরের পথে বিশাল এক বাধা। এদের প্রায় সব কটিই সূর্য বা অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তুকে কেন্দ্র করে পথ চলার পাশাপাশি নিজ অক্ষের ওপরও ঘুরতে থাকে।

পারমাণবিক বোমা বা ভারী বস্তুর মতো দুটি বিস্ফোরণের ঝামেলা এড়ানো যায় বলে এতদিনের আলোচিত সবগুলো কৌশলের মধ্যে একেই নিরাপদতম ভাবা যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একে সত্যি সত্যি কাজে লাগানো ভীষণ কঠিন। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রকেটকে গ্রহাণুর বুকে ঠিকঠাক অবতরণ করানো। সেখানকার পৃষ্ঠ অমসৃণ বা পাউডারের মতো গুঁড়ো গুঁড়ো হলে গোড়াতেই ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। অন্যদিকে গ্রহাণুর নিজস্ব আহ্নিক গতিও কৌশলটি কার্যকরের পথে বিশাল এক বাধা। এদের প্রায় সব কটিই সূর্য বা অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তুকে কেন্দ্র করে পথ চলার পাশাপাশি নিজ অক্ষের ওপরও ঘুরতে থাকে। এ কারণে আমরা যদি এলোমেলোভাবে বা একটানা রকেটের ইঞ্জিন চালু রাখি, তাহলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। কক্ষপথ বদলাতে হলে ঘড়ির কাঁটা ধরে নির্দিষ্ট দিকে শক্তিশালী ধাক্কা দেওয়া দরকার। অর্থাৎ সফলতা পেতে হলে বেশ খানিকটা সময় হাতে নিয়ে আটঘাট বেঁধে মাঠে নামার বিকল্প নেই।

অবশ্য গ্রহাণুরা যদি নিজ অক্ষের ওপর বিশৃঙ্খল বা অনিয়মিতভাবে ঘূর্ণায়মান থাকে, তাহলে কোনো ফন্দিই কাজে আসবে না। তাত্ত্বিকভাবে যেকোনো গ্রহাণুতেই এমনটা ঘটতে পারে। তবে ছোট ও অনিয়মিত আকৃতির হলে, বিশেষ করে ছয় মাইলের কম আকৃতির গ্রহাণুতে এই সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পায়। পার্শ্ববর্তী গ্রহের শক্তিশালী মহাকর্ষ বলের প্রভাব, নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ, ইয়র্প ইফেক্ট ইত্যাদি নানা কারণে এমন ঘটনার সূত্রপাত হতে পারে।১ অবশ্য এ নিয়ে আপাতত খুব বেশি চিন্তিত না হলেও চলবে। কারণ, দেড় মিলিয়নেরও বেশি মহাজাগতিক বস্তু পর্যবেক্ষণ করে এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে মাত্র শ দুয়েক বিশৃঙ্খল ঘূর্ণনবিশিষ্ট গ্রহাণুর সন্ধান পাওয়া গেছে।

আমরা যদি এলোমেলোভাবে বা একটানা রকেটের ইঞ্জিন চালু রাখি, তাহলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। কক্ষপথ বদলাতে হলে ঘড়ির কাঁটা ধরে নির্দিষ্ট দিকে শক্তিশালী ধাক্কা দেওয়া দরকার।

সমস্যাগুলো সম্পর্কে বি৬১২ ফাউন্ডেশনের সদস্যরাও ওয়াকিবহাল ছিলেন। এদের পাশ কাটাতে তাঁরা এক অদ্ভুত প্রস্তাব করে বসেন! কেমন হবে, যদি গ্রহাণুর বুকে রকেট অবতরণ না করিয়েই কক্ষপথ পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়?

ভরের বিচারে গ্রহাণুর চেয়ে যোজন যোজন ব্যবধানে পিছিয়ে আছে রকেট। শত মিটার ব্যাসের একটি গতানুগতিক গ্রহাণুর ভর হতে পারে প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টন। অন্যদিকে স্পেসএক্সের বিখ্যাত পুনঃব্যবহারযোগ্য ফ্যালকন ৯ রকেটের ভর মাত্র ৫৫০ টন। আর অরবিটার, জ্বালানি ট্যাংক ও বুস্টারসহ কলম্বিয়া বা ডিসকভারির মতো নাসার স্পেস শাটলের সম্পূর্ণ সেটের ভর প্রায় দুই হাজার টন। অর্থাৎ গ্রহাণুর তুলনায় তা প্রায় ৬৫০ গুণ কম!

স্পেসএক্সের বিখ্যাত পুনঃব্যবহারযোগ্য ফ্যালকন ৯ রকেটের ভর মাত্র ৫৫০ টন

সাংখ্যিক মানে আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকলেও এই কম ভরই মহাশূন্যে বড় প্রভাব ফেলার ক্ষমতা রাখে। ধরুন, একটি রকেটকে গ্রহাণুর বেশ কাছে স্থির ভাসমান অবস্থায় রাখা হলো। এ সময়ে সরাসরি সংস্পর্শ না থাকলেও মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে এরা ঠিকই অদৃশ্য বাঁধনে বাধা থাকবে এবং তখন এরা উভয়েই অন্যকে নিজের দিকে টানতে থাকবে। বহুগুণ বেশি ভরের দরুন বাইরে থেকে কলকাঠি না নাড়ালে টানাটানির এই যুদ্ধে শেষ হাসিটা যে গ্রহাণুই হাসবে, তা একদম নিশ্চিত।

শত মিটার ব্যাসের একটি গতানুগতিক গ্রহাণুর ভর হতে পারে প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টন। অন্যদিকে স্পেসএক্সের বিখ্যাত পুনঃব্যবহারযোগ্য ফ্যালকন ৯ রকেটের ভর মাত্র ৫৫০ টন।

কিন্তু আমরা যদি রকেটের ইঞ্জিনকে চালু করে ক্রমাগত পাল্টা ধাক্কা সৃষ্টি করি, তাহলে বদলে যাবে সব হিসাব-নিকাশ। তখন আসলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা পড়বে। স্বল্প মেয়াদে রকেটের গ্রহাণুর পৃষ্ঠমুখী পতন থমকে যাবে। বছরের পর বছর ধরে একই কাজ করে যেতে পারলে দীর্ঘ মেয়াদে গ্রহাণুটির গতিবেগে খুব সামান্য হলেও পরিবর্তন আসবে; প্রতি সেকেন্ডে তা হয়তো কয়েক মিলিমিটার হতে পারে। তবে একে পৃথিবী থেকে হাজার হাজার মাইল দূরের কক্ষপথে ঠেলে দিতে এটুকুই যথেষ্ট! কোনো ধরনের বিস্ফোরণ ও এর আনুষঙ্গিক ঝামেলা ছাড়াই গ্রহাণুর গতিপথ পরিবর্তনের চমৎকার এই কৌশলটির আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হয়েছে গ্র্যাভিটি ট্রাক্টর।

গ্র্যাভিটি ট্রাক্টর কৌশলের মূলনীতি

ভালো কথা, এই কৌশলে সফলতা পেতে হলে একটি বিষয় নিয়ে খুব সতর্ক থাকতে হবে। রকেটের ইঞ্জিন থেকে নির্গত গ্যাস যেন কোনোভাবেই সরাসরি গ্রহাণুর গায়ে না লাগে। নয়তো গ্যাসগুলোর ধাক্কায় মহাকর্ষীয় টানের প্রভাব নাকচ হয়ে যাবে। এই সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞানীরা মহাকাশযানের রকেটের থ্রাস্টারগুলোকে কিছুটা বাঁকানোর পরামর্শ দিয়েছেন। এতে অবশ্য ইঞ্জিনের কার্যকারিতা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা কমে যাবে। কিন্তু কী আর করা! কিছু পেতে হলে তো কিছু হারাতেই হয়।

নিরেট পাথর বা পাথরের স্তূপ—উভয় ধরনের গ্রহাণুকেই টেনে সরাতে সমান পারদর্শী এই গ্র্যাভিটি ট্রাক্টর। তবে এখানেও বেশ কিছু সময়ের দরকার। ১০ বা ২০ বছর হাতে থাকলে ছোট বা মাঝারি আকারের মহাজাগতিক বস্তুর বিরুদ্ধে সফলতার হার প্রায় শতভাগ। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠে, শেষ মুহূর্তে কৌশলটি প্রায় অচল।

কোনো ধরনের বিস্ফোরণ ও এর আনুষঙ্গিক ঝামেলা ছাড়াই গ্রহাণুর গতিপথ পরিবর্তনের চমৎকার কৌশলটির আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হয়েছে গ্র্যাভিটি ট্রাক্টর।

অবশ্য ৯৯৯৪২ অ্যাপোফিসের মতো বস্তুদের নির্দিষ্ট কী-হোল থেকে দূরে রাখতে দুই-এক বছরই যথেষ্ট। বিশাল আকারের গ্রহাণু এবং যাদের সঙ্গে পৃথিবীর সরাসরি সংঘর্ষ ঘটার নিশ্চিত সম্ভাবনা থাকবে, সেগুলোর গতিপথ এই কৌশলে পরিবর্তনে বাড়তি আয়োজনের দরকার। এর নাম দেওয়া হয়েছে এনহ্যান্সড গ্র্যাভিটি ট্রাক্টর।

মূল কৌশলের এই উন্নততর সংস্করণে রোবোটিক আর্ম ব্যবহার করে স্বয়ং টার্গেট গ্রহাণুর বুক থেকে পাথরখণ্ড সংগ্রহ করে প্রথমে নভোযানের ভর বাড়িয়ে নেওয়া হবে। মাত্র কয়েক টন ওজনের একটি পাথরের বাড়তি উপস্থিতিতে গ্রহাণুকে আগের চেয়ে ৫০ গুণ বা তারও বেশি শক্তিতে টানা সম্ভব হয়। এভাবে মিশন সফল করার প্রয়োজনীয় সময়কালও নাটকীয়ভাবে কমানো যায়। অ্যাস্টেরয়েড রিডাইরেক্ট মিশনের আওতায় নাসা কৌশলটিকে হাতে-কলমে যাচাই করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ২০১৭ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন তা বাতিল করে দেয়। মূলত মিশনের উচ্চ ব্যয় এবং মার্কিনীদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েনই এর পেছনে দায়ী ছিল।

যাহোক, গ্রহাণুদের বশে আনতে অনেক বিজ্ঞানী এখন একাধিক গ্র্যাভিটি ট্রাক্টরের যুগপৎ প্রয়োগ বা অন্যান্য পদ্ধতির সঙ্গে এর সমন্বয়ের কথা বেশ জোরেশোরেই ভাবছেন। অর্থাৎ প্রথমে বিস্ফোরণের ধাক্কায় গ্রহাণুকে সর্বোচ্চ বিপদের এলাকা থেকে অপসারণ করে, অতঃপর অদৃশ্য মহাকর্ষ বলের টানে এদেরকে ধীরে ধীরে এমন কক্ষপথে আনা হবে, যেন কী-হোলের পাল্লায় পড়ে কয়েক বছর পরেই পুনরায় এহেন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়। নিঃসন্দেহে এটি একটি চমৎকার আইডিয়া। তবে বাস্তব দুনিয়ায় এগুলো কতটুকু সফলতার সঙ্গে কাজ করে, এখন সেটাই যাচাই করে দেখার পালা।

অ্যাস্টেরয়েড রিডাইরেক্ট মিশনের আওতায় নাসা কৌশলটিকে হাতে-কলমে যাচাই করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ২০১৭ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন তা বাতিল করে দেয়।

প্রিয় পাঠক, এতক্ষণ গ্রহাণুদের তুলোধোনা করার পর এবারে চলুন তাদের একটু সুনাম (!) করা যাক। সত্যি বলতে এগুলো বেশ ভদ্র স্বভাবের। হুটহাট এদিক-সেদিক ছুট লাগায় না। এরা সাধারণত নির্দিষ্ট এবং অনুমেয় কক্ষপথ ধরে সূর্য বা অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তুকে প্রদক্ষিণ করতে থাকে। একবার এদের গতিপথ সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারলে জ্যোতির্বিদেরা অনায়াসেই কয়েক দশক পরের অবস্থানও নিখুঁতভাবে বলে দিতে পারেন। আর ঠিক এই দিক দিয়েই সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম হলো আমাদের সৌরজগতের আরেক দল ভয়ংকর সুন্দর বস্তু—ধূমকেতু!

ধূমকেতুরা কিন্তু গ্রহাণুদের মতো কেবল নিরেট পাথরের খণ্ড বা স্তূপ নয়; বরং এরা অনেকটা নোংরা তুষারকণার মতো। পাথর, ধূলিকণা আর বরফ জমে তৈরি হওয়া এই বস্তুগুলো যখনই সূর্যের কাছাকাছি আসে, তখনই শুরু হয় আসল খেলা! প্রচণ্ড উত্তাপে এদের পৃষ্ঠের নিচে জমে থাকা বরফ সরাসরি গ্যাসে রূপান্তরিত হয়ে তীব্র বেগে বেরিয়ে আসতে শুরু করে। ঘটনাটিকে রকেট ইঞ্জিন থেকে গ্যাস নির্গমনের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।

ধূমকেতুরা কিন্তু গ্রহাণুদের মতো কেবল নিরেট পাথরের খণ্ড বা স্তূপ নয়; বরং এরা অনেকটা নোংরা তুষারকণার মতো

এর প্রভাবে তৈরি হওয়া এক অদৃশ্য ধাক্কায় বস্তুগুলো নিজের ভারসাম্যপূর্ণ কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়। মজার ব্যাপার হলো, সব ধূমকেতুই নিজের অক্ষের ওপর লাটিমের মতো ঘুরতে থাকায় এহেন ধাক্কা যে এদের ঠিক কোন দিকে ঠেলে দেবে, তা আগাম অনুমান করা অসম্ভব। ফলে গ্রহাণুদের মতো এদের কক্ষপথ সম্পর্কে আগাম ভবিষ্যদ্বাণী করা, পৃষ্ঠে রকেট অবতরণ করানো অথবা গ্র্যাভিটি ট্রাক্টরের মতো সূক্ষ্ম কৌশল প্রয়োগ করে গতিপথ বদলে দেওয়া বিজ্ঞানীদের জন্য প্রায় অলঙ্ঘনীয় এক বাধা।

প্রচণ্ড উত্তাপে ধূমকেতুর পৃষ্ঠের নিচে জমে থাকা বরফ সরাসরি গ্যাসে রূপান্তরিত হয়ে তীব্র বেগে বেরিয়ে আসতে শুরু করে। ঘটনাটিকে রকেট ইঞ্জিন থেকে গ্যাস নির্গমনের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।

বিপদ এখানেই শেষ নয়। আমাদের সৌরজগৎকে যদি একটি চ্যাপ্টা ডিভিডি ডিস্কের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে গ্রহ এবং প্রায় সব গ্রহাণু সাধারণত সেই ডিস্কের একই তলে গতিশীল থেকে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। এ কারণে এগুলোকে খুঁজে বের করতে হলে আকাশের নির্দিষ্ট কিছু অংশে নজর রাখলেই যথেষ্ট। কিন্তু ধূমকেতুদের বেলায় এই তত্ত্ব অচল। মোটা দাগে এদের পথচলা কোনো নির্দিষ্ট তলে আবদ্ধ নয়।

পর্যায়কালের ওপর ভিত্তি করে ধূমকেতুদের মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়—স্বল্প পর্যায়কালের ধূমকেতু এবং দীর্ঘ পর্যায়কালের ধূমকেতু। প্রথম শ্রেণির সদস্যরা ২০০ বছরের কম সময়ের মধ্যে একবার পূর্ণ চক্র সম্পন্ন করে। সৌরজগতের এক রহস্যময় স্থান কুইপার বেল্ট থেকে সাধারণত এদের আগমন ঘটে। এগুলোকে আবার দুটি উপশ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে—জুপিটার ফ্যামিলি কমেট ও হ্যালি-টাইপ কমেট।

নাম শুনেই নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে, প্রথম দলের ধূমকেতুগুলোর ওপর মহাকর্ষ বল দিয়ে ছড়ি ঘোরায় গ্রহরাজ বৃহস্পতি।২ সাধারণত ২০ বছরের কম সময়ে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করা এই মহাজাগতিক বস্তুগুলোর কক্ষপথের নতি তুলনামূলকভাবে কম, গড়ে ১৮ ডিগ্রির কাছাকাছি। এরা সাধারণত গ্রহের সঙ্গে একই অভিমুখে ঘোরে।

পর্যায়কালের ওপর ভিত্তি করে ধূমকেতুদের মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়—স্বল্প পর্যায়কালের ধূমকেতু এবং দীর্ঘ পর্যায়কালের ধূমকেতু।

অন্যদিকে হ্যালি-টাইপ ধূমকেতুদের বেলায় এই মান ০ থেকে ১৮০ ডিগ্রির মধ্যে যেকোনো মানের হতে পারে। এই শ্রেণির বহু সদস্য গ্রহগুলোর গতির বিপরীত দিক থেকে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। মোটামুটি একই অবস্থা দীর্ঘ পর্যায়কালের ধূমকেতুদের বেলায়ও। সৌরজগতের শেষ সীমানা তথা ওর্ট ক্লাউড থেকে আসা এই বস্তুগুলোর পর্যায়কাল ২০০ বছর থেকে শুরু করে কয়েক লাখ বছর পর্যন্ত হতে পারে। এদের কক্ষপথের নতিও হয় যেকোনো মানের। মহাকাশের যেকোনো দিক থেকে আবির্ভূত হতে পারে বলে নতির কোনো গড় মান নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। আসলে গাণিতিকভাবে এদের বিন্যাস আইসোট্রপিক, অর্থাৎ মহাকাশের সব দিকে ছড়িয়ে থাকার সম্ভাবনা সমান।

পরের ছবি দুটিতে বিভিন্ন শ্রেণির ধূমকেতুদের কক্ষপথ সম্পর্কে খানিকটা ধারণা দেওয়া হয়েছে। কোনো রকম পূর্বসতর্কতা না দিয়ে আকাশের যেকোনো প্রান্ত থেকে অতর্কিতে হানা দিতে পারে বলে এগুলোকে মহাকাশের ওয়াইল্ড কার্ড আখ্যা দিলেও একবিন্দু বাড়িয়ে বলা হবে না।

হরেক রকম ধুমকেতুর কক্ষপথ
হরেক রকম ধুমকেতুর কক্ষপথ

গ্রহাণুর আঘাত সম্পর্কে আমরা হয়তো কয়েক দশক আগে থেকে সতর্কবাণী পেতে পারি, কিন্তু একটি ঘাতক ধূমকেতুর ক্ষেত্রে হাতে সময় থাকতে পারে মাত্র কয়েক বছর! উদাহরণ হিসেবে কালজয়ী ধূমকেতু হেল-বপ-এর কথা বলা যেতে পারে। লাখ লাখ মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করা উজ্জ্বল এই মহাজাগতিক বস্তুটি পৃথিবীর পাশ দিয়ে যাওয়ার মাত্র বছর দুয়েক আগে আবিষ্কৃত হয়েছিল। প্রায় ২৫ মাইল ব্যাসের নিউক্লিয়াসবিশিষ্ট এই দানব যদি সরাসরি পৃথিবীকে লক্ষ্য করে ধেয়ে আসত, তাহলে আমাদের করার কিছুই থাকত না। ডাইনোসরদের যমদূত চিক্সুলুব ইমপ্যাক্টরের আঘাতকেও তখন এটির সামনে নিছক আতশবাজি ফোটার মতো মনে হতো!

সৌরজগতের শেষ সীমানা তথা ওর্ট ক্লাউড থেকে আসা এই দীর্ঘ পর্যায়কালের ধূমকেতুগুলোর পর্যায়কাল ২০০ বছর থেকে শুরু করে কয়েক লাখ বছর পর্যন্ত হতে পারে।

অবশ্য স্বস্তির বিষয় হলো, হাজার হাজার নিও এবং পিএইচও-এর ভিড়ে ধূমকেতুগুলোর পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়, সব মিলিয়ে হয়তো কয়েক শতাংশ। তবুও এদের অনিশ্চিত স্বভাব ও অবিশ্বাস্য গতিবেগ বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলার জন্য যথেষ্ট। কারণ, মহাজাগতিক দাবা খেলায় একটি ভুল চালের মানেই হতে পারে মানবসভ্যতার চিরস্থায়ী প্রস্থান!

টীকা

১. ইয়র্প বা ইয়ারকভস্কি–ওকিফ–রাদজিভস্কি–প্যাড্যাক ইফেক্ট হলো এক বিশেষ প্রভাব, যাতে সূর্যের আলো পুঁজি করে ছোট গ্রহাণুর ঘূর্ণনগতি ও অক্ষের অবস্থান পরিবর্তিত হয়। এগুলো ক্রমাগত আলো শোষণ করে উত্তপ্ত হয় এবং পরে অবলোহিত রশ্মি হিসেবে সেই তাপ বাইরে ছেড়ে দেয়। অসম আকারের গ্রহাণুতে সব দিক থেকে তাপের নির্গমন সমান হয় না। ফলে মাইক্রোস্কপিক থ্রাস্ট বা আণুবীক্ষণিক ধাক্কা সৃষ্টি হয়। এটুকুই ছোট গ্রহাণুর অক্ষের অবস্থান পরিবর্তনে যথেষ্ট।

২: গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ৪০০ বছরে অন্তত একটি জুপিটার ফ্যামিলি কমেট বৃহস্পতিতে আঘাত করে।

চলবে…

ফিলিপ প্লেইট, ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড অবলম্বনে

মৃত্যুদূতের নাম গ্রহাণু - ১মৃত্যুদূতের নাম গ্রহাণু – ২মৃত্যুদূতের নাম গ্রহাণু – ৩মৃত্যুদূতের নাম গ্রহাণু – ৪মৃত্যুদূতের নাম গ্রহাণু – ৫মৃত্যুদূতের নাম গ্রহাণু – ৬মৃত্যুদূতের নাম গ্রহাণু – ৭