নদী শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত সত্তা। কথাটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন মো. মনির হোসেন। এই বিশ্বাস থেকেই নদী ও পরিবেশ বিষয়ে শিক্ষাবিস্তার, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নদীর প্রতি মমত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে কাজ করছেন তিনি। সেই ধারাবাহিক প্রয়াসের স্বীকৃতিও মিলেছে। পেয়েছেন জাতীয় পরিবেশ পদক-২০২৫।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় গত ৭ জুন এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা ও প্রচার (ব্যক্তিগত পর্যায়) বিভাগে পদকের জন্য মনোনীত হন মনির হোসেন। তিনি বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের প্রতিষ্ঠাতা। 

পেশায় শিক্ষক মনির হোসেন ২০০৯ সাল থেকে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নদী-জলাধার রক্ষার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। পাশাপাশি করছেন নদী, পরিবেশ ও পর্যটনবিষয়ক কাগজ ‘নদীকাহন’ সম্পাদনা। নদীর প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই তিনি দেশ-বিদেশের প্রায় ২৫০টি নদী পরিদর্শন করেছেন। এই অভিযাত্রায় নদীতীরবর্তী প্রায় লক্ষাধিক মানুষের সঙ্গে সরাসরি কাজ করে নদী সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষায় জনসচেতনতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন তিনি। নদীর সংকট, সম্ভাবনা এবং টেকসই ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে তার অসংখ্য নিবন্ধ। 

তরুণদের নদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করতে কাজ করছেন মনির হোসেন। ৪৪ জেলায় সহস্রাধিক নদী সংরক্ষণকর্মী গড়ে তুলেছেন। ২০১৬ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে জাতীয় নদী সম্মেলন, জাতীয় নদী উৎসব, পার্বত্য নদী সম্মেলন এবং উপকূলীয় নদী সম্মেলন আয়োজন করে আসছেন তিনি।  এসব আয়োজন নদী বিষয়ে শিক্ষা, গবেষণা, জনসম্পৃক্ততা এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

প্রযুক্তিনির্ভর সচেতনতামূলক কার্যক্রমেও রয়েছে তার নতুনত্ব। তার উদ্ভাবিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘রিভার টক’ এবং তরুণদের জন্য বিশেষ পাঠচক্র ‘এসো নদীর গল্প শুনি’ ইতোমধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। পাশাপাশি রচনা, বক্তৃতা প্রতিযোগিতা এবং ইয়ং রিভার চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজনের মাধ্যমে তিনি নতুন প্রজন্মের মধ্যে নদীভিত্তিক নেতৃত্ব তৈরির কাজ করে চলেছেন। নদী নিয়ে কাজ করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মানিত ও উৎসাহিত করতে ২০২৪ সালে তিনি চালু করেন ‘মার্ক এঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড’। বিশ্ব নদী দিবসের প্রবর্তক নদী অধিকারকর্মী মার্ক এঞ্জেলোর নামে এই পুরস্কারের নামকরণ করা হয়।

গবেষণা, লেখালেখি ও দৃশ্যমান দলিল তৈরির ক্ষেত্রেও রয়েছে মনির হোসেনের উল্লেখযোগ্য অবদান। নদীর সংকট ও ইকোসিস্টেম নিয়ে তিনি রচনা করেছেন ‘গাজীপুরের নদী’, ‘পার্বত্য অঞ্চলের নদী’ এবং ‘নদী ও জলে ভ্রমণ’ শীর্ষক তিনটি গ্রন্থ। নির্মাণ করেছেন ১১টি প্রামাণ্যচিত্র। তার নির্মিত ‘শঙ্খ নদী: দ্য আমাজন অব বেঙ্গল’ প্রামাণ্যচিত্রটি ২০১৯ সালে ইউনিসেফ বাংলাদেশ-এর মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড লাভ করে।

জাতীয় পরিবেশ পদক-২০২৫ অর্জনের প্রতিক্রিয়ায় মো. মনির হোসেন বলেন, “যে কোনো পুরস্কার মানুষকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করে। একইসঙ্গে এটি কাজের পরিধি বাড়িয়ে দেয় এবং দায়িত্ববোধ আরও গভীর করে। এই স্বীকৃতি আমাকে নতুন করে অনুপ্রেরণা দিয়েছে। আমি যে কাজটি করে আসছি, সেটি আরও বিস্তৃতভাবে ও দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে নিতে চাই।”

“আমার মূল লক্ষ্য পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা ও তার ব্যাপক প্রচার, বিশেষ করে নদী বিষয়ক শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি। কারণ নদী বিষয়ক শিক্ষা না থাকলে যথাযথ জ্ঞান তৈরি হয় না, জ্ঞান না থাকলে দক্ষতা গড়ে ওঠে না, আর দক্ষতা না থাকলে সচেতনতা সৃষ্টি হয় না। সচেতনতা ছাড়া নদী ও পরিবেশ সংরক্ষণ সম্ভব নয়,” বলেন তিনি। 

নদীকে ঘিরে শিক্ষা, গবেষণা, জনসম্পৃক্ততা ও আন্দোলন-এই চারটি স্তম্ভকে একসঙ্গে ধারণ করে এগিয়ে চলা মো. মনির হোসেনের জাতীয় স্বীকৃতি শুধু একজন ব্যক্তির অর্জন নয়; এটি বাংলাদেশের নদী ও পরিবেশ আন্দোলনের দীর্ঘদিনের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।