দাদুর বাড়ির উঠানে একটা মাটির হাঁড়ি ছিল। হাঁড়ির তলাটা আগুনে পোড়ার কারণে কালো। পাশে রাখা এক মুঠ বালু। দাদু চুলায় বালু গরম করতেন, তারপর এর মধ্যে ছেড়ে দিতেন ভেজানো ধান। অল্প সময়ের মধ্যেই খোসা ফেটে বের হয়ে আসত খই। সাদা, ফোলা, গন্ধে ভরা। ছোটবেলায় এ দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হতাম। কিন্তু বুঝতাম না, কেন এ কাজের সঙ্গে এমন একটা বিদ্রূপের প্রবাদ জুড়ে গেল। ‘নেই কাজ তো খই ভাজ’। শুনলে মনে হয়, কেউ অলস বসে থাকা মানুষকে খোঁচা দিচ্ছে।
কিন্তু এই প্রবাদ শুনে যদি মনে হয় খই ভাজা একটা তুচ্ছ ও সহজ কাজ, তাহলে ভুল হবে। বরং সত্যিটা ঠিক উল্টো। খই ভাজা আসলে বেশ শ্রমসাধ্য আর সময়সাপেক্ষ একটা কাজ। বালুতে ফেলার আগে ধানকে প্রথমে ভেজাতে হয়, যাতে চালের ভেতর পর্যন্ত আর্দ্রতা পৌঁছে যায়। পুরোনো রীতিতে এই ভেজানোর কাজেই লাগত ৪০ থেকে ৭০ ঘণ্টা। পরে পদ্ধতি বদলে গরম পানিতে ভেজানোর চল শুরু হয়, তাতেও সময় লাগে ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা। তারপর আসে বালুতে ভাজার পর্ব, যেখানে তাপের সূক্ষ্ম ভারসাম্য বুঝতে হয়। বালু কম গরম হলে ধান ফাটবে না, বেশি গরম হলে পুড়ে যাবে। পুরো প্রক্রিয়ায় লাগে দীর্ঘ সময়, ধৈর্য আর অভিজ্ঞতা।
আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপের জার্সির পেছনে ১৮৯৩ লেখা কেনআর ঠিক এখানেই প্রবাদের আসল চাল। যে মানুষ অলস বসে থাকে, যার হাতে করার মতো কাজ নেই, তাকে ইচ্ছাকৃতভাবেই এমন একটা শ্রমসাধ্য কাজে ঠেলে দেওয়া হয়। এটা কোনো হালকা সময় কাটানো কাজ বলে বেছে নেওয়া হয়নি, বরং উল্টো। এমন একটা কাজ বেছে নেওয়া হয়েছে, যা অলস মানুষের শরীর আর মনকে দীর্ঘ সময় ব্যস্ত রাখবে। প্রবাদটার মধ্যে একটা চাপা শাস্তির সুরও আছে। তুমি যদি বসে বসে অলসতা করো, তাহলে তোমাকে এমন কিছুতে লাগিয়ে দেওয়া হবে, যা সহজে শেষ হবে না।
এই প্রবাদের সঠিক উৎপত্তি কখন বা কার মুখে প্রথম শোনা গিয়েছিল, তার কোনো প্রামাণ্য সূত্র নেই। বাংলার বেশির ভাগ প্রবাদের ক্ষেত্রেই এটা সত্য। মুখে মুখে ছড়িয়েছে, কেউ লিখে রাখেনি। কিন্তু গ্রামীণ কৃষিজীবনের প্রেক্ষাপটে এই প্রবাদ ভীষণ যুক্তিসংগত। যে পরিবারে অনেক হাত কাজ করে, সেখানে কেউ অকর্মণ্য বসে থাকলে তাকে কাজে লাগানোর একটা সহজ উপায় ছিল খই ভাজার দায়িত্ব দেওয়া। কারণ, এই কাজে শুধু শরীরের শ্রম দরকার হতো না, সময় আর মনোযোগও দরকার হতো। ধান ভেজানো থেকে শুরু করে বালুর তাপ ঠিক রাখা—সবকিছু একজনের একাগ্র উপস্থিতি দাবি করত।
আজকের ব্যবহারেও এই সুরটা টিকে আছে। কোনো প্রতিষ্ঠান যখন আসল জরুরি কাজ ফেলে ছোটখাটো, দীর্ঘসূত্রী আর শ্রমসাধ্য কিন্তু মূলত গুরুত্বহীন কাজে মেতে থাকে, তখন একে ব্যঙ্গ করে বলা হয় ‘নেই কাজ তো খই ভাজ’। লক্ষ করো, এখানে কাজটা সহজ নয়, বরং উল্টো, অপ্রয়োজনীয় শ্রম আর সময় ব্যয়ের প্রতীক হিসেবেই খই ভাজা ব্যবহৃত হয়।
বার্সেলোনায় হেলিকপ্টার থেকে কবিতার বোমাবর্ষণ করেছেন একদল শিল্পীতোমরা যারা স্কুল-কলেজে পড়ো, তোমাদের সঙ্গেও এই যুক্তিটা মিলে যায়। ছুটির দিনে বসে থাকলে মা–বাবা যখন বলেন, কিছু একটা করো, তখন তাঁরা সাধারণত হালকা কোনো কাজের কথা বলেন না; বরং এমন কিছুর কথা বলেন, যা সময় নেবে, শ্রম দাবি করবে। ঘর পরিষ্কার করা, রান্নায় সাহায্য করা, পড়ার টেবিল গোছানো। এসবের পেছনের যুক্তিটা একই, অলস সময়কে শ্রমে রূপান্তর করার চেষ্টা।
খই নিজে বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে অবশ্য শুধু শ্রমের প্রতীক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উৎসব আর আতিথেয়তার স্মৃতিও। নবান্নে খই-মুড়ি, পৌষপার্বণে খই-নাড়ু, বিয়ের অনুষ্ঠানেও খইয়ের আয়োজন থাকত। অতিথি এলে চিড়ে-খই দিয়ে আপ্যায়নের রীতি অনেক পুরোনো। এ কাজ তাই একদিকে শ্রমসাধ্য, অন্যদিকে সামাজিক সংযোগের মাধ্যমও। প্রবাদের মধ্যে তাই একরকম দ্বৈরথ আছে। শাস্তির সুর আর সামাজিক উৎসবের উষ্ণতা একসঙ্গে মিশে আছে একই কাজের ভেতর।
আজকের দিনে এই প্রবাদটার বাস্তব প্রয়োগ একটু কঠিন। তোমার অলস সময়ে কেউ তোমাকে বালুতে ধান ভাজতে বসাবে না। কিন্তু যুক্তিটা এখনো খাটে। অলস সময়কে অর্থবহ করার জন্য মানুষ এখনো কঠিন, ধৈর্যের কাজ বেছে নেয়, যাতে সময়টা কাটে এবং কিছু একটা ফলও পাওয়া যায়। হাতে কিছু একটা তৈরি করা। দীর্ঘ একটা প্রজেক্টে সময় দেওয়া। এসবও আসলে আধুনিক সংস্করণে একই যুক্তি।
পরবর্তী মহামারির খবর আগে কে পাবে—মানুষ, না এআই?গ্রামবাংলার কিছু জায়গায় এখনো খই ভাজার রীতি টিকে আছে। যদিও শহরে এটা প্রায় হারিয়ে যাওয়া এক কারিগরি। বাজারের প্যাকেট খই এখন সহজলভ্য। তাই হাতে ভাজার দরকারটাও কমে গেছে। কিন্তু প্রবাদটা টিকে আছে। কারণ, এর পেছনের যুক্তিটা চিরন্তন। অলস হাতকে শ্রমে লাগানোর এই কৌশল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাংলা সমাজের অভ্যাসের অংশ হয়ে গেছে।
পরেরবার কেউ যখন বলবে, ‘নেই কাজ তো খই ভাজ’, একটু থেমে ভাবতে পারো এর পেছনের আসল কথাটা। এটা তোমাকে তুচ্ছ কাজে সময় কাটানোর পরামর্শ দিচ্ছে না, বরং বলছে, অলস বসে থাকার চেয়ে শ্রমসাধ্য কিছুতে নিজেকে ব্যস্ত রাখো। আর সেই শ্রমের ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে আছে একটা শৃঙ্খলা, যা অলসতার চেয়ে বেশি কিছু শিখিয়ে যায়।
তথ্যসূত্র: বাংলাপিডিয়া, প্রথম আলো (২০১৯)বিড়াল কেন টুনা মাছ এত পছন্দ করে




