নীল রঙের শহর! হ্যাঁ, একটি শহরের ঘরের দেয়াল, সরু গলি, সিঁড়ি, জানালা—সবকিছুই নীল রঙে মোড়ানো। ঠিক সে রকমই মরক্কোর ছোট্ট পাহাড়ি শহর শেফশাওয়েন। অনেকের কাছে শহরটি ব্লু পার্ল বা নীল মুক্তা নামে পরিচিত।
রিফ পর্বতমালার কোলে গড়ে ওঠা এই শহরের প্রতিটি অলিগলি যেন এক জীবন্ত শিল্পকর্ম। কোথাও গাঢ় নীল, কোথাওবা আকাশি, কোথাও আবার সাদা ও নীলের মিশেল, সেখানে এক স্বপ্নময় আবেশ তৈরি করে। দিনের আলোর সঙ্গে বদলে যায় শহরের রঙের আবহ। সকালে এটি শান্ত, দুপুরে প্রাণবন্ত আর বিকেলের সোনালি আলোয় শহরটি যেন রহস্যময় হয়ে ওঠে।
একসময় এই শহর এতটাই পবিত্র বলে বিবেচিত হতো যে সেখানে অমুসলিম বিদেশি পর্যটকদের প্রবেশের অনুমতি ছিল না। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই নিয়ম। এখন বিশ্বের নানান প্রান্ত থেকে হাজারো পর্যটক শুধু এই নীল শহর কাছ থেকে দেখার জন্য মরক্কো ছুটে যান।
শহরটি যত রঙিন, এর ইতিহাসও ততটা বৈচিত্র্যময়। ১৪৭১ সালের কথা। সে বছর বারবার নামে এক জনগোষ্ঠী এই শহর প্রতিষ্ঠা করে। পরে স্পেন থেকে বিতাড়িত মুসলিম ও ইহুদি পরিবারগুলো সেখানে আশ্রয় নেয়। তাদের সংস্কৃতি, স্থাপত্য আর জীবনধারা নিয়ে গড়ে ওঠে এই শহর।
এই শহরের বাড়িগুলো কেন নীল রঙে রাঙানো—এ নিয়ে নানান গল্প প্রচলিত রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো, নীল রং মশা দূরে রাখতে সাহায্য করে। আরেকটি মত, স্পেন থেকে আসা ইহুদি সম্প্রদায় তাদের নিজেদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে নীল রঙের ব্যবহার শুরু করেছিল। ধীরে ধীরে যা পুরো শহরটির পরিচয়ে পরিণত হয়েছে। কারণ যা-ই হোক, আজ নীল রংটিই শেফশাওয়েনকে পৃথিবীর সবচেয়ে আলোকচিত্রবান্ধব শহরগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।
শহরটির সৌন্দর্য শুধু ক্যামেরাবন্দী করার জন্যই নয়, সেখানে সকাল শুরু হয় পাহাড়ি বাতাসে, দুপুর কেটে যায় ব্যস্ত বাজারে আর সন্ধ্যায় ছোট ছোট ক্যাফেতে বসে স্থানীয় চা উপভোগ করা যায় শান্ত পরিবেশ। সেখানে পর্যটক আর স্থানীয় মানুষদের দূরত্ব খুবই কম। কেউ হাতে তৈরি কাপড় বিক্রি করছেন, কেউ চামড়ার তৈরি জিনিস বানাচ্ছেন আবার কেউ কাঠে নকশা খোদাই করছেন। এতে বোঝা যায়, এটি শুধু পর্যটন শহর নয়, এটি সেখানকার মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও ইতিহাসে বোনা এক জীবন্ত ক্যানভাস।
শহরটিতে শুধু নীল রঙের ঘরবাড়ি ও দেয়াল নয়, দেখার জন্য রয়েছে শত বছরের পুরোনো দুর্গ এবং ঐতিহাসিক মসজিদ। শহরটির মাঝখানেই দাঁড়িয়ে রয়েছে কাসবা দুর্গ। একসময় এটি ছিল শহরের নিরাপত্তার প্রধান কেন্দ্র। লালচে দেয়ালঘেরা এই দুর্গ দূর থেকে নজর কেড়ে নেয়। এর ভেতর রয়েছে সবুজঘেরা শান্ত বাগান, ছোট একটি জাদুঘর।
শহরটির প্রাণবন্ত অংশ হলো এর মদিনা বা পুরোনো শহর। সেখানে কোনো নির্দিষ্ট পথ ধরে হাঁটার প্রয়োজন নেই; বরং পথ হারিয়ে ফেলাই যেন এক সুন্দর অভিজ্ঞতা। এক গলি থেকে অন্য গলিতে যেতে যেতে কখনো দেখা মিলবে নীল রঙের সিঁড়ি, কখনো ফুলে সাজানো ছোট্ট বারান্দা, আবার কোথাও স্থানীয় শিশুদের খেলাধুলা। মদিনার ছোট ছোট দোকানে হাতে বোনা উলের পোশাক, কাঠের কারুকাজ, মরক্কোর বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প—সবকিছুতেই রয়েছে দেশটির সংস্কৃতি।
শহরটির অন্যতম কেন্দ্র হচ্ছে উতা আল হাম্মাম স্কয়ার। এ ছাড়া ঘুরে দেখার জন্য আরও রয়েছে গ্র্যান্ড মসজিদ, আকছুর জলপ্রপাত, ব্রিজ অব গড, কানাদেল গুহা ইত্যাদি।
মরক্কো থেকে এই দুই উপায়ে কম সময়ে পৌঁছানো যায় সেখানে।
১. তানজিয়া থেকে শেফশাওয়েনের দূরত্ব প্রায় ১১৫ কিলোমিটার। শেয়ারড ট্যাক্সিতে যেতে পারেন। সময় লাগবে ২ ঘণ্টা।
২. মরক্কোর ফেজ শহর থেকে শেফশাওয়েনের দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার। বাসে যেতে সময় লাগবে ২ থেকে আড়াই ঘণ্টা।
শেফশাওয়েন সুস্বাদু মরোক্কান খাবার খেতে খুব বেশি খরচ হয় না। উতা আল হাম্মাম স্কয়ার ঘিরে রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় রেস্তোরাঁ ও ক্যাফে। স্থানীয় জনপ্রিয় খাবার তাজিন, কুসকুস কিংবা মরক্কান মিন্ট টি এখানকার আকর্ষণ।
পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ আছে, যেগুলো একবার ঘুরে দেখলে সুন্দর বলে মনে হয়। আবার কিছু শহর আছে যেগুলো ধীরে ধীরে মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। শেফশাওয়েন যেন তেমনই এক শহর, যেখানে রয়েছে নীল রঙের আবেশ, শত বছরের ইতিহাস, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং স্থানীয়দের আন্তরিকতা। তাই মরক্কো ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে এই নীলাভ শান্ত শহরটি আপনার ভ্রমণ তালিকায় রাখতেই পারেন।
সূত্র: দ্য গ্লোবট্রটিং ডিটেকটি বারসেলো এক্সপেরিয়েন্স








