নওগাঁ সদর উপজেলার তিলকপুর ইউনিয়নের ইকরতাড়া গ্রামের বাসিন্দা ফ্রিল্যান্সার নাঈম হোসেন। গত ২২ জুন আকস্মিক তার বাড়িতে হাজির হন সদর মডেল থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) জাকারিয়া। হাতকড়া পরানো হয় নাঈমকে। তার বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়।

ভীতিকর এমন পরিস্থিতিতে ফেলে নাঈমকে ছেড়ে দেওয়ার শর্তে একপর্যায়ে শুরু হয় দেনদরবার। নাঈমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকে প্রায় এক লাখ টাকা সমমূল্যের ডলার সেন্ড করে নেওয়া হয় আরেক ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে। বিনিময়ে আপাতত ছেড়ে দেওয়া হয় এই ফ্রিল্যান্সারকে। সদর থানা পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় মাসিক মোটা অঙ্কের চাঁদা। যা দিতে অক্ষম ছিলেন নাঈম।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নওগাঁ সদর মডেল থানার এমন চাঁদাবাজির তথ্যগুলো প্রতিবেদককে জানাচ্ছিলেন ফ্রিল্যান্সার নাঈমের ঘনিষ্ঠ একজন। তার ভাষ্য, ‘সদর থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান টাকা ছাড়া কিছুই বোঝেন না। টাকার নেশার উন্মাদনায় পড়ে সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) জাকারিয়াকে দিয়ে তিনি এই কাজ করিয়েছেন। পরে বিষয়টি পুলিশ সুপারের কানে গেলে ওসিকে সেফ জোনে রেখে এএসআই জাকারিয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।’

গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর নওগাঁ সদর মডেল থানায় ওসি হিসেবে যোগদান করেন মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। এ থানার অধীনে রয়েছে ভীমপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র এবং শহরের কালিতলা পুলিশ ফাঁড়ি। অভিযোগ রয়েছে, আসাদুজ্জামান ওসি হিসেবে যোগদানের পর তার অধীন এ দুটি ইউনিটে উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে পুলিশ পরিচয়ে চাঁদাবাজি। পুলিশ সদস্যরা মাদক ও জুয়ার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে নিয়মিত মাসোয়ারা নিচ্ছেন।

আরেক ভুক্তভোগী হাঁসাইগাড়ী ইউনিয়নের ভীমপুর গ্রামের বাসিন্দা আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এক প্রতিবেশী আমার বিরুদ্ধে হুমকি-ধমকির জিডি (সাধারণ ডায়েরি) করেছিলেন। সেই জিডির তদন্ত পেয়েছিলেন ভীমপুর তদন্ত কেন্দ্রের এএসআই চন্দন। একপর্যায়ে ওই এএসআই আমাকে ডেকে নগদ দুই হাজার টাকা ঘুস নেন। পরে জিডির তদন্ত রিপোর্ট পক্ষে দিতে হলে ওসি আসাদুজ্জামান স্যারকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে বলে দাবি করেন। সেই টাকা না দেওয়ায় আমাকে নানাভাবে হুমকি-ধমকির মধ্যে রেখেছেন। পরে শুনেছি তিনি আমাকে অভিযুক্ত করে রিপোর্ট জমা দিয়েছেন।’

শহরের হাঁট নওগাঁ মহল্লার বাসিন্দা ইশাতির রাদি জাগো নিউজকে বলেন, ‘কালিতলা, হাট নওগাঁ এবং গোস্তহাটির মোড়ে মাদকের বড় বড় পয়েন্ট আছে। প্রকাশ্যে এসব এলাকায় ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল বেচাকেনা হয়। কালিতলা পুলিশ ফাঁড়ির মাধ্যমে সদর থানা পুলিশ এসব পয়েন্ট থেকে নিয়মিত মাসোয়ারা নেয়। কেউ মাসোয়ারা দিতে দেরি করলে গ্রেফতার করা হচ্ছে। অথচ টাকা পেলে পুলিশ এসব দেখেও দেখে না।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে এএসআই জাকারিয়ার ফোনে কল করা হলে তিনি সাক্ষাতে কথা বলার অনুরোধ জানিয়ে কল কেটে দেন। পুনরায় কল করা হলে ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে ফ্রি হয়ে কল করবেন বলে জানান। তবে পরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এক পর্যায়ে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। এএসআই চন্দনও অভিযোগ অস্বীকার করেন।

ওসি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এএসআই জাকারিয়ার বিরুদ্ধে হাতকড়া পরিয়ে টাকা আদায়ের যে অভিযোগ উঠেছে, ওইদিন আমি ছুটিতে ছিলাম। ভীমপুর তদন্ত কেন্দ্র ও কালিতলা পুলিশ ফাঁড়ির বিষয়ে যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’

সার্বিক বিষয়ে নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘এএসআই জাকারিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পরপরই তা খতিয়ে দেখা হয়। সত্যতা পাওয়ায় সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। কালিতলা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জকেও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদিন আগে সরিয়ে দেওয়া হয়।’

ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কারও বিরুদ্ধে যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ করেন; তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আরমান হোসেন রুমন/এসআর/জেআইএম