অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ২৪ জুন জাতীয় সংসদে এক লিখিত প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছেন, ব্যাংক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে সৃষ্ট খেলাপি ঋণের যে অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে, তা ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করার জন্য ৯টি আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) স্বাক্ষর করা হচ্ছে। সংস্থাগুলো ‘নো উইন নো ফি’ ভিত্তিতে বাংলাদেশকে পাচারের অর্থ ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সহায়তা করবে। অর্থাৎ এ সংস্থার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে কোনো বাড়তি ফি দিতে হবে না। তারা যে পরিমাণ অর্থ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে তার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তারা কমিশন হিসাবে লাভ করবে। অর্থ ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হলে সংস্থাগুলো বাংলাদেশ সরকারের কাছে কোনো আর্থিক সুবিধা দাবি করতে পারবে না। প্রাথমিক পর্যায়ে সাবেক ভূমিমন্ত্রী এম সাইফুজ্জামান চৌধুরী, বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি খাতবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ ও ওরিয়ন গ্রুপের পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীকালে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। অর্থমন্ত্রী সংসদে আরও জানান, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য আইনি সহায়তা দেবে।

বর্তমান সরকার পাচারের অর্থ ফিরিয়ে আনার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা নতুন নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এ উদ্যোগের প্রাথমিক সূচনা করা হলেও সময়স্বল্পতার কারণে তখন সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান সরকার সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে উদ্যোগটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় এ উদ্যোগ ব্যর্থ হতে পারে। উল্লেখ্য, পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত দুরূহ কাজ, তবে অসম্ভব নয়। বিশ্বে অনেক দেশ আছে, যারা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাচারের অর্থ তাদের দেশে নিয়ে আসার জন্য বিদেশিদের উৎসাহিত করে থাকে। যেমন: মালয়েশিয়া ‘সেকেন্ড হোম’ প্রকল্পের নামে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিদেশ থেকে পাচার করা অর্থ তাদের দেশে নিয়ে আসা এবং বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে থাকে। কয়েক বছর আগে তুরস্কও এ ধরনের একটি আইন চালু করেছে। কোনো দেশই চায় না তাদের দেশে পাচার হয়ে আসা অর্থ ফিরিয়ে দিতে। তাই প্রথমেই অর্থ পাচারের গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে।

অর্থ পাচার বিশ্বব্যাপী একটি জটিল সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এমন কোনো দেশ নেই যারা অর্থ পাচার থেকে পুরোপুরি মুক্ত। তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকেই বেশি পরিমাণে অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে থাকে। অর্থমন্ত্রী সংসদে আরও জানিয়েছেন, দেশ থেকে মোট কত টাকা পাচার হয়েছে বা হচ্ছে, এর সঠিক হিসাব দেওয়া কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত শ্বেতপত্র কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে মোট ২৩ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ২৮ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা।

অর্থমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, পাচার করা অর্থের সঠিক পরিমাণ কোনোভাবেই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কারণ, যারা অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন ও পাচার করেন, তারা তাদের উপার্জিত অর্থের সূত্র ও পরিমাণ কারও কাছে প্রকাশ করেন না। পৃথিবীতে পাচারের অর্থের হিসাব সংরক্ষণের জন্য কোনো স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান নেই। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। উন্নয়নের নামে যখন ব্যাপক মাত্রায় অর্থ লোপাটের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়, তখন অর্থ পাচার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটে নেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটি (জিএফআই) তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ পাচার হয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে (আমদানি-রপ্তানি)। প্রতিবছর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে ৬৪ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়। পণ্য আমদানিকালে ওভার ইনভয়েসিং এবং রপ্তানির সময় আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে এ বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়। বিশ্বব্যাংকের একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন, বিশ্বব্যাপী অর্থ পাচার একটি জটিল সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী মোট ৮৫ হাজার কোটি ডলার থেকে ২ লাখ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ পাচার হয়। পাচারকৃত এ অর্থের পরিমাণ বিশ্ব জিডিপির ২ থেকে ৫ শতাংশের সমান। তার এ হিসাবও অনুমানভিত্তিক। কারণ তার দেওয়া তথ্যের মাঝে ফারাক বড়ই বেশি। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারেননি আসলে কত টাকা প্রতিবছর পাচার হচ্ছে। পরিমাণগত বিতর্কে না যাওয়াই ভালো। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় স্থাপিত ব্যাংকগুলোর অধিকাংশই অর্থ পাচারের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছিল। সরকার সমর্থক ব্যবসায়ীরা ব্যাংক স্থাপন করে স্বনামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণের নামে বের করে নিয়ে বিদেশে পাচার করেছে। এসব অর্থ আর কখনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আদায় হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

সরকার পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। তবে টাকা পাচার হয়ে যাওয়ার পর তা উদ্ধারের চেষ্টা চালানোর চেয়ে টাকা যাতে পাচার না হয়, সেটা নিশ্চিত করাই বেশি প্রয়োজন। আমরা কি ভেবে দেখেছি, একজন মানুষ তার কষ্টার্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করেন কেন? সাধারণত সৎভাবে অর্থ উপার্জনকারী ব্যক্তি তার উপার্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করেন না। প্রধানত কালোটাকা ও অপ্রদর্শিত অর্থের মালিকরাই তাদের উপার্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করে থাকেন। কারণ এ অর্থ স্থানীয়ভাবে ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। অপ্রদর্শিত অর্থ ও কালোটাকা নিয়ে আমাদের মাঝে কিছুটা হলেও বিভ্রান্তি রয়েছে। অপ্রদর্শিত অর্থ হচ্ছে সেই অর্থ, যা বৈধভাবে উপার্জিত কিন্তু দেশের প্রচলিত ট্যাক্স নেটওয়ার্কের বাইরে থাকে। যেমন: কোনো ব্যক্তি বৈধভাবে ১ কোটি টাকা উপার্জন করলেন কিন্তু তার ট্যাক্স ফাইলে এ অর্থ প্রদর্শন করলেন না। অর্থাৎ কর ফাঁকি দিলেন। তাহলে সেই টাকা অপ্রদর্শিত অর্থ হিসাবে গণ্য হবে। আর কালোটাকা হচ্ছে সেই অর্থ, যা অবৈধভাবে উপার্জিত এবং দেশের প্রচলিত ট্যাক্স নেটওয়ার্কের বাইরে থাকে। যেমন: কেউ যদি চোরাচালানি, দুর্নীতি বা ডাকাতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে এবং উপার্জিত অর্থের ওপর কোনো ট্যাক্স প্রদান না করে, তাহলে সেই অর্থ কালোটাকা হিসাবে গণ্য হবে।

পাচার করা অর্থের গন্তব্য যেসব দেশ, তারা যদি কার্যকর উদ্যোগ নেয়, তাহলে অর্থ পাচার কিছুটা হলেও রোধ করা সম্ভব। কিন্তু কোনো দেশ সেটি করতে চাইবে না। কানাডা কয়েক বছর আগে একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। তাদের দেশের কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ ছাড়া কোনো বিদেশি নাগরিক যদি সম্পদ ক্রয় করেন এবং তার ব্যবহৃত অর্থ উপার্জনের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে না পারেন, তাহলে সেই সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে জব্দ করা হবে। পরবর্তীকালে এ আইন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা জানা যায়নি।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বিশ্বস্ততার প্রতীক। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে দেশের পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে ফেলা হয়। ব্যাংকের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানকেও রাজনৈতিক বিবেচনায় স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। সর্বশেষ ব্যক্তিমালিকানায় যে ৯টি ব্যাংক স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়, সে প্রসঙ্গে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছিলেন, এ মুহূর্তে দেশে আর কোনো ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন ৯টি ব্যাংক স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমতি দিলে তার পরিণতি কী হতে পারে তার প্রমাণ আমরা ইতোমধ্যেই পেয়েছি। এসব ব্যাংকের বেশির ভাগই গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। সরকারের পক্ষ থেকে এসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ভালো করার জন্য এ পর্যন্ত ৭৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলো আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা খুবই কম। এ অবস্থা বিদ্যমান থাকলে আগামী দিনে ব্যাংক খাত আরও নতুন নতুন সমস্যায় আক্রান্ত হবে। তাই জরুরি ভিত্তিতে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে বলে দেওয়া যেতে পারে, এ সময়ের মধ্যে তারা যদি আর্থিকভাবে লাভবান হতে না পারে, তাহলে তাদের অন্য কোনো ব্যাংকের সঙ্গে মার্জার অথবা অবলুপ্ত করা হবে। কারণ, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে কোনো প্রতিষ্ঠানকেই রাষ্ট্রীয় সহায়তা দিয়ে চালানোর সুযোগ নেই। বাজারই সিদ্ধান্ত নেবে কে টিকে থাকবে আর কে থাকবে না। এ ব্যাপারে আবেগপ্রবণ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বর্তমানে দেশের ব্যাংকের যে অবস্থা, তা থেকে উত্তরণ ঘটাতেই হবে। প্রতিটি স্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। (অনুলিখন : এমএ খালেক)

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : অর্থনীতিবিদ, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা