রাজশাহী-নাটোর-পাবনা ও কুষ্টিয়ার পদ্মা নদীর একাধিক দুর্গম চর সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য পরিণত হয়েছে। দিনের আলোয় প্রকাশ্যে স্পিডবোটে অস্ত্রের মহড়া, গুলি ও প্রকাশ্যে তাদের চাঁদাবাজি পুরো অঞ্চলকে পরিণত করছে আতঙ্কের জনপদে।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বিস্তীর্ণ নদীর বালু উত্তোলন, চরের ভূমি নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদাবাজি নিয়ে বারবার সহিংসতা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। গেল বছরে অপারেশন চালিয়ে সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার এবং আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয় চর থেকে। এরপর অপরাধ কমে আসে। তবে, আবারো মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে সন্ত্রাসীরা।
পুলিশ বলছে, পদ্মার চরাঞ্চলে সক্রিয় আছে ১১টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। এর মধ্যে রয়েছে- কাঁকন, মণ্ডল, টুকু, সাঈদ, লালচাঁদ, রাখি, শরীফ, রাজ্জাক, চল্লিশ, বাহান্ন এবং সুখচাঁদ-নাহারুল বাহিনী। তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম ‘কাঁকন বাহিনী’।
হাসানুজ্জামান কাঁকন নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে কাঁকন বাহিনী রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট, নাটোরের লালপুর, পাবনার ঈশ্বরদী ও কুষ্টিয়ার দেলৗতপুরের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শুক্রবার (২৬ জুন) দুপুর ১টার দিকে পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুরে বিএনপি কর্মী মঞ্জু শেখকে (৪০) গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। পুলিশের ভাষ্য, পদ্মার পাড়ে মঞ্জুর কিছু জমি আছে। অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে তার জমি ভেঙে যাচ্ছিল। মঞ্জু বালু উত্তোলনে বাধা দেন। ধারণা করা হচ্ছে , এ কারণে তাকে হত্যা করা হতে পারে।
১৫ জুন নাটোরের লালপুর উপজেলার রায়তা চরে যাত্রীবাহী একটি নৌকায় গুলি চালায় বন্দুকধারীরা। এতে সাহাবুল ইসলাম নামের একজন নিহত হন। আহত হন আরো একজন। এর আগে, ৯ জুন রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চর জাজিরায় হামলাকারীরা একটি বালু মহালের ব্যবস্থাপক আজিজুল হাকিমকে তুলে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।
চরের সশস্ত্র বাহিনীর তথ্য গেল বছরের অক্টোবরে প্রকাশ্যে আসে। সে সময় চরের জমি, বালু উত্তোলন এবং আধিপত্য নিয়ে বিরোধের জের ধরে গোলাগুলিতে তিনজন নিহত হয়েছিল। ২৭ অক্টোবর গোলাগুলিতে মারা যান আমান মণ্ডল, নাজমুল হোসেন ও ২৮ অক্টোবর মারা যান লিটন হোসেন নামে আরেকজন। তারা সবাই বিভিন্ন গোষ্ঠীর সদস্য ছিল বলে দাবি করে পুলিশ। পরিবারের দস্যরা দাবি করেন, নিহতরা সবাই কৃষক।
চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি মধ্যরাতে নাটোরের লালপুরে সোহেল রানা নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। গেল ১৮ মে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার কালিদাসখালী পদ্মা চর থেকে স্বপন ব্যাপারি নামের এক জেলেকে গুলি করে তুলে নিয়ে যায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। এক মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পরিবারের সদস্যরা তার সন্ধান পাননি। তার ভাগ্যে কী ঘটেছে সে সম্পর্কেও কিছু জানেন না তারা।
স্বপনের বাবা সিদ্দিক ব্যাপারি বলেন, “চোখের সামনেই আমার ছেলেকে গুলি করে নিয়ে গেছে সন্ত্রাসীরা। জানতে পারেনি, আমার ছেলে কোথায় আছে, কেমন আছে। ওর কী হয়েছে সেটা জানাও সম্ভব হয়নি। তার খোঁজ পেতে অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। আমার বিশ্বাস তাকে তারা মেরে ফেলেছে। আমার সবচেয়ে বড় দুঃখ হলো, আমি আমার ছেলের মরদেহটাও উদ্ধার করতে পারিনি।”
চরাঞ্চলের বাসিন্দারা বলছেন, আধিপত্য বিস্তার, চর দখল নিয়ে শত্রুতা সবসময়ই ছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নিয়েছে।
চরাঞ্চলের গ্রামগুলোর বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের তিনজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই পরিস্থিতির জন্য পুলিশের দুর্বল নজরদারি এবং স্থানীয় প্রভাবশালীরা দায়ী। ক্ষমতা হস্তান্তরের ফলে একসময় বিশাল চরাঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর ক্ষমতা খর্ব হয়েছে। নদীগুলোতে ঘুরে বেড়ানো সশস্ত্র দলগুলো অবাধ বিচরণের সুযোগ পেয়েছে।
গ্রামবাসী জানান, প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করে স্পিডবোটে করে প্রায়ই নদীতে ঘুরে বেড়ায় সন্ত্রাসীরা। চরের মানুষদের মধ্যে তারা আতঙ্ক ছড়ায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পদ্মা চরের এক বাসিন্দা বলেন, আমরা মাঝে মাঝে গুলির শব্দ শুনি। অনেকেই সন্ধ্যার পর নদীপথে যাতায়াত এড়িয়ে চলেন। এই গ্যাংগুলোর কার্যকলাপ নিয়ে কথা বলতেও ভয় লাগে। কারো বিরুদ্ধে কিছু বললে তারা বাড়িতে এসে হামলা চালায়।
গেল বছরের ২৮ নভেম্বর রাজশাহী, নাটোর ও পাবনায় ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট’ চালায় যৌথ বাহিনী। ওই অভিযানে ৭২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, গ্রেপ্তারকৃতরা জামিনে বের হয়ে আবারো সন্ত্রাসী কার্যক্রম শুরু করেছে।
রাজশাহী রেঞ্জের উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. শাহজাহান বলেন, “চরে গোলাগুলির প্রধান কারণগুলো হলো বালু উত্তোলন, এলাকার নিয়ন্ত্রণ এবং নৌপথে চাঁদাবাজি। ইজারা নেওয়া বালুর মহালের সীমানা নিয়ে প্রায়শই বিরোধ দেখা দেয়। ফলে বিবাদ ও সহিংস সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়।”
তিনি বলেন, “পদ্মা নদীর একদিকে রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা এবং নদীর ওপারে কুষ্টিয়ায় বেশ কয়েকটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। এখন পর্যন্ত কাকনকে ঘিরে নানা তথ্য আসছে। যদিও বর্তমানে তিনি বাস্তবে কতটা সক্রিয় তা জানা যাচ্ছে না। আমরা চেষ্টা করছি তাকে গ্রেপ্তার করতে।”
ডিআইজি বলেন, “সম্প্রতি একটি অভিযান চলাকালে সশস্ত্র অপরাধীরা পুলিশ দলের ওপর গুলি চালালে পাঁচজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পদ্মা চর অঞ্চলের দুর্গমতার কারণে পুলিশের অভিযান কঠিন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন জেলার সংযোগস্থলে অবস্থিত প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে অনেক ঘটনা ঘটে। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রস্তুতি সম্পন্ন করার আগেই অপরাধীরা প্রায়শই তাদের কার্যক্রম শেষ করে চলে যায়। অনেক অভিযুক্ত গ্যাং নেতা সহযোগিদের মাধ্যমে দূরবর্তী স্থান থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।”
তিনি বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন। নিরাপত্তা জোরদার করতে পুলিশ উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। আমরা বাঘার চর এলাকায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের পরিকল্পনা করছি। অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কাজ চলছে।”








