দেশে প্রতিবছর গড়ে পাহাড়ধসের ২৩টি ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় গড়ে ২৫ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। আহত হয় অর্ধশত মানুষ। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের গত সাড়ে ১০ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

ফায়ার সার্ভিস বলছে, টিলা ও পাহাড় কেটে অপরিকল্পিত বসতি স্থাপনের কারণে চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটির মতো এলাকাগুলোয় প্রায়ই পাহাড়ধস ও মাটিচাপায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়কেন্দ্রিক রাজনৈতিক অপতৎপরতা, গাছ কেটে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করাসহ বিভিন্ন কারণেই পাহাড়ে ধসের ঘটনা ঘটছে।

অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত এ বছর পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে ২৯টি। এসব ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত ৩০ জনের মৃত্যু হয়, আহত হয়েছে ৮৮ জন। এর আগের বছর ২২টি ঘটনায় ৬ জনের মৃত্যু হয়, আহত হয় ১০ জন। ২০২৪ সালে পাহাড়ধসের ২৩টি ঘটনা ঘটে। প্রাণ হারায় ১৬ জন, আহত হয় ৩ জন। আর ২০২৩ সালে পাহাড়ধসের ৩৫টি ঘটনায় ১৫ জন মারা যায়, আহত হয় ২৩৪ জন। এ ছাড়া ২০২২ সালে ৫ জন, ২০২১ সালে ৬, ২০২০ সালে ১৪, ২০১৯ সালে ১৩, ২০১৮ সালে ৪৫, ২০১৭ সালে ৯১ এবং ২০১৬ সালে ৩৯ জন প্রাণ হারায়।

২০১৬ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সাড়ে ১০ বছরে দেশে ২৪৩টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে, গুরুতর আহত হয়েছে ৫২৯ জন। অর্থাৎ প্রতিবছর দেশে গড়ে ২৩টি ঘটনায় ২৫ জনের মতো মানুষের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া পাহাড়ধসে প্রতিবছর গড়ে ৫১ জনের বেশি গুরুতর আহত হয়। আর হতাহতদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই পুরুষ।

গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধস ও মাটিচাপায় চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে গত বৃহস্পতিবার সংসদে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। তাদের মধ্যে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ৫ জন, কক্সবাজারে ১৯, রাঙামাটিতে ১ এবং বান্দরবানে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

দেশে প্রতিবছর বর্ষাকালে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটলেও প্রাণহানি এড়ানো যাচ্ছে না। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহাম্মেদ খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, পাহাড় মানুষের বসবাসের জন্য না। কিন্তু প্রতিবছর সেখানে বাড়িঘর উঠছে। পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি, রাস্তা তৈরি হচ্ছে। এতে পাহাড় তার প্রাকৃতিক গঠন হারিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ধসে পড়ছে।

আলী আহাম্মেদ খান বলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসনের সামনেই এসব হচ্ছে, এখানে স্থানীয় জেলা প্রশাসনের শিথিলতা আছে, তারা কঠোর হলে এগুলো হতো না। কিন্তু তারা কঠোর হচ্ছে না। তা ছাড়া স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা এসব বিষয়ে উদাসীন। তারা পাহাড় কাটা ও বসতি স্থাপনে নেপথ্যে থেকে কাজ করে। তাই প্রকৃতি, গাছপালা, পাহাড় ও মানুষ সবই হারাচ্ছি আমরা।’ এ জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনীতিকদের ভূমিকা রাখতে হবে বলে মনে করেন আলী আহাম্মেদ খান।

ফায়ার সার্ভিসের সাবেক এই মহাপরিচালক বলেন, পাহাড়ে নিম্ন আয়ের মানুষদের যারা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। যখন বৃষ্টি হয়, তখন নিম্ন আয়ের এসব মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে হবে।

আলী আহাম্মেদ খানের মতে, আশ্রয়হীন ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কম খরচে থাকার সুযোগ থাকায় পাহাড়ঘেঁষা বসতিগুলোই তাদের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে। জীবনের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকলেও বিকল্প আবাসনের অভাব এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তারা এসব এলাকা ছাড়তে পারে না।

অন্যদিকে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক আশ্রয়ে অনেক ক্ষেত্রে অবৈধভাবে এসব বসতি নির্মাণ করা হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। শুধু পার্বত্য তিন জেলাই নয়, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরাঞ্চলেও পাহাড়সংলগ্ন অসংখ্য বসতি এখন ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, দেশে সবচেয়ে বেশি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, জেলায় অন্তত ২৫টি পাহাড়কে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব পাহাড়ে এক লাখের বেশি মানুষ বসবাস করছে, যাদের অধিকাংশই নিম্ন আয়ের। এর মধ্যে ১৮টি পাহাড়ে বসবাসকারী ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের তালিকা প্রস্তুত হলেও বাকি পাহাড়গুলোর তথ্য সংগ্রহের কাজ এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। অতীতের প্রায় সব বড় পাহাড়ধসের ঘটনায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের অধিকাংশই ছিল পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষ। বিভিন্ন কমিটি তাদের সরিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করলেও তাদের কখনো সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ে বসবাস করা লোকজনকে স্থানান্তরের জন্য অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাদের অন্য সমতল খাসজমিতে জায়গা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তাদের আবেদন করতে বলা হয়েছে, কিন্তু তারা আবেদন করছে না।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আরও বলেন, পাহাড়ে বসবাস অবৈধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু সরকার তাদের প্রতি মানবিক। কারণ, তারা খুবই প্রান্তিক মানুষ। তাই তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না।

তবে ১৩ জুলাই পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির আরেকটি বৈঠক রয়েছে, সেখানে তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। বর্তমানে তাদের পাহাড়ি এলাকা থেকে সরিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আনা হয়েছে।

পরিবেশবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবীব বলেছেন, পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সুপারিশ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের জন্য সমন্বিত সরকারি উদ্যোগের অভাবই প্রতিবছর প্রাণহানির অন্যতম কারণ। প্রশাসনিক উদাসীনতা, অবৈধ দখল ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ক্রমেই বাড়ছে। ফলে প্রতিবার ভারী বৃষ্টিপাতের মৌসুমে পাহাড়ধসের আশঙ্কা বাড়ে এবং প্রতিবছরই ঝরে পড়ে অসংখ্য নিরীহ মানুষের প্রাণ।