মাহাফুজা শিরিন
পাখি এক অপার সৌন্দর্যের প্রতীক। পাখি নিয়ে আমাদের শৈশব ও রূপসী বাংলার চিরচেনা রূপকথা হলো ভোরবেলা ঘুম ভাঙানো দোয়েলের মিষ্টি শিস কিংবা গোধূলির লালচে আকাশে চিল-শালিকের ডানা মেলার দৃশ্য। পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ অবদান রেখে চলেছে পাখি। পাখির কুজন সবুজ অরণ্যে এক মোহনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করে।
কিন্তু আজকের ধূসর শহর আর যান্ত্রিক কোলাহলের বুকে সেই সুরগুলো যেন দিন দিন মিলিয়ে যাচ্ছে। ইট-কাঠ-কাচের দেয়াল আর কংক্রিটের জঙ্গলে নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে আকাশের মুক্ত পাখিরা। পাখি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়; তারা আমাদের বাস্তুতন্ত্র বা পরিবেশের অন্যতম প্রধান চোখের শোভা। অথচ মানুষের অসচেতনতা আর আধুনিকতার নির্মমতায় আজ পাখিদের নীল আকাশের রাজত্ব বিপন্ন হতে যাচ্ছে।
প্রকৃতির নীরব ভাস্কর
পাখির অবদান শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পাখি পুরো পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে। পাখি প্রকৃতিকে ফুলে-ফসলে ভরিয়ে দেওয়ার জন্য বিরাট অবদান রাখে। গাছের পরাগায়ন থেকে শুরু করে নতুন বনের বিস্তার-সবকিছুতেই পাখিদের অবদান অপরিসীম। কারণ ফসলের পরাগায়ন আরও বিস্তর করে বললে প্রজনন বা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিশেষ অবদান রাখে, যা অর্থনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
আরও পড়ুন
প্রতিদিন ইনডোর প্ল্যান্টে পানি না দিলেও যে কাজ করা জরুরি
এছাড়া কৃষকের প্রধান শত্রু ক্ষতিকর কীট-পতঙ্গ খেয়ে ফসলের সুরক্ষা দেওয়া কিংবা প্রকৃতি থেকে বর্জ্য পরিষ্কার করে রোগজীবাণু ছড়ানো ঠেকানো-সবখানেই পাখির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সহজ কথায়, পাখি ছাড়া আমাদের পৃথিবীর সবুজ ভারসাম্য রক্ষা করা অসম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মনুষ্যকুল পাখির এই পরম হিতৈষীকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে ফেলছে নিজেদের প্রয়োজনে, যা কি না একদিক থেকে রীতিমতো আত্মঘাতীর শামিল।
পরিবেশবাদী সংস্থা বার্ড লাইফ ইন্টারন্যাশনালের এক সমীক্ষায় উদ্বেগজনক বিষয় দেখা গেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইউরোপে সাধারণ পাখির ৪৫ ভাগ বিলিন হয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়ার পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক। সেখানকার ৮০ ভাগ পাখি নিঃশেষ হয়ে গেছে। বলা হয়েছে, গত ২৬ বছর ইউরোপের ২০টি দেশের ১২৪ টি প্রজাতির পাখির অন্তত ৫৬টি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। গবেষকদের মতে, শুধু শিকারিদের লোলুপদৃষ্টিই পাখি ধ্বংসের একমাত্র কারণ নয়। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস এ ক্ষেত্রে অন্যতম কারণ।
গবেষকদের দাবি, আবাসস্থলের অভাব, অনুকূল পরিবেশ, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও নির্বিচারে বৃক্ষনিধনের ফলে পৃথিবীর সাধারণ পক্ষীকুল ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে যার পরিণতি ভয়াবহ। এছাড়া কৃষিজমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের ফলে বিষাক্ত পোকা-মাকড় খেয়ে মারা পড়ছে অসংখ্য পাখি। কাচযুক্ত ধারালো ঘুড়ির সুতায় জড়িয়ে কিংবা শহরের স্বচ্ছ কাচের দেয়ালে আলো প্রতিফলিত হয়ে ধাক্কা খেয়ে প্রতিদিন অগণিত পাখির ডানা চিরতরে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এখনো বুনো পাখি ধরা, খাঁচায় বন্দি করা এবং কেনাবেচার নির্মম উৎসব চলছে।
পাখি বাঁচানো কোনো জটিল কাজ নয়, বরং মানুষের একটুখানি মানবিকতাই পারে হাজারো পাখির প্রাণ রক্ষা করতে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা কিছু সহজ পদক্ষেপ নিতে পারি-
জোনাকির আলো কেন জ্বলে আর নেভে? জেনে নিন রহস্য
বারান্দা ও ছাদে এক বাটি পানি
গ্রীষ্মের তাপদাহে পানির অভাবে বহু পাখি মারা যায়। আপনার ছাদ বা বারান্দার কোণে একটি মাটির পাত্রে পরিষ্কার পানি ও কিছু শস্যদানা রেখে দেওয়া যেতে পারে। যা তাদের জন্য জীবন রক্ষাকারী পরম স্বস্তি।
দেশি গাছের রোপণ
বাসাবাড়ির আঙিনায় বা ছাদে বিদেশি শোভাবর্ধক গাছের বদলে দেশি ফলজ ও ফুলগাছ রোপণ করুন। এগুলো পাখিদের প্রাকৃতিক খাদ্য ও নিরাপদে বাসা বাঁধার সুযোগ করে দেয়। প্রাকৃতিক পরিবেশে একটি নির্দিষ্ট স্থানে যদি ছোটবড় ১০ প্রজাতির গাছ থাকে এবং প্রতিটি গাছকে কেন্দ্র করে যদি ১০ প্রজাতির প্রাণী বাঁচে তাহলে সেখানে প্রায় ১০০ প্রজাতির প্রাণি পাওয়া যাবে। একটি দেশি গাছ বড় হোক বা তৃণলতা, তার লতাপাতা ফুল-ফল খেয়ে কত প্রজাতি প্রাণি যে জীবনধারণ করে তা হয়তো আমরা কখনো ভেবে দেখি না।
সচেতনতা ও প্রতিরোধ
কাচযুক্ত সুতা ব্যবহার বন্ধ করা এবং জানালায় হালকা পর্দা বা স্টিকার দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি খাঁচায় বুনো পাখি বন্দি রাখা রোধ করতে হবে এবং পাখি শিকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পাখি বাঁচানো কেবল প্রকৃতির প্রতি দয়া দেখানো নয়, এটি আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখারই তাগিদ। কারণ আকাশ যদি পাখিশূন্য হয়ে যায়, তবে সেই নীরবতা একদিন আমাদের জীবনকেও স্থবির করে দেবে। তাই আসুন, ভালোবাসা ও সচেতনতায় পাখির মুক্ত ডানায় আবারও ফিরিয়ে দিই তাদের নিজস্ব আকাশ।
কেএসকে








