চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের পানির সম্মিলিত চাপে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উপকূলীয় বেড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে লবণাক্ত পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ এখনো পানির নিচে রয়েছে।
এতে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে; অনেক এলাকায় নৌকা ছাড়া চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে এবং জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গত প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে বাঁশখালীতে এমন বড় আকারের প্লাবন ও দুর্যোগের ঘটনা আর দেখা যায়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার ইলশা, বাশকালা, চাবাছড়ি, কাতুরিয়া, বাগমারা, চেচুরিয়া, সরল, শীলকূপ, শেখেরখীল, পুঁইছড়ি, কানকানাবাদ, প্রেমাশিয়া, রায়ছটা, পুকুরিয়া, মানিকগ্রাম, কালিপুর, ছনুয়া, গণ্ডামারাসহ অসংখ্য গ্রাম ও নিম্নাঞ্চল এখনো পানির নিচে। কোথাও হাঁটুসমান পানি, কোথাও কোমরসমান, আবার কোথাও বুকসমান পানি জমে আছে। অনেক এলাকায় নৌকা ছাড়া চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
বাঁশখালী উপজেলা যুব জামায়াতের সভাপতি খোরশেদ আলম জাগো নিউজকে বলেন, কয়েক দিনের টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের সময় বঙ্গোপসাগরের পানির চাপে উপকূলীয় বেড়িবাঁধের দুর্বল অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে লবণাক্ত পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় জলাবদ্ধতা আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
আরও পড়ুন
চট্টগ্রামে ভারী বৃষ্টি হতে পারে আরও ২ দিন, শঙ্কা পাহাড়ধসের
তিনি বলেন, এ প্লাবনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাঁচা ও মাটির তৈরি বসতঘর। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেওয়ায় পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
প্লাবনে কৃষি খাতেও বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, আমনের বীজতলা, সবজিক্ষেত, চিংড়ি ও মাছের ঘের পানির নিচে চলে গেছে।
গণ্ডামারা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আরিফুল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, উপজেলার গ্রামীণ জনপদের অধিকাংশ নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস মাটির ঘরে। টানা বর্ষণ ও পানির চাপে এসব ঘরের দেয়াল ধসে পড়েছে। অসংখ্য পরিবারের বসতঘর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, বাঁশ ও টিনের তৈরি ঘরগুলোও পানিতে তলিয়ে রয়েছে। অনেকেই প্রয়োজনীয় মালামাল, আসবাবপত্র, ধান-চাল ও গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাননি।
বন্যায় পানিতে ডুবে গেছে বসতভিটা/ বাহারছড়া ইউনিয়নের পূর্ব ইলশার সিরাজ কাজী বাড়ি থেকে বৃহস্পতিবার তোলা ছবি
পুকুরিয়া ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আমিন সিকদার জাগো নিউজকে বলেন, লক্ষাধিক মানুষ এখনো পানিবন্দি। অনেক পরিবার বাড়ির ভেতরেই আটকা পড়ে আছে।
তিনি বলেন, রান্নাঘর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চুলা জ্বালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বহু মানুষ শুকনো খাবারের ওপর নির্ভর করছে, আবার অনেক পরিবার না খেয়েই দিন কাটাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছে শিশু, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও অসুস্থ রোগীরা।
কৃষকদের অনেকেই বলছেন, পানি দ্রুত না নামলে চলতি মৌসুমের উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট ও বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বহু এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
এরই মধ্যে বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাঁশখালীর একটি উদ্ধার অভিযানের ভিডিও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, গলাসমান পানির মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা একটি বড় পাতিলে আট মাস বয়সী এক শিশুকে বসিয়ে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন।
বাঁশখালীর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, পানিবন্দি থাকার খবর পেয়ে উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান শুরু করে। পানির গভীরতা ও স্রোতের কথা বিবেচনায় নিয়ে শিশুটিকে বড় পাতিলে বসিয়ে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা হয়। পরে অন্যদেরও উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন
চট্টগ্রাম / সড়ক-নালা-ড্রেন একাকার, জলাবদ্ধ সড়কে ভাড়া নৈরাজ্য
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং বাসিন্দারা জরুরি ভিত্তিতে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রম জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
খোরশেদ নামের এক তরুণ সমাজসেবক জাগো নিউজকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য, ওষুধ, স্যালাইন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা এবং গবাদিপশুর জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করা জরুরি। পাশাপাশি আশ্রয়হীন হয়ে পড়া পরিবারগুলোর জন্য অস্থায়ী আশ্রয় ও নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
এছাড়া পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত মাটির ঘর ও কাঁচা বসতবাড়ি পুনর্নির্মাণে বিশেষ পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বন্যার পানিতে ডুবে গেছে জনপদ। কোমরসমান পানি পেরিয়ে প্রয়োজনীয় কাজে বের হয়েছেন এক বাসিন্দা। চট্টগ্রামের পূর্ব ইলশার সিরাজ কাজী বাড়ি থেকে বৃহস্পতিবার সকালে তোলা ছবি
বাহারচরা ইউনিয়নের ইলশা গ্রামের বাসিন্দা কাজী ইফাজ উদ্দীন জাগো নিউজকে বলেন, বন্যায় সব হারিয়েছি, খোলা আকাশের নিচে থাকা ছাড়া উপায় নেই। আমার পরিবারের একমাত্র সম্পদ ছিল ছোট একটি মাটির ঘর। সেটি ধসে যাওয়ায় এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছি। আমার খোলা আকাশের নিচে বাস করা ছাড়া আর উপায় নেই। পরিবারের সবকিছু নিয়ে গেছে পানি।
বৈলছড়ি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাকিবুল হাসান জাগো নিউজকে বলেন, পানি এত দ্রুত এলো, কিছুই সরানোর সুযোগ পাইনি। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিয়েছি। ঘরে এখনো পানি। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে। আমরা দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসনের সহায়তা চাই।
আরও পড়ুন
বর্ষায় নৌকার চাহিদা বাড়লেও সংকটে কারিগররা
এদিকে পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা, ক্ষতিগ্রস্ত বসতঘর, কৃষিজমি ও অবকাঠামোর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখনো প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন জাগো নিউজকে বলেন, অফিশিয়াল হিসাব মতে প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ এখানে পানিবন্দি আছে। তবে পানি এখন নামতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে সব রিকভারি হয়ে যাবে।
‘৩০ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে’- স্থানীয় বাসিন্দাদের এ দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আমি বলতে পারবো না। আবহাওয়া অফিস বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ জানাতে পারবে।
আরও পড়ুন
৪২ বছরের রেকর্ড বৃষ্টি, জলাবদ্ধতায় কার্যত অচল চট্টগ্রাম
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে আগামী কয়েক দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এতে উপকূলীয় নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাঁশখালীর দুর্গত মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠা আরও বাড়ছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. জহিরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, গত ৪ জুলাই সকাল ৯টা থেকে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুর ১২টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে মোট ১০১৭.২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আরও ২ দিন ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে। তাই সবাইকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে।
এমআরএএইচ/এমআইএইচএস/








