হামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দক্ষিণ এশিয়ায় একসময় সফল দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল বাংলাদেশ। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময় পরপর জাতীয় পর্যায়ে গণটিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয়েছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হামের নির্মূল কৌশলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ ২০০৬, ২০১০, ২০১৪ এবং কোভিড-১৯ মহামারির সময় ২০২০–২১ সালেও জাতীয় পর্যায়ে হামের টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করেছিল। এসব কর্মসূচি ও নিয়মিত টিকাদানের ফলে দেশে দীর্ঘ সময় ধরে টিকাদানের উচ্চ কভারেজ বজায় ছিল এবং জনসংখ্যার বড় অংশে হার্ড ইমিউনিটি গড়ে ওঠে।

কিন্তু সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে। ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়। এরপর ২০২৬ সালে দেশব্যাপী নতুন এমআর কর্মসূচিতে কভারেজ বেড়ে প্রায় ৮১ শতাংশে পৌঁছালেও প্রায় ৩৯ লাখ শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে।

অর্থাৎ টানা দুই বছরই ৯৫ শতাংশের প্রয়োজনীয় টিকাদান কভারেজ অর্জন করতে পারেনি বাংলাদেশ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই বছরের ঘাটতি শুধু চলতি বছরের সংক্রমণ নয়, আগামী কয়েক বছরও দেশে হামের ঝুঁকি বহাল রাখতে পারে।

কেন ৯৫ শতাংশ এত গুরুত্বপূর্ণ

হাম পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারেন। এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতে হয়। এই অবস্থাকেই বলা হয় হার্ড ইমিউনিটি। তখন কোনো এলাকায় অল্প সংখ্যক টিকা না পেলেও সংক্রমণ সহজে ছড়াতে পারে না।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, হার্ড ইমিউনিটি একদিনে তৈরি হয় না, আবার একদিনে ভেঙেও পড়ে না। কিন্তু টানা দুই বছর প্রয়োজনীয় কভারেজ না হলে ধীরে ধীরে ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরি হয়। এর ফল হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হামের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি থেকে যাবে।

মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘এক বছরে ঘাটতি হলে পরের বছর তা পূরণ করার সুযোগ থাকে। কিন্তু পরপর দুই বছর যদি প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিশু টিকা না পায়, তাহলে অরক্ষিত শিশুর সংখ্যা জমতে থাকে। এটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।’

রাজধানীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন হামের উপসর্গে ভোগা রোগীরা

বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের টিকা না পাওয়া শিশুর সঙ্গে পরের বছর নতুন জন্ম নেওয়া শিশুরাও যুক্ত হয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে একটি বড় অরক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি হয়ে যায়।

২০২৬ সালে বাংলাদেশে যে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, সেটিও মূলত এই ইমিউনিটি গ্যাপের ফল বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মনে করেছে।

সরকারি তথ্য অনুসারে, প্রাদুর্ভাবের পর গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম এবং এ রোগের উপসর্গ নিয়ে ৭৪২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়কালে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯০ হাজার ৫২২ জন। এ ছাড়া প্রায় ১৩ হাজার জনের হাম সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে।

৩৯ লাখ শিশু টিকার বাইরে

এবারের জাতীয় এমআর (হাম–রুবেলা) টিকাদান কর্মসূচিতে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬১৬ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু একই বয়সী শিশুদের জন্য ২৮ জুন পরিচালিত ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনে অংশ নেয় ২ কোটি ২৩ লাখের বেশি শিশু। অর্থাৎ প্রায় ৩৯ লাখ শিশু ভিটামিন ‘এ’ পেলেও এমআর টিকার আওতায় আসেনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও এই বড় ব্যবধানের কথা স্বীকার করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, অতীতেও ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন ও টিকাদান কর্মসূচির কভারেজে কিছু পার্থক্য ছিল, তবে এবার ব্যবধান ছিল অনেক বেশি। কেন এত শিশু বাদ পড়ল, তা নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে।

আক্রান্ত শিশুকে ওষুধ খাওয়ানো হচ্ছে। শিশু হাসপাতাল থেকে ৮ জুলাই তোলা।

জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এবার প্রায় ৮১ শতাংশ শিশু টিকা পেয়েছে। কিন্তু হামের মতো রোগের ক্ষেত্রে এটি যথেষ্ট নয়। একই সময়ে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে যত শিশুর কাছে পৌঁছানো গেছে, এমআর টিকায় ততজনকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি। এর অর্থ কর্মসূচির পরিকল্পনা, প্রচার ও বাস্তবায়নে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল।’

তাজুল ইসলামের ভাষায়, ‘এই ভলিউমের শিশু বাদ পড়া খুবই মারাত্মক। কারণ, তারা শুধু নিজেরাই ঝুঁকিতে নেই, অন্যদেরও ঝুঁকিতে ফেলবে।’

যে সাফল্য ছিল বাংলাদেশের

বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) আন্তর্জাতিকভাবে বহুবার প্রশংসিত হয়েছে। ১৯৭৯ সালে যাত্রা শুরু করা কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের পূর্ণ টিকাদান কভারেজ ধারাবাহিকভাবে বাড়ে। ২০০৬ সালের জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে কোটি কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। এরপর ২০১০ সালে ফলো-আপ ক্যাম্পেইন এবং ২০১৪ সালে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা কর্মসূচির মাধ্যমে ৫ কোটির বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়।

হাম–রুবেলার সম্মিলিত টিকা (এমআর ভ্যাকসিন) চালুর পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই টিকাদানের কভারেজ ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ ছিল। এর ফলে দেশে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এবং বাংলাদেশ রুবেলা নিয়ন্ত্রণেও সাফল্য অর্জন করে।

একসময় বাংলাদেশে এমন পরিস্থিতি ছিল যে অধিকাংশ এলাকায় প্রয়োজনীয় হার্ড ইমিউনিটি বজায় ছিল। ফলে কোনো এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে রোগী পাওয়া গেলেও বড় আকারে সংক্রমণ ছড়াতে দেখা যায়নি।

হাম আক্রান্ত এক শিশুকে কোলে নিয়ে আছেন এক অভিভাবক। রাজধানীর শিশু হাসপাতাল থেকে তোলা

এখন কী করা দরকার

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও অন্য অংশীদার সংস্থাগুলো বলছে, দেশে জরুরি এমআর টিকাদান কর্মসূচি ঠিক সময়েই শুরু হয়েছে, তবে কভারেজের বাইরে থাকা শিশুদের দ্রুত খুঁজে বের করে টিকার আওতায় আনতে না পারলে ঝুঁকি পুরোপুরি কাটবে না।

পরপর দুই বছর টিকার এই ঘাটতি পূরণ করতে জরুরি ভিত্তিতে কিছু কাজের কথা তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে প্রথমটি হলো পরিপূরক টিকাদান কর্মসূচি (এসআইএ)। এটি এমন এক কর্মসূচি যেখানে জাতীয় পর্যায়ের বিশেষ গণটিকাদান কর্মসূচিতে বাদ পড়া শিশুরাও সুরক্ষার আওতায় আসে।

হামে আক্রান্ত শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। শিশু হাসপাতাল থেকে ৮ জুলাই তোলা

তবে তা করার আগে টিকাদানের অবস্থার নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ দরকার বলে মনে করেন অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, অঞ্চলগুলো নির্দিষ্ট করতে হবে। এরপর টিকাদান শুরু করতে হবে সেই সব এলাকায়, যেখানে টিকাদান কম হয়েছে কিংবা যেখানে বেশি বাদ পড়েছে। কোন বয়সীরা বাদ গেল, বিশ্লেষণের মাধ্যমেই তা–ও তুলে ধরতে হবে।

অনেক সময় টিকাদান হয়ে গেলেও এর পর্যবেক্ষণ ভালোমতো হয় না। তাজুল ইসলাম এ বারী মনে করেন, জরুরি বিষয় হলো টিকাদানের যথাযথ মনিটরিং বা দেখভাল করা। আর ইপিআই যাতে নিয়মিত হয় তা সুনিশ্চিত করা।

আবার অনেক সময় টিকা দেওয়ার পরেও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি হয় না, এ বিষয়টি তুলে ধরে এ জন্য রক্ত পরীক্ষা করে দেখার পরামর্শও দেন তাজুল ইসলাম।