কয়েক দিন আগে মুক্তি পেয়েছে ‘টক্সিক’ সিনেমার প্রথম গান ‘তাবাহি’। গানটির দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য, যশ ও কিয়ারা আদভানির রসায়ন, পরিচালক গীতু মোহনদাসের গড়ে তোলা চাকচিক্য ও বাস্তবতার মিশেলে নির্মিত জগৎ—সব মিলিয়ে গানটি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই আলোচনার বড় একটি অংশ সিনেমাকে ঘিরে নয়।

কিয়ারা আদভানির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একবার দৃষ্টিপাত করলে পরিচিত একটি চিত্র দেখা যায়। তার অভিনয়, চরিত্র বা গল্প নিয়ে কথা বলার বদলে অনেকেই তার ব্যক্তিগত জীবন টেনে এনেছেন। কেউ কেউ তার স্বামী সিদ্ধার্থ মালহোত্রাকে ট্যাগ করেছেন, যেন পর্দার একটি কাল্পনিক প্রেমের জন্য কিয়ারাকে জবাবদিহি করতে হবে। আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন—বিবাহিত একজন নারী, যে এক সন্তানের মা, সে কীভাবে এমন অন্তরঙ্গ দৃশ্যে অভিনয় করতে পারেন!

কিয়ারার পাশাপাশি একই গানকে কেন্দ্র করে যশকে নিয়ে নেটিজেনরা কেমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, চলুন তা-ও একবার দেখা যাক। ব্যক্তিগত জীবনে যশও বিবাহিত, তার দুই সন্তান রয়েছে। কিন্তু তাকে নিয়ে প্রশংসার বন্যা বইয়ে দিয়েছেন। তার ব্যক্তিত্ব, পর্দার উপস্থিতি, সহশিল্পীর সঙ্গে রসায়ন—সবকিছু নিয়ে ভূয়সী প্রশংসা করছেন নেটিজেনরা। খুব কম মানুষই তার বিবাহিত জীবনকে আলোচনায় টেনে এনেছেন। কেউ প্রশ্ন করছেন না, তার স্ত্রী রাধিকা পণ্ডিত এ বিষয়ে কী ভাবছেন। কেউ বলছেন না, বাবা হওয়ার পর তার পেশাগত সিদ্ধান্ত বদলানো উচিত ছিল।

যশ বহুদিন ধরে নিজেকে আদর্শ পারিবারিক মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সেই চিত্রই দেখা যায়। বহু বছর ধরে ইনস্টাগ্রামে তিনি শুধু তার স্ত্রী রাধিকা পণ্ডিতকেই অনুসরণ করেন। ছোট হলেও এই বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত। নিবেদিত একজন স্বামী ও বাবার ভাবমূর্তিকে আরো দৃঢ় করেছে। দর্শকরাও সেই পরিচয়কে শ্রদ্ধা করেন এবং তা স্বাভাবিকও। কিন্তু যশ পর্দায় যখন রোমান্টিক চরিত্রে অভিনয় করেন, তখন সেই শ্রদ্ধা কমে যায় না। তার ব্যক্তিগত জীবন, পেশাগত সিদ্ধান্তকে আলাদা করে দেখা হয়। অথচ নারীদের ক্ষেত্রে একই উদারতা খুব কমই দেখা যায়।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—নেটিজেনদের একটি অংশ রাধিকা পণ্ডিতের পুরোনো একটি সিনেমার দৃশ্য পুনরায় সামনে এনে ‘তাবাহি’ গানকে এক ধরনের ব্যক্তিগত ‘প্রতিশোধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এটি এক অদ্ভুত বয়ান, যেখানে আবারো একজন নারীকেই নৈতিক বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে। যশের নতুন সিনেমা নিয়ে আলোচনা হলেও কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে রাধিকার বহু বছরের পুরোনো অভিনয়কে। এই বৈপরীত্য সত্যিই চোখে পড়ার মতো।

সমতা ও অগ্রগতির কথা যতই বলা হোক না কেন, জনসম্মুখে থাকা নারীদের ওপর এখনো এমন অনেক প্রত্যাশার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রায় কখনো দেখা যায় না। এই চিত্র নতুন নয়। বারবার দেখা গেছে, নারীদেরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ, সমালোচনা ও বিচার-বিশ্লেষণের প্রধান লক্ষ্য বানানো হয়। তাদের সিদ্ধান্ত খুঁটিয়ে দেখা হয়, সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, আর তাদের পেশাগত সাফল্য ব্যক্তিগত জীবনচর্চার আড়ালে চাপা পড়ে যায়। 

বাস্তবতাকে কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যাওয়ার আহ্বান বরাবরই জানিয়ে থাকে চলচ্চিত্র। আমরা অনায়াসে মেনে নিই, একজন অভিনেতা কখনো গ্যাংস্টার, কখনো মুক্তিযোদ্ধা, কখনো সুপারহিরো, আবার কখনো সিরিয়াল কিলারের চরিত্রে অভিনয় করছেন। কিন্তু যখন রোমান্স বা অন্তরঙ্গ দৃশ্যের কথা আসে, বিশেষ করে যদি সেখানে একজন নারী থাকেন, তখন অনেক দর্শক চরিত্র আর বাস্তব মানুষটিকে আলাদা করে দেখতে চান না।

কিয়ারা আদভানি ‘টক্সিক’ সিনেমার গানে যা করছেন, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অভিনেতারা করে আসছেন—একটি কাল্পনিক গল্পে একটি চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলছেন। স্ত্রী ও মা হিসেবে তার পরিচয়, তার ব্যক্তিগত জীবনের অংশ; সেটি তার পেশাগত কাজের সীমারেখা হতে পারে না। একই মানদণ্ড নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব অভিনেতার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হওয়া উচিত। সম্ভবত ‘তাবাহি’ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সকলের সামনে সেই আলোচনা এনে দিয়েছে। পর্দায় কে কাকে চুমু খেলেন, সেই প্রশ্ন নয়; বরং একই কাজ করার পরও কেন নারী ও পুরুষকে ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ডে বিচার করা হয়—প্রশ্ন সেটা।

*টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে