ভারতের আসামের প্রয়াত সংগীতশিল্পী জুবিন গার্গ ছিলেন কোটি ভক্তের প্রিয় কণ্ঠ। তবে শিল্পী পরিচয়ের বাইরেও তিনি ছিলেন অসাধারণ মানবিক একজন মানুষ। নিজের পারিশ্রমিকের বড় একটি অংশ নীরবে অসহায় মানুষের জন্য ব্যয় করতেন তিনি। এমনকি রাতের আঁধারে ঘুমিয়ে থাকা মানুষের চাদরের নিচে টাকা রেখে আসার মতো ঘটনাও ঘটিয়েছেন বহুবার। প্রয়াত এই শিল্পীকে কাছ থেকে দেখে এমনই স্মৃতিচারণ করেছেন নির্মাতা প্রীতম বন্দ্যোপাধ্যায়।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রীতম জানান, ‘ইডিয়ট’, ‘খোকা ৪২০’ ও ‘খিলাড়ি’সহ একাধিক সিনেমায় তার পরিচালনায় গান গেয়েছিলেন জুবিন গার্গ। সেই সময় নিয়মিত গুয়াহাটিতে যাওয়া-আসা ছিল তার। আর সেখানেই কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় শিল্পীর ব্যক্তিজীবন ও মানবিক দিক।

প্রীতমের ভাষ্য, রেকর্ডিং শেষ হলেই অতিথিদের নিয়ে খেতে বের হতেন জুবিন। অনেক সময় নিজেই বাতাবি লেবুর পাতা দিয়ে মুরগির মাংস রান্না করে সবাইকে খাওয়াতেন। গুয়াহাটির বিভিন্ন জায়গা ঘুরিয়ে দেখাতেন, নিজের গাড়িতে করে স্টুডিওতে নিয়ে যেতেন, আবার গভীর রাত বা ভোরে নিজেই হোটেলে পৌঁছে দিতেন।

তবে এসবের চেয়েও বেশি মুগ্ধ হয়েছেন জুবিনের উদারতায়। প্রীতম বলেন, ‘আমার নিজের চোখে দেখা। রেকর্ডিংয়ের পারিশ্রমিক পেয়েই রাতে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। এরপর সেই টাকার বড় অংশ পথের দরিদ্র মানুষদের দিয়ে দিতেন। অনেক সময় মানুষ ঘুমিয়ে থাকলে তাদের চাদরের নিচে টাকা রেখে আসতেন, যেন কেউ বুঝতেই না পারে।’

তিনি আরও জানান, গুয়াহাটির এক বৃদ্ধার দোকানে প্রায়ই পিঠা খেতে যেতেন জুবিন। একদিন তাকেও সেখানে নিয়ে যান। খাবারের দাম খুব বেশি না হলেও জুবিন না গুনেই কয়েক হাজার টাকা ওই বৃদ্ধার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। এছাড়া শীতের রাতে অসহায় মানুষের গায়ে নিজ হাতে কম্বল বা চাদর জড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও বহুবার দেখেছেন তিনি।

আরও পড়ুন

সানি লিওনের যে ছবি নিয়ে তোলপাড় নেটদুনিয়ায়

প্রীতমের ভাষায়, ‘জুবিনদা শুধু বড় শিল্পী ছিলেন না, তার মনও ছিল অনেক বড়। তিনি কোনো গান গাইলেই সেই গান জনপ্রিয় হয়ে যেত। কিন্তু মানুষ হিসেবে তিনি আরও বড় ছিলেন।’

২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে মারা যান জুবিন গার্গ। মৃত্যুর কয়েক দিন আগেও তার সঙ্গে কথা হয়েছিল প্রীতমের। ২৬ সেপ্টেম্বর তাদের দেখা হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই আসে মৃত্যুসংবাদ।
সেই শোক থেকেই জুবিনকে নিয়ে ‘লাভ ইউ জুবিনদা’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেন প্রীতম। সিনেমা নির্মাণের আগে জুবিনের স্ত্রী গরিমা শইকিয়ার অনুমতিও নিয়েছেন তিনি।

প্রীতম জানান, এখনো জুবিনের কথা উঠলেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন গরিমা। তার ভাষায়, ‘তিনি শুধু জুবিনদার স্ত্রী ছিলেন না, ছিলেন তার লড়াইয়ের সঙ্গী। আজও জুবিনদার কথা বলতে গেলে কেঁদে ফেলেন।’

জুবিনের মৃত্যুর পর আসমজুড়ে নেমে এসেছিল শোকের ছায়া। হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন প্রিয় শিল্পীকে। প্রীতমের দাবি, সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের খবর সবসময় রাখতেন জুবিন। কারও চিকিৎসা, কারও পড়াশোনা কিংবা মেয়ের বিয়ের জন্য নীরবে সাহায্য করতেন। এমনকি তার স্ত্রী বা ঘনিষ্ঠরাও অনেক সময় জানতেন না, তিনি কাদের কীভাবে সহায়তা করছেন।

প্রীতম বলেন, ‘শারীরিকভাবে জুবিনদা নেই, কিন্তু অসমের মানুষ এখনো তাকে ভুলতে পারেননি। তিনি মানুষের জন্য বেঁচেছিলেন, আর সেই কারণেই মানুষের হৃদয়ে আজও অমর হয়ে আছেন।’

আরও পড়ুন

ধর্ষণ মামলায় ম্যানেজার গ্রেফতার, মুখ খুললেন শ্রাবন্তী

জুবিন গার্গের শিল্পীসত্তার পাশাপাশি তার এই মানবিক রূপই এবার বড় পর্দায় তুলে ধরতে চান প্রীতম বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘লাভ ইউ জুবিনদা’ সিনেমার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চান একজন শিল্পীর আড়ালে লুকিয়ে থাকা অসাধারণ একজন মানুষের গল্প।

এমএমএফ