যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে আমরা ছিলাম মাত্র তিন দিন। অথচ সেই সফরের স্মৃতিতে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে লাস ভেগাসের অগণিত নিয়ন আলো নয়, ক্যাসিনোর ঝলমলে রাত নয়, রাতজাগা নগরীর নিরন্তর উৎসবও নয়—বরং এমন একটি দিন, যেদিন আমি আর আমার স্ত্রী শিরিন চৌধুরী গিয়েছিলাম অ্যারিজোনা রাজ্যের বুক চিরে প্রায় ২৭৭ মাইল দীর্ঘ ‘গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’ দেখতে। সময়টা ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর। গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ভ্রমণের জন্য সেপ্টেম্বর যেন প্রকৃতির নিজ হাতে বেছে রাখা এক অনুকূল ঋতু। গ্রীষ্মের প্রখরতা তখন ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে; দিনের রোদে মৃদু উষ্ণতা থাকলেও বাতাসে এসে গেছে শরতের কোমল শীতল স্পর্শ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাত হাজার ফুট উচ্চতার ‘দক্ষিণ রিম’-এ সকাল ও সন্ধ্যায় বেশ ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে—তাই সঙ্গে একটি হালকা জ্যাকেট বা সোয়েটার রাখা প্রয়োজন। কিন্তু সেই শীতলতা আমাদের কাছে কোনো অস্বস্তি হয়ে আসেনি; বরং মনে হয়েছিল, মহাকালের এই বিপুল প্রান্তরে প্রবেশের আগে প্রকৃতি যেন শীতল বাতাসে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে।
সেদিন সেখানে গিয়ে আমাদের মনে হয়নি আমরা নিছক কোনো বিখ্যাত পর্যটনস্থল দেখতে এসেছি। মনে হয়েছিল, পৃথিবী তার আত্মজীবনীর কয়েকটি অতি প্রাচীন পৃষ্ঠা আমাদের সামনে হঠাৎ খুলে দিয়েছে। সে বইয়ের পৃষ্ঠা কাগজের নয়, শিলার; তার অক্ষর কালির নয়, পলি, সমুদ্র, আগ্নেয়গিরি, জীবাশ্ম আর নদীর; আর তার প্রতিটি অধ্যায়ের দৈর্ঘ্য বছর–শতাব্দীতে নয়—মাপা হয় মিলিয়ন ও বিলিয়ন বছরে। একটির নিচে আরেকটি শিলাস্তর যেন পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়া যুগের স্তব্ধ পাণ্ডুলিপি। কোথাও প্রাচীন সমুদ্রের স্মৃতি, কোথাও বিলুপ্ত প্রাণের জীবাশ্ম-স্বাক্ষর, কোথাও আগ্নেয় অস্থিরতার দগদগে ইতিহাস, কোথাও আবার কলোরাডো নদীর অবিশ্রান্ত ক্ষয়ের চিহ্ন। প্রায় দুই বিলিয়ন (২০০ কোটি) বছরের ভূতাত্ত্বিক স্মৃতি সেখানে স্তরে স্তরে জমে আছে—নিঃশব্দ, অথচ কী আশ্চর্য বাঙ্ময়! সেই মুহূর্তে লাস ভেগাস আর গ্র্যান্ড ক্যানিয়নকে আমার কাছে একই ভ্রমণের দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত অধ্যায় বলে মনে হয়েছিল। লাস ভেগাস মানুষের তৈরি আলোর বিস্ময়—গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন সময়ের তৈরি নীরব মহাকাব্য।

আর সেই দুই বিস্ময়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হয়েছিল—মানুষের জীবন কত সংক্ষিপ্ত! আমরা কয়েক দশকের আয়ু নিয়ে ভালোবাসি, স্বপ্ন দেখি, ভ্রমণ করি, স্মৃতি জমাই; আর আমাদের সামনে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে শতকোটি বছরের পাথর।
আল্পসের ছায়ায় আমাদের বসন্তআলোর নগরীতে—
লাস ভেগাসকে প্রথম দেখায় মনে হয়, মরুভূমির বুকে মানুষ বুঝি রাতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। সন্ধ্যা নামতেই শহরটির পুনর্জন্ম ঘটে। ‘লাস ভেগাস স্ট্রিপ ধরে’ আলো, হোটেল, ক্যাসিনো, রেস্তোরাঁ, থিয়েটার—কোথাও প্যারিসের স্মৃতি, কোথাও ভেনিসের অনুকৃতি, কোথাও আধুনিক স্থাপত্যের ঔদ্ধত্য। হাজার মানুষ হেঁটে চলেছে; কোথাও সংগীত, কোথাও উৎসব, কোথাও ভাগ্যের চাকা ঘুরছে অবিরাম। রাত গভীর হয়, কিন্তু লাস ভেগাস ঘুমায় না। শিরিন পাশে। আমরা হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল—মানুষের কী আশ্চর্য স্বপ্নকল্পনা! মরুভূমির অন্ধকারেও সে আলো বানায়, শূন্যতার মধ্যে নগরী তোলে, বাস্তবের পাশে আরেকটি কল্পিত বাস্তব নির্মাণ করে। কিন্তু আমার মনে তখন অন্য একটি আকর্ষণ। পরদিন আমরা যাচ্ছি এমন এক স্থাপত্য দেখতে, যার কোনো স্থপতি নেই; এমন এক ভাস্কর্য, যার কোনো মানুষের হাতের ছোঁয়া নেই। তার স্থপতি—সময়।
মরুভূমি পেরিয়ে মহাকালের দিকে—
পরদিন সকাল। লাস ভেগাস পেছনে ফেলে আমাদের যাত্রা শুরু হলো গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের দিকে। শহরের কোলাহল ক্রমে মিলিয়ে গেল। দৃশ্যপট বদলাতে লাগল। চারপাশে শুষ্ক ভূমি, দূরের পাহাড়, মরুভূমির গাছপালা, দীর্ঘ রাস্তা আর বিস্তৃত নীল আকাশ, কোথাও মানুষের বসতি—আবার দীর্ঘ শূন্যতা। গাড়ি এগিয়ে চলেছে; অথচ আমার মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু মাইল অতিক্রম করছি না—সময়ের বিপরীত দিকেও চলেছি। তারপর একসময় এসে দাঁড়ালাম গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের দক্ষিণ কিনারায়। প্রথম দর্শনের সেই মুহূর্তটি আজও আমার মনে স্থির হয়ে আছে।
বাল্টিকের নীল জলরেখায় ফিরে দেখা এক তরুণ গবেষকের দিনগুলোগভীর নিচে কলোরাডো নদী—
প্রথম দর্শনের অনুভূতিটি ভাষায় ধরা কঠিন। ছবিতে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন অনেকবার দেখেছি। বইয়ে পড়েছি। ভূতত্ত্বের ইতিহাসে তার গুরুত্ব জানি। কিন্তু মানুষের চোখের একটি আশ্চর্য ক্ষমতা আছে—সে যখন কোনো মহত্ত্বর দৃশ্যকে সরাসরি দেখে, তখন সব পূর্বজ্ঞান মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। আমিও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। সামনে যেন পৃথিবী হঠাৎ খুলে গেছে। সামনে যেন পৃথিবীর বুক হঠাৎ খুলে গেছে। লাল, তামাটে, বাদামি, হলুদাভ, ধূসর, কোথাও বেগুনি আভা—একটির নিচে আরেকটি অসংখ্য শিলাস্তর নেমে গেছে অতল গভীরে। কোথাও খাড়া প্রাচীর, কোথাও টেবিলের মতো সমতল চূড়া, কোথাও গভীর খাদে জমাট অন্ধকার। দূরের পাহাড়গুলো রোদের মধ্যে এমনভাবে স্তরে স্তরে মিলিয়ে গেছে, যেন সময় নিজেই দিগন্তের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। দৃষ্টির শেষ প্রান্ত পর্যন্ত শুধু শিলার সাম্রাজ্য। শিরিন আমার পাশে। আমরা দুজন কিছুক্ষণ কথা বলিনি। কিছু সৌন্দর্য আছে, যাকে দেখে মানুষ কথা বলে; আর কিছু মহিমা আছে, যেমন গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন, যার সামনে ভাষাই নীরব হয়ে যায়।
পাথরের স্তরে পৃথিবীর গ্রন্থাগার—
গ্র্যান্ড ক্যানিয়নকে শুধু একটি সুবিশাল গিরিখাত বললে তার পরিচয়ের সামান্যই বলা হয়। আমার কাছে এটি পৃথিবীর এক উন্মুক্ত গ্রন্থাগার—যেখানে বই নেই, অথচ ইতিহাস আছে; অক্ষর নেই, অথচ পাঠ আছে। সেই ইতিহাস লেখা হয়েছে শিলার স্তরে, আর তার কোনো কোনো পাতায় জীবনের স্বাক্ষর হয়ে রয়ে গেছে জীবাশ্ম। ক্যানিয়নের গভীরতম উন্মুক্ত শিলাগুলোর বয়স প্রায় ১.৮৪ বিলিয়ন বা ১৮৪ কোটি বছর; আর একেবারে ওপরের দিকে, যে স্তরের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা অতল ক্যানিয়নের দিকে তাকাই, সেই ‘কাইবাব চুনাপাথর’–এর বয়স প্রায় ২৭ কোটি বছর—‘পার্মিয়ান’ যুগের স্মৃতি।
নেভা নদী: আমার নীরব সহযাত্রীএই একটি তথ্যই আমার কল্পনাকে যেন মুহূর্তে কয়েক শ মিলিয়ন বছর পেছনে নিয়ে গেল। আজ যেখানে আমরা প্রায় সাত হাজার ফুট উচ্চতায় দাঁড়িয়ে শুষ্ক বাতাসে দূরের পাথুরে দিগন্ত দেখি, সেই স্থানই একদিন ছিল উষ্ণ, অগভীর সমুদ্রের তলদেশ। সেখানে তখন মানুষ নেই, শহর নেই, এমনকি আজকের পরিচিত উত্তর আমেরিকার ভূচিত্রও নেই। সমুদ্রের তলায় ধীরে ধীরে জমছে ক্যালসিয়াম কার্বনেট, কাদা, বালু ও অসংখ্য সামুদ্রিক প্রাণীর দেহাবশেষ। ব্র্যাকিওপড, ক্রিনয়েড, স্পঞ্জ, প্রবাল, মলাস্ক—অচেনা সেই পৃথিবীতে তাদেরই ছিল প্রাণের ব্যস্ততা। তাদের কেউ কেউ মৃত্যুর পর পলির নিচে চাপা পড়ে দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় রেখে গেছে জীবাশ্মের চিহ্ন।
জীববিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে এই জায়গাটিই আমাকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করে। কারণ, জীবাশ্ম আমার কাছে শুধু মৃত প্রাণীর পাথুরে অবশেষ নয়—জীবাশ্ম হলো বিলুপ্ত জীবনের রেখে যাওয়া সাক্ষ্য। কোনো এক প্রাচীন সমুদ্রতলে একটি ট্রাইলোবাইট একদিন নরম পলির ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়েছিল; সে জানত না, তার প্রজাতি একদিন বিলুপ্ত হবে, মানুষ নামের প্রাণী পৃথিবীতে আসবে আরও বহু পরে, আর সেই মানুষ তার রেখে যাওয়া চিহ্ন দেখে কোটি বছর আগের পৃথিবীকে পুনর্গঠন করবে। জীবাশ্ম যেন আমাদের নীরবে বলে—আমি ছিলাম; অতএব আমার পৃথিবীও ছিল।
ক্যানিয়নের প্রতিটি শিলাস্তরও তেমনি একেকটি হারিয়ে যাওয়া পরিবেশের দলিল। চুনাপাথর জানায় প্রাচীন সমুদ্রের কথা, শেল মনে করিয়ে দেয় শান্ত জলে জমে থাকা সূক্ষ্ম পলির ইতিহাস, আর বেলেপাথর বহন করে প্রাচীন উপকূল কিংবা বালুময় পরিবেশের স্মৃতি। অর্থাৎ আজ যে ভূদৃশ্যকে স্থির বলে মনে হয়, তার অতীত ছিল নিরন্তর পরিবর্তনের—সমুদ্র এসেছে, সরে গেছে; পলি জমেছে, পাথর হয়েছে; ভূমি উত্থিত হয়েছে, আবার ক্ষয় তাকে কেটে নতুন রূপ দিয়েছে। পৃথিবীর স্থিরতা আসলে আমাদের স্বল্পায়ু চোখের ভ্রম; মহাকালের পরিসরে পৃথিবী নিরন্তর পরিবর্তনশীল।

আর ক্যানিয়নের বহু নিচে রয়েছে ‘বিষ্ণু তলদেশীয় শিলা’। প্রায় ১৮৪ কোটি বছরের পুরোনো এই রূপান্তরিত ও আগ্নেয় শিলাগুলো আমাদের নিয়ে যায় সুদূর প্রাক্-ক্যাম্ব্রিয়ান পৃথিবীতে—যখন মহাদেশের বিন্যাস ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রচণ্ড তাপ ও চাপ, ভূত্বকের সংঘর্ষ, শিলার রূপান্তর এবং ম্যাগমার অনুপ্রবেশের দীর্ঘ ইতিহাস সেখানে আজও জমাট হয়ে আছে।
ক্যানিয়নের কিনারায় দাঁড়িয়ে তখন মনে হয়েছিল—আমাদের আয়ু সত্তর, আশি কিংবা এক শ বছর; সভ্যতার ইতিহাসও মাত্র কয়েক হাজার বছরের। অথচ পায়ের নিচে কোটি কোটি বছরের পৃথিবী। আমরা তাকে নিছক পাথর বলি। কিন্তু সেদিন আমার মনে হয়েছিল—পাথর হয়তো সময়েরই আরেক রূপ;
সময় যখন পৃথিবীর বুকে জমাট বাঁধে, তখন তার নাম হয় শিলা—আর সেই শিলায় জীবনের কোনো চিহ্ন থেকে গেলে তার নাম জীবাশ্ম।
লেখক রাশিদুল হকের শ্বাসরুদ্ধকর ভ্রমণ অভিজ্ঞতায়, লাস ভেগাসের লাস্যময়ী রাত এবং অ্যারিজোনায় গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন-এর মহাকাব্যিক অতীত প্রকাশ পেয়েছে। জীবনের ছোট্ট সময়কে প্রকৃতির অসীম সময়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
কলোরাডো—নিঃশব্দ ভাস্কর—
অনেক নিচে কলোরাডো নদী। এত বিশাল ক্যানিয়নের মধ্যে ওপর থেকে তাকে কোথাও ক্ষীণ একটি রেখার মতো লাগে। অথচ সেই নদীই এই মহাকাব্যের প্রধান ভাস্করদের অন্যতম। ক্যানিয়নের শিলা শতকোটি বছরের পুরোনো হলেও বর্তমান গিরিখাতের প্রধান খোদাই তুলনামূলকভাবে নবীন—মূলত গত কয়েক মিলিয়ন বছরে কলোরাডো নদী ও তার সহযোগী ক্ষয়প্রক্রিয়া এই ভূদৃশ্যকে গভীর করেছে।
নদীটি পাহাড়কে কখনো বলেনি—আমি তোমাকে পরাজিত করব। সে শুধু বয়ে গেছে। দিনের পর দিন। লক্ষ বছর। মিলিয়ন বছর। জল সঙ্গে নিয়েছে বালু ও পাথরের টুকরা; তারা শিলাকে ঘষেছে, কেটেছে। বৃষ্টি, বরফ, তাপমাত্রার পরিবর্তন, ভূমিধস—সবাই যোগ দিয়েছে সেই কাজে। সেদিন নদীটির দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল, শক্তির সবচেয়ে গভীর রূপ হয়তো আঘাত নয়, অধ্যবসায়। পাহাড় প্রবল, কিন্তু নদীর হাতে আছে সময়। শেষ পর্যন্ত পাহাড়ই তাকে পথ ছেড়ে দেয়।
মহাকালের সামনে আমরা দুজন—
বিকেলের দিকে আলো বদলাতে লাগল। সূর্য একটু সরতেই ক্যানিয়ন-ও যেন নতুন রূপ নিল। ফিকে বাদামি দেয়ালে লাল আগুন জ্বলে উঠল; দূরের কোনো শিলাস্তর বেগুনি হলো; কোনো খাদ আরও গাঢ় ছায়ায় হারিয়ে গেল। আমি আর শিরিন ছবি তুললাম। একটি ছবিতে আমরা দুজন সামনে, পেছনে ‘গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’। পরে ছবিটির দিকে তাকিয়ে মনে হলো—ছবিতে আমরা বড় হয়ে আছি শুধু ক্যামেরার নিয়মে। সময়ের অনুপাতে দৃশ্যটি ঠিক উল্টো।
আমাদের জীবন কয়েক দশকের। আর পেছনের পাথর—কোটি কোটি বছরের। আমাদের দেহের কোষ জন্মায়, বিভাজিত হয়, বার্ধক্যে পৌঁছায়, একদিন থেমে যায়। অথচ আমাদের শরীরের কার্বন, ক্যালসিয়াম আয়রন—এসব মৌলও তো এই পৃথিবীরই প্রাচীন ইতিহাসের উত্তরাধিকার। সেদিন বিজ্ঞান আর দর্শন যেন একই জায়গায় এসে আমার সামনে দাঁড়াল। আমি ভাবলাম, আমরা কি সত্যিই প্রকৃতি থেকে আলাদা? নাকি শিলা, নদী, জীবাশ্ম, বৃক্ষ, শিরিন আর আমি—সবাই একই মহাজাগতিক ইতিহাসের ভিন্ন ভিন্ন ক্ষণ?
দিন শেষে আমরা ফিরলাম লাস ভেগাসে। পেছনে পড়ে রইল গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন। আবার মরুভূমি। তারপর দূরে একসময় দেখা দিল লাস ভেগাসের অসংখ্য আলো। কী আশ্চর্য বৈপরীত্য! কয়েক ঘণ্টা আগে দাঁড়িয়ে ছিলাম শতকোটি বছরের পাথরের সামনে; এখন ফিরে এসেছি এমন এক শহরে, যেখানে প্রতিমুহূর্তে আলো বদলায়, বিজ্ঞাপন বদলায়, মানুষের ভাগ্য বদলায়। লাস ভেগাস যেন বলে—এই মুহূর্তটিই সব। আর গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন বলে, এই মুহূর্তের আগেও সময় ছিল; তোমার পরেও সময় থাকবে। দুটিই সত্য। মানুষ এই দুই সত্যের মাঝখানে বাস করে।
ফিরে এসে যে প্রশ্নটি রয়ে গেল—
আমাদের জীবন চলে বছর দিয়ে; গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন-এর জীবন চলে মিলিয়ন এবং বিলিয়ন বছর দিয়ে। তারপরও আশ্চর্যভাবে সেই দুই সময় এক বিকেলে এসে মিলেছিল। আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম এমন শিলার সামনে, যার জন্মের সময় মানুষ ছিল না, পাখি ছিল না, ফুল ছিল না—এমনকি আজকের মহাদেশগুলোর পরিচিত বিন্যাসও ছিল না। সেই পাথরের গায়ে পরে সমুদ্রের স্মৃতি জমেছে, প্রাণীর ফসিল জমেছে, মরুভূমির বালু পাথর হয়েছে, টেকটোনিক শক্তি ভূমিকে তুলেছে, কলোরাডো নদী তাকে কেটেছে। শেষে কোটি কোটি বছরের সেই দীর্ঘ আয়োজনের সামনে এসে একদিন দাঁড়ালাম আমরা দুজন—আমি আর শিরিন।
হয়তো আমাদের উপস্থিতি গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন-এর কাছে কোনো ঘটনাই নয়। কিন্তু আমাদের কাছে? আমাদের জীবনের অল্প কয়েকটি দশকের মধ্যে সেই একটি দিন হয়ে রইল মহাকালের সঙ্গে সাক্ষাতের দিন। লাস ভেগাস আমাকে দেখিয়েছে মানুষ কত আলো সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন আমাকে আরেকটি কথা শিখিয়েছে—পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর সৌন্দর্য আলো দিয়ে তৈরি হয় না; তৈরি হয় সময় দিয়ে। আর সেদিন ক্যানিয়ন-এর কিনারায় দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছিল, পৃথিবী বুঝি তার দুই শ কোটি বছরের পুরোনো একটি বই আমাদের সামনে খুলে দিয়েছে।
আমরা তার সব অক্ষর পড়তে পারিনি। শুধু কয়েকটি পৃষ্ঠা দেখেছি। কয়েকটি ফসিল-এর গল্প জেনেছি। কয়েকটি শিলাস্তরের বয়স বুঝেছি। তারপর নীরবে ফিরে এসেছি। কিন্তু সেই বইটি আজও খোলা আছে। কলোরাডো নদী আজও তার নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। বাতাস আজও শিলার গায়ে হাত রাখছে। ক্ষয় আজও চলছে। সময় আজও লিখছে তার পরবর্তী অধ্যায়। আর আমাদের সেই এক দিনের ভ্রমণও এখন সেই অসীম সময়ের মধ্যে একটি অতি ক্ষুদ্র স্মৃতি—পাথরের নয়, আমাদের হৃদয়ের স্তরে জমে থাকা এক ব্যক্তিগত জীবাশ্ম।
*লেখক: অধ্যাপক রাশিদুল হক: সাবেক সহ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]







