ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা গানের আকাশ আলোকিত করে চলেছেন কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী। অসংখ্য কালজয়ী গান উপহার দিয়ে হয়ে উঠেছেন কোটি মানুষের আবেগের অংশ। সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন একুশে পদক, পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ বহু সম্মাননা। বুধবার (১ জুলাই) এই কিংবদন্তি শিল্পীর ৮৬তম জন্মদিন। ১৯৪০ সালের এই দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার শাহপুর গ্রামে তার জন্ম। 

সাফল্য, সম্মান আর ভালোবাসায় ভরা দীর্ঘ জীবনের দিকে ফিরে তাকালে একটি অপূর্ণতা আজও তাকে গভীরভাবে কষ্ট দেয়। সেটি হলো, বাবার ছোট্ট একটি অনুরোধ রাখতে পারেননি তিনি। সেই স্মৃতি আজও তাকে তাড়া করে বেড়ায়। 

এক সাক্ষাৎকারে সৈয়দ আব্দুল হাদী জানিয়েছিলেন, তার শৈশব কেটেছে আগরতলায় নানির কাছে। পরে বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে সিলেটে চলে আসেন। এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রংপুর ও ঢাকায় পড়াশোনা করেন। তার বাবা তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের (ইপিসিএস) কর্মকর্তা ছিলেন। বদলির চাকরির কারণে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় ঘুরে বেড়িয়েই কেটেছে তাদের পারিবারিক জীবন। 

শৈশবের পারিবারিক পরিবেশের কথা স্মরণ করে সৈয়দ আব্দুল হাদী বলেন, “তখন বাবার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভয়, দুটোই ছিল প্রবল। বাবার সামনে চোখ তুলে কথা বলার সাহসও হতো না। সেই সময় প্রায় প্রতিটি পরিবারেই এমন এক দূরত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল বাবা-সন্তানের মধ্যে।” 

এ প্রসঙ্গেই উঠে আসে তার জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপের কথা। স্মৃতিচারণ করে সৈয়দ আব্দুল হাদী বলেন, “একবার তার বাবা তখন পটুয়াখালীতে কর্মরত ছিলেন। সেখানে যাওয়ার জন্য ছেলেকে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছিলেন। অন্য অনেক শিল্পী সেখানে গেলেও তিনি আর যাননি।” 

এই ঘটনা স্মরণ করে আজও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সৈয়দ আব্দুল হাদী। তার ভাষায়, “এখনো বিষয়টা মনে হলে খুব খারাপ লাগে। নিজেকেই শাস্তি দিতে ইচ্ছা করে। বাবার এতটুকু অনুরোধও রাখতে পারিনি। পরে বাবা চাইতেন আমি যেন তার কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ বসি, গল্প করি। কিন্তু তখন আমি বরং ভাবতাম, কীভাবে দ্রুত উঠে আসা যায়।” 

জীবনের এই একটি স্মৃতিই আজও তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। সংগীতজীবনের শুরুর গল্পও কম চমকপ্রদ নয়। কোনো ওস্তাদের কাছে নিয়মতান্ত্রিকভাবে গান শেখার সুযোগ তার হয়নি। একসময় সেতার শেখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আঙুলে ফোসকা পড়ে যাওয়ায় ওস্তাদ তাকে বলেছিলেন, “এটা তোমার কাজ নয়, তুমি বরং গান করো।” সেই একটি পরামর্শই যেন বদলে দেয় তার জীবনের গতিপথ। 

পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন সৈয়দ আব্দুল হাদী। যদিও তার বাবা চেয়েছিলেন, পুত্র প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিক। কিন্তু তিনি বেছে নেন বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের পথ। জীবনের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই। 

দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সৈয়দ আব্দুল হাদীর উপলব্ধি, মানুষের জীবনে সাফল্য যেমন থাকে, তেমনই কিছু অপূর্ণতাও থেকে যায়। আর বাবা-মায়ের সঙ্গে কাটাতে না পারা সময়ের শূন্যতাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনা। 

দেশাত্মবোধক, আধুনিক ও চলচ্চিত্রের গানে সমান জনপ্রিয় সৈয়দ আব্দুল হাদী। ১৯৬০ সালে ছাত্রজীবন থেকেই চলচ্চিত্রে গান গাওয়া শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে ‘ডাকবাবু’ সিনেমায় মো. মনিরুজ্জামানের লেখা এবং আলী হোসেনের সুরে প্রথম একক কণ্ঠে গান গেয়ে চলচ্চিত্রে তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। 

তার গাওয়া অসংখ্য জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে—‘আছেন আমার মোক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টার’, ‘একবার যদি কেউ ভালোবাসতো’, ‘এই পৃথিবীর পান্থশালায়’, ‘চলে যায় যদি কেউ বাঁধন ছিঁড়ে’, ‘এমনও তো প্রেম হয়, কারো আপন হইতে পারলি না’, ‘কেউ কোনো দিন আমারে তো’, ‘যেও না সাথী’, ‘শূন্য হাতে আজ এসেছি’, ‘দুঃখ চিরসাথীরে’, ‘আমি তোমারই প্রেম ভিক্ষারী’, ‘চক্ষের নজর এমনি কইরা’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো’, ‘চোখ বুঝিলে দুনিয়া আন্ধার’, ‘সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তে তুমি’, ‘যে মাটির বুকে ঘুমিয়ে আছে’, ‘কথা বলবো না বলেছি’ প্রভৃতি। 

সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন সৈয়দ আব্দুল হাদী। ২০০০ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হন এই কিংবদন্তি শিল্পী। অথচ জীবনের এত অর্জনের মাঝেও বাবার একটি অনুরোধ রাখতে না পারার আক্ষেপই আজও তাকে সবচেয়ে বেশি পোড়ায়।