রাজধানীর আদাবরে স্থানীয় বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে হত্যা ও আহতের ঘটনায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্যের লড়াই ও চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছেন দলের একটি অংশ। স্থানীয় কিশোর গ্যাং নেতা মাসুমের নেতৃত্বে ওই হামলার দুদিন পার হলেও এখন পর্যন্ত মামলা হয়নি। পুলিশ সন্দেহভাজন হিসাবে তিনজনকে আটক করেছে।

অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিনের বিরোধ থেকে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনার আগের দিন সাদ্দামের ওপর হামলা হলে মোহাম্মদপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করলেও পুলিশ মামলা রেকর্ড বা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখাকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্বের অজুহাতে বুধবার রাতে রাজধানীর আদাবরে বিএনপির নবোদয় হাউজিং ইউনিটের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশারের ওপর হামলা চালায় প্রতিপক্ষ। তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা আবুল বাশারকে মৃত ঘোষণা করেন।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান যুগান্তরকে জানান, বৃহস্পতিবার নবোদয় হাউজিং থেকে তিনজনকে আটক করা হয়েছে। বিকাল পর্যন্ত কেউ মামলা করেননি।

স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নবোদয় কাঁচাবাজার ও আশপাশের এলাকায় আরেক বিএনপি নেতা মিরাজের রাজনৈতিক অফিস ঘিরে কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ, মাদক বিক্রি ও ছিনতাইচক্র সক্রিয় রয়েছে। মিরাজের ইন্ধনে কাঁচাবাজারের ফুটপাত, বিভিন্ন গ্যারেজ ও মাদকের স্পট থেকে কথিত সমিতির নামে চাঁদা তোলার কাজ করে গ্যাংয়ের আরেক সদস্য রিপন। মূলত এই চক্রের কর্মকাণ্ডে কেউ বাধা দিলে তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় নেতাদের অভিযোগ, কাঁচাবাজার এলাকায় ভ্যানের সবজি দোকান ও ফুটপাতের দোকান থেকে দৈনিক ১০০ টাকা করে সমিতির নামে চাঁদা তোলা হয়। এ টাকা ১০০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিরাজ ও রিপন আদায় করেন। ফুটপাত থেকে টাকা তোলা নিয়ে এর আগেও কয়েক দফায় মিরাজের সঙ্গে স্থানীয় নেতাকর্মীদের বাগ্বিতণ্ডা হয়েছে। মূলত আগের ঘটনার জেরে ২৯ জুন নতুন করে ঝামেলার সূত্রপাত হয়। আদাবর থানা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হাবিব হাসান যুগান্তরকে বলেন, ওইদিন রাত আড়াইটায় ব্রাজিল বনাম জাপানের খেলা শেষে রিপনের ভাই নিরব আমার বাসার সামনে উচ্চস্বরে ঢোল বাজালে নিষেধ করি। এতে তারা আরও জোরে বাজাতে থাকলে নিরবকে একটা থাপ্পড় দিই। এরপর নিরবের ভাই রিপন আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে কোপানোর জন্য খুঁজতে থাকে। বিষয়টি আমার ভাগ্নে সাদ্দাম জানার পর তাদের ডেকে সাবধান করে দেয়। তখন তারা সাদ্দামকে মারধর করে মাথা ফাটিয়ে দেয়। বিষয়টি নিয়ে মোহাম্মদপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দিলে পুলিশ মামলা নেয়নি বা কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি। একপর্যায়ে স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

হাবিব হাসান বলেন, সংঘর্ষ, হামলার ঘটনাগুলো একদিনে ঘটেছে এমন নয়। নবোদয় বাজারের ফুটপাত ও সবজি দোকানে সমিতির নামে চাঁদা তোলাসহ নানা বিষয় নিয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কোন্দল চলছিল। তারই বহিঃপ্রকাশ এ হত্যাকাণ্ড।

ভুক্তভোগীদের স্বজন ও বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, স্থানীয় কিশোর গ্যাং নেতা মাসুমের নেতৃত্বে তার ভাই রবিন ও নাহিদ সরাসরি বাশার ও সাদ্দামের ওপর হামলা করে। তাদের সঙ্গে কিশোর গ্যাং সদস্য রিপন, নিরব, পারভেজ, মজনু, সুমন ও শহিদ নামে আরও কয়েকজন সরাসরি হামলায় জড়িত ছিল। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হামলায় অংশ নেওয়া মাসুমের নামে হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।

কয়েকটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানাও রয়েছে।

তিনি স্থানীয় কিশোর গ্যাং চক্রের মূলহোতা হিসাবে পরিচিত।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত সাদ্দাম হোসেনের মা কোকিলা খাতুন হামলাকারীদের শাস্তি চেয়ে বলেন, হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ির কারণে এখন পর্যন্ত মামলা করতে পারিনি। তবে খুব দ্রুত মামলা করব। মামলা করার পর তার ওপর কিংবা আত্মীয়স্বজনের ওপর আবারও হামলা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।

নিহত আবুল বাশারের বড় ভাই সবুজ মিয়া বলেন, পূর্বশত্রুতার জেরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। তার ভাই বিশ্বকাপ খেলা দেখা নিয়ে ঝামেলা হওয়া সালিশ বৈঠকে গিয়েছিলেন। সেখানে মীমাংসা করে ফেরার পথে ৮ থেকে ১০ জন তাদের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। তারা দ্রুত মামলা করবেন বলে জানান।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে মিরাজকে একাধিকবার কল করা হলে তার নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। এছাড়া অভিযোগ করার পর মামলা না নেওয়ার বিষয়ে জানতে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) একাধিকবার কল ও এসএমএস করা হলেও রিসিভ করেননি।