ফুটবলের রাজার সামনে নত হয়েছিল কি সত্যিই যুদ্ধের শক্তি? ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমান্টিক কিংবদন্তি- পেলে যখন নাইজেরিয়ায় পা রাখেন, তখন যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন দুই শত্রুপক্ষ। সত্যি নাকি মিথ্যে?১৯৬৯ সাল। নাইজেরিয়া জ্বলছে। পূর্বাঞ্চলের ইগো জনগোষ্ঠী বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘বিয়াফ্রা প্রজাতন্ত্র’ ঘোষণা করেছে, আর কেন্দ্রীয় সরকার তা মেনে নিতে রাজি নয়। রক্তক্ষয়ী এই গৃহযুদ্ধে তখন প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ১০ লাখ মানুষ।ডিপ্লোম্যাটদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ। সেখানে হাজির হন ‘ও রেই’- ফুটবলের সম্রাট পেলে। আর সাথে সাথেই ম্যাজিক ঘটে যায়! বিশ্বমাধ্যম খবর দেয়- যুদ্ধরত দুই পক্ষ ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়, শুধু পেলের খেলা দেখার জন্য।খবরটি ২০০৫ সালে টাইম ম্যাগাজিনে এসেছে এভাবে: ‘দুই বছর ধরে কূটনীতিকরা যেখানে ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে সফল হলেন পেলে। ১৯৬৯ সালে নাইজেরিয়ায় এলেন ব্রাজিলের ফুটবল সম্রাট- এবং এলো তিন দিনের যুদ্ধবিরতি!’কিন্তু ইতিহাস যত গভীরে যায়, কিংবদন্তি তত ধোঁয়াশায় ঢেকে যায়। গবেষকরা যখন নাইজেরিয়ার সংবাদপত্রের আর্কাইভ ঘাঁটলেন- সেখানে তখনকার ‘নাইজেরিয়ান ডেইলি টাইমস’ ও ‘অবজারভার’- কোনো যুদ্ধবিরতির উল্লেখ নেই! যা অবিশ্বাস্য, কারণ সান্তোসের প্রতিটি পদক্ষেপ তখন সংবাদপত্রে উঠে এসেছে।পেলে নিজেও দ্বিধায় ছিলেন। ১৯৭৭ সালের প্রথম আত্মজীবনীতে এই কিংবদন্তির কথা নেই। ২০০৭ সালের আত্মজীবনীতে এসে তিনি লেখেন, ‘নিশ্চিত নই পুরোপুরি সত্যি কিনা... তবে নাইজেরিয়ানরা নিশ্চয়ই ব্যবস্থা করেছিল বিয়াফ্রানরা যেন লাগোসে হামলা না করে, যতক্ষণ আমরা সেখানে আছি।’তাহলে আসলে কী ঘটেছিল? ইতিহাসবিদ জোসে পাওলো ফ্লোরেঞ্জানোর গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। সান্তোসের খেলা বসেছিল লাগোস ও বেনিন সিটিতে- যুদ্ধের মূলক্ষেত্র থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে। সেখানকার পরিস্থিতি ছিল তুলনামূলক নিরাপদ। যুদ্ধবিরতির কোনো প্রয়োজনই ছিল না। বরং পেলেকে ব্যবহার করা হয়েছিল ‘প্রোপাগান্ডা টুল’ হিসেবে। নাইজেরিয়া সরকার চেয়েছিল বিশ্বকে দেখাতে- দেশে যুদ্ধ চললেও স্বাভাবিক জীবন আছে। মানুষ ফুটবল উপভোগ করছে। তাই সান্তোসকে আবার ফিরিয়ে আনা হলো বেনিন সিটিতে। স্থানীয় গভর্নর স্যামুয়েল ওগবেমুডিয়া পাবলিক হলিডে ঘোষণা করেন, যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে ব্রিজ খুলে দেওয়া হয়- যাতে মানুষ খেলা দেখতে পারে। পেলের সতীর্থ এডুর ভাষ্য, ‘আমাদের দল যুদ্ধ বন্ধ করবে- এমন কথা কেউ বলেনি।’ তবে সেই সাক্ষীও আছেন, যারা এখনও স্বপ্ন দেখেন। স্থানীয় ফুটবলার গডউইন ইজিলেইন বিবিসিকে বলেছেন, ‘ম্যাচের দিন কেউ আর বন্দুকের কথা ভাবেনি।’ পেলের দল যখন খেলা শেষে বিমানে উঠল, তখন নিচ থেকে ভেসে এল গুলির শব্দ- যুদ্ধ আবার শুরু হয়েছে।সেটাই হয়তো আসল সত্যি- কিংবদন্তি শুধু যুদ্ধ থামায়নি; আক্ষরিক অর্থে যুদ্ধের মাঝে মানুষকে ফিরিয়ে দিয়েছিল স্বাভাবিক জীবনে, ৯০ মিনিটের জন্য হলেও।