গত এক দশকে দেশে ফলের উৎপাদন বেড়েছে এক-তৃতীয়াংশ। আগে বছরে ফল উৎপাদন হতো কমবেশি এক কোটি টন। গত অর্থবছরে সেটা দেড় কোটি টন ছাড়িয়েছে। বিশ্বে ফল উৎপাদন ও উৎপাদন বৃদ্ধির হারে এখন বাংলাদেশ একটি দৃষ্টান্ত। বছরে প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে ১১ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য বলছে, বিশ্বে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির হার ও হেক্টরপ্রতি ফলের উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষে। এছাড়া বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ১০টি শীর্ষ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল (ট্রপিক্যাল ফ্রুট) উৎপাদনকারী দেশের একটি।

আরও পড়ুন

দেশি গাবের স্বাস্থ্য উপকারিতা, জানলে অবাক হবেন

এফএওর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বৈশ্বিক ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ একের পর এক রেকর্ড ভেঙে এগিয়ে চলেছে। বর্তমানে বার্ষিক কাঁঠাল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়, আম উৎপাদনে সপ্তম এবং পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থানে রয়েছে।

দেশে শুধু উৎপাদনে বিস্ময় নয়, এখন বাংলাদেশ বৈশ্বিক রপ্তানি বাজারেও একটি প্রতিযোগী। আম ও কাঁঠালসহ বেশকিছু ফল রপ্তানি উন্নয়নে সরকার কাজ করছে।-কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম

কৃষি বিভাগ বলছে, বাণিজ্যিক উৎপাদন বাড়ায় দেশে ফল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। আম, পেয়ারা, লিচু, আনারস, ড্রাগন ও তরমুজসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি প্রজাতির ফলের উৎপাদন বেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের ফলের চাহিদা বাড়ছে।

নিরাপদ ও মানসম্মত ফল উৎপাদন, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের সম্প্রসারণ এবং রপ্তানি আরও বাড়ানো গেলে ফলের উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।

দেশি ফলতরমুজ

এ খাতে অপচয় রোধ, জাত উদ্ভাবন ও বছরব্যাপী সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এছাড়া এ খাতে চাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিয়মিত দেশীয় ফল গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার কার্যক্রম দরকার বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, একসময় ফল চাষ কেবল বসতবাড়ির আঙিনায় সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা বৃহৎ পরিসরে বাণিজ্যিক রূপ নিয়েছে। দেশে আম, পেয়ারা ও লিচুর পাশাপাশি আনারস, ড্রাগন এবং তরমুজের মতো দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির ফলের চাষ ব্যাপক হারে বেড়েছে।

নিরাপদ ও মানসম্মত ফল উৎপাদন নিশ্চিত করতে ‘উত্তম কৃষি চর্চা’ (GAP) নীতিমালা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে দেশে আধুনিক জাত উদ্ভাবন ও বছরব্যাপী ফল সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার (কোল্ড চেইন) এবং আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।-কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান

ফলে শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ পুষ্টির চাহিদাই মিটছে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের ফলের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারে নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশের ফল।

ফল

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশে শুধু উৎপাদনে বিস্ময় নয়, এখন বাংলাদেশ বৈশ্বিক রপ্তানি বাজারেও একটি প্রতিযোগী। আম ও কাঁঠালসহ বেশকিছু ফল রপ্তানি উন্নয়নে সরকার কাজ করছে।’

তবে ফল উৎপাদনে এই সাফল্যের ধারা আরও টেকসই করতে এবং রপ্তানি বাজার আরও সম্প্রসারিত করতে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও পড়ুন

এক যুগে দেশে ফলের উৎপাদন বেড়েছে ৫০ লাখ টন

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান জাগো নিউজকে বলেন, নিরাপদ ও মানসম্মত ফল উৎপাদন নিশ্চিত করতে ‘উত্তম কৃষি চর্চা’ (GAP) নীতিমালা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে দেশে আধুনিক জাত উদ্ভাবন ও বছরব্যাপী ফল সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার (কোল্ড চেইন) এবং আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘পাশাপাশি রপ্তানির প্রতিবন্ধকতা দূর করা, প্রক্রিয়াকরণে সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি ও চাষিদের ফলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা দরকার।’

দেশি ফলবিভিন্ন ধরনের দেশি ফল

তথ্য বলছে, দেশে এখন বছরে ১ কোটি ৫১ লাখ টন ফল উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে আম ২৭ লাখ টন, কলা ২২ লাখ টন ও কাঁঠাল উৎপাদন হচ্ছে ১৮ লাখ টন। এছাড়া প্রায় ১২ লাখ টন তরমুজ, ৬ লাখ টন করে পেঁপে ও পেয়ারা উৎপাদন হচ্ছে। এছাড়া দুই থেকে তিন লাখ টন করে আনারস, লিচু ও বরই উৎপাদন হয় দেশে। ড্রাগনের উৎপাদন লাখ টনের কাছাকাছি।

এছাড়া জাম, কামরাঙা, কদবেল, লেবু, লটকন, আতা ও সফেদার মতো ফলগুলোও বড় আকারে চাষ করা হচ্ছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদেশি জাতের ফল ড্রাগন, মাল্টা, স্টবেরিসহ প্রায় ১২ ধরনের ফলের বাণিজ্যিক চাষাবাদ। ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে বিদেশি ফলের চাষও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

যেহেতু প্রধান খাদ্য হিসেবে ধান ততটা লাভজনক নয়, তাই বিপুল সংখ্যক কৃষক ফল উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছেন।-বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মসিউর রহমান 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত অর্থবছর (২০২৪-২৫) দেশে এক কোটি ৫০ লাখ ৩৩ হাজার টন ফল উৎপাদন হয়েছে। এসব ফল চাষ হয়েছে দেশের ৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫৯ হেক্টর জমিতে। ঠিক একযুগ আগে অর্থাৎ, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশে ফলের উৎপাদন ছিল ৯৯ লাখ ৭২ হাজার টন। ওই সময় ৬ লাখ ৭৮ হাজার ১৪৫ হেক্টর জমিতে ফল চাষ হতো।

কাঁঠালকাঁঠাল

এরপর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ কোটি ৬ লাখ টন, পরের বছর ১ কোটি ১০ লাখ, এরপর ১ কোটি ২০ লাখ টন ফল উৎপাদন হয় দেশে। পরের দুই বছর (২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছর) উৎপাদন ছিল ১ কোটি ২১ লাখের ঘরে। এর পরের অর্থবছরগুলো যথাক্রমে উৎপাদন হয় ১ কোটি ২৩ লাখ টন, ১ কোটি ২২ লাখ, ১ কোটি ৪৩ লাখ ও ১ কোটি ৫০ লাখ টন।

আরও পড়ুন

১৩ হাজার কোটি টাকার আমের বাজারে রপ্তানি তলানিতে

২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৪৮ লাখ ১০ হাজার টন ফল। ফল চাষের জমির পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৫৭ হাজার ৪৯৬ হেক্টর।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে মানুষ যেমন তাদের খাদ্যাভ্যাস বদলে স্বাস্থ্যকর খাবারের দিকে মনোযোগ বাড়িয়েছে, একই সঙ্গে তাদের ক্রয়ক্ষমতাও বেড়েছে। এ কারণে সার্বিকভাবে ফলের চাহিদা বেড়েছে। ধারাবাহিকভাবে আরও বেশি কৃষক ফল উৎপাদনে আগ্রহী হচ্ছেন।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মসিউর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘যেহেতু প্রধান খাদ্য হিসেবে ধান ততটা লাভজনক নয়, তাই বিপুল সংখ্যক কৃষক ফল উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছেন।’

কৃষকরা ফল চাষের জন্য প্রতিটি সম্ভাব্য জায়গা ব্যবহার করছেন জানিয়ে বলেন, ‘তারা লাভবানও হচ্ছেন। বিশেষ করে তরুণ ও শিক্ষিত উদ্যোক্তারা আসছেন। অনেক কৃষিজমি এখন ফলের বাগানে পরিণত হয়েছে।’

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এক দশক আগে বাংলাদেশে উৎপাদিত ফলের সংখ্যা ছিল ৫৬টি, যা এখন বেড়ে ৭৮টিতে দাঁড়িয়েছে।

এনএইচ/এএসএ/এমএফএ