রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, করজাল সম্প্রসারণ এবং কর প্রশাসনকে আরও স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব ব্যবস্থায় ১২টি বড় সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং কাস্টমস-এই তিন খাতে আইনগত সংস্কার, ডিজিটাল রূপান্তর, ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা, করদাতা সেবা সহজীকরণ এবং তথ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে রাজস্ব ব্যবস্থাকে আধুনিক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি ২০২৬-২৭ থেকে ২০২৮-২৯’ শীর্ষক অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় এসব উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, আয়কর ব্যবস্থায় আইনগত ও নীতিগত সংস্কারের অংশ হিসেবে ২০২৩ সালের আয়কর আইন কার্যকর হয়েছে। এর মাধ্যমে সহজবোধ্য, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এবং সহজে অনুসরণযোগ্য প্রত্যক্ষ কর কাঠামো প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালে আইনের আনুষ্ঠানিক ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশের ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং কর-চুক্তির অংশীজনদের জন্য আইনগত স্বচ্ছতা আরও বেড়েছে।

এতে আরও বলা হয়েছে, কর প্রশাসনে ডিজিটাল সংস্কারের ফলে ২০২৫ অর্থবছরের বর্ধিত সময়সীমা শেষে নিবন্ধিত টিআইএনধারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ এবং দাখিল হওয়া আয়কর রিটার্নের সংখ্যা প্রায় ৪৩ লাখে পৌঁছেছে। একই অর্থবছর থেকে ব্যক্তিগত আয়কর রিটার্ন অনলাইনে দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি মোট ৪৫টি সেবার ক্ষেত্রে কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র বাধ্যতামূলক করায় করদাতার অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

পর্যালোচনায় আরও বলা হয়, আয়কর ব্যবস্থায় ডিজিটাল কমপ্লায়েন্স জোরদারের অংশ হিসেবে প্রায় ৪৩ লাখ ই-রিটার্ন জমা পড়েছে। চালু হয়েছে ‘কর প্রতিনিধি ব্যবস্থাপনা সিস্টেম’। যার মাধ্যমে কর প্রতিনিধিদের মাধ্যমে অনলাইনে রিটার্ন দাখিল সহজ হয়েছে। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরাও এখন সম্পূর্ণ অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করতে পারছেন। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে ই-চালানে কর পরিশোধ সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে।

এছাড়া, এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড ও ই-রিটার্ন প্ল্যাটফর্মের মধ্যে তথ্য সমন্বয় স্থাপনের ফলে আমদানি পর্যায়ে দেওয়া অগ্রিম আয়কর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় হচ্ছে এবং ঘোষিত আয়ের সঙ্গে আমদানি তথ্য যাচাই করা যাচ্ছে। ভবিষ্যতে ব্যাংক হিসাবের স্থিতি, সুদ আয় এবং উৎসে কর কর্তনের তথ্যও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ই-রিটার্নে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কর নিরীক্ষা ব্যবস্থায়ও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২০২৩-২৪ করবর্ষে ১৫ হাজার ৪৯৪টি রিটার্ন সম্পূর্ণ র‍্যান্ডম পদ্ধতিতে এবং ৭২ হাজার ৩৪১টি রিটার্ন ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় নিরীক্ষার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। ম্যানুয়ালভাবে রিটার্ন বাছাইয়ের পদ্ধতি বাতিল করায় প্রশাসনিক বিবেচনার সুযোগ কমেছে এবং তথ্যভিত্তিক কর নির্ধারণের পথ সুগম হয়েছে।

ভ্যাট খাতে ২০২৫ সালের সংশোধনের মাধ্যমে করযোগ্য কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভ্যাট নিবন্ধনের সীমা ৩ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ লাখ টাকা এবং টার্নওভার করের সীমা ৫০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৩০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে, আগে ভ্যাটের বাইরে থাকা বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠান এখন ভ্যাট নেটের আওতায় এসেছে। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিবন্ধিত ভ্যাটদাতার সংখ্যা ৫ লাখ থেকে বেড়ে ৮ লাখে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে ভ্যাট অনলাইন সিস্টেম ১৪টি মডিউলের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে অনলাইন নিবন্ধন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নিরীক্ষা, মামলা ব্যবস্থাপনা, নথি সংরক্ষণ এবং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ই-ভ্যাট প্ল্যাটফর্মে এখন প্রায় সব ভ্যাট রিটার্ন অনলাইনে জমা দেওয়া হচ্ছে। মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি তাদের ইআরপি সফটওয়্যার থেকে রিটার্ন জমা দিতে পারছে। ই-চালান ও ই-পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে কর পরিশোধও পুরোপুরি ডিজিটাল করা হয়েছে এবং আইবাস++ এর সঙ্গে তাৎক্ষণিক সমন্বয় নিশ্চিত করা হচ্ছে।

ভ্যাট নিরীক্ষা ব্যবস্থায় ২০টি ঝুঁকি সূচকের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় নিরীক্ষা চালু হয়েছে। এর আওতায় ৬০০ প্রতিষ্ঠানকে পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। একইসঙ্গে স্বয়ংক্রিয় ভ্যাট রিফান্ড ব্যবস্থা চালুর ফলে সরকারি কোষাগার থেকে সরাসরি করদাতার ব্যাংক হিসাবে ফেরত অর্থ পাঠানো হচ্ছে, যা ব্যবসায়ীদের সময় ও ব্যয় কমাবে বলে আশা করছে সরকার। কাস্টমস খাতেও একাধিক সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডোর মাধ্যমে বর্তমানে ১৯টি সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা একটি একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়েছে। এই প্ল্যাটফর্ম থেকে এরইমধ্যে ১০ লাখের বেশি সনদ, লাইসেন্স ও অনুমতিপত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইস্যু করা হয়েছে।

অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও))ব্যবস্থা চালুর ফলে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলো আমদানির ক্ষেত্রে দ্রুত কাস্টমস ছাড় ও দ্বৈত ডেলিভারি সুবিধা পাচ্ছে। পাশাপাশি এইচ এস কোড ম্যাচিং সংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে স্বয়ংক্রিয় শ্রেণিকরণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে কাস্টমস বন্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালুর ফলে বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইনে সেবা নিচ্ছে। এছাড়া, এসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং বিজিএমইএর ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন সিস্টেম সংযুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে চালান যাচাই, কার্গো ব্যবস্থাপনা এবং রপ্তানি ছাড় কার্যক্রম আরও দ্রুত ও স্বচ্ছ হয়েছে।

বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়াতে এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড ভিত্তিক ডিজিটাল নিলাম ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থলবন্দরগুলোতে ট্রাক চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য ট্র‍্যাক মুভমেন্ট মডিউল চালু হয়েছে, যা পণ্য পরিবহনে ডিজিটাল নজরদারি নিশ্চিত করছে।

এছাড়া রাজস্ব ব্যবস্থার সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে একটি সিকিউরিটি অপারেশনস সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। একই সঙ্গে তথ্যভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা, নতুন সিঅ্যান্ডএফ ও শিপিং এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা এবং ব্যাংক গ্যারান্টিভিত্তিক আমদানি সুবিধা চালুর মাধ্যমে কাস্টমস প্রশাসনকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এসএম/এএমএ