সকালের নাশতায় যে আপেল বা আমের জুস খাচ্ছেন, তার ফেলে দেওয়া পাতা বা খোসা দিয়েই হয়তো তৈরি হতে পারে আপনার পায়ের দামি স্নিকার্স বা হাতের স্টাইলিশ ব্যাগ! শুনতে রূপকথার মতো মনে হলেও এটাই এখন আন্তর্জাতিক ফ্যাশন দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বাস্তব। বিশ্বজুড়ে টেকসই ফ্যাশনের এক নতুন ট্রেন্ড শুরু হয়েছে, যেখানে মূল কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে আনারস, আপেল, আঙুর কিংবা কমলার খোসা। ফলের এই বর্জ্য আধুনিক জৈব-প্রযুক্তির মাধ্যমে রূপ দেওয়া হচ্ছে প্রিমিয়াম ‘ভেগান লেদারে’ (Vegan Leather), যা কাঁপিয়ে দিচ্ছে প্যারিস থেকে মিলানের ফ্যাশন রানওয়ে।
কোন কোন ফল দিয়ে তৈরি হচ্ছে ভেগান লেদার?
প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় এখন বিভিন্ন ধরনের ফলের উপজাত ব্যবহার করে এই প্রিমিয়াম ভেগান লেদার তৈরি করা হচ্ছে:
আপেলের খোসা (AppleSkin): জুস ও জ্যাম ফ্যাক্টরি থেকে সংগৃহীত আপেলের খোসা এবং ভেতরের অবশিষ্ট অংশ থেকে তৈরি হয় অত্যন্ত মসৃণ এই চামড়া। ইতালির ‘Frumat’ নামে একটি কোম্পানি প্রথম এই ফেলে দেওয়া পোমাস বা বর্জ্য সংগ্রহ করে তা থেকে মসৃণ ও প্রিমিয়াম কোয়ালিটির চামড়া তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে।
আঙুরের বর্জ্য (Grape Leather): মদ (ওয়াইন) তৈরির পর আঙুরের যে অবশিষ্টাংশ থাকে, তা দিয়ে তৈরি হচ্ছে দামি ভেগান চামড়া। ওয়াইন ফ্যাক্টরিগুলোতে আঙুর চেপে রস বের করে নেওয়ার পর পাত্রের নিচে যে কঠিন অংশটি পড়ে থাকে, তাকে ‘গ্রেপ পোমাস’ বলা হয়। এর মধ্যে থাকে আঙুরের খোসা, বীজ, ডাঁটা এবং সামান্য শাঁস। ইতালির বিখ্যাত বায়োটেক কোম্পানি VEGEA প্রথম এই বর্জ্য থেকে ‘গ্রেপ স্কিন’ বা ‘ওয়াইন লেদার’ তৈরির পেটেন্ট প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে।
আনারসের পাতা দিয়ে তৈরি হচ্ছে ভেগান লেদার/ ছবি: আনানাস আনাম
আনারসের পাতা (Piñatex): আনারস কাটার পর যে পাতাগুলো ফেলে দেওয়া হয়, তা থেকে তৈরি হয় বিখ্যাত পিন্যাটেক্স বা আনারস লেদার। এই যুগান্তকারী উদ্ভাবনটির পেটেন্ট এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন করে Ananas Anam নামে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। তাদের তথ্যমতে, আনারস তোলার কাজ শেষ হওয়ার পর জমিতে যে পাতাগুলো অবশিষ্টাংশ হিসেবে পড়ে থাকে, তা পুড়িয়ে না ফেলে সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেই পাতা থেকে শক্তিশালী সেলুলোজ আঁশ নিষ্কাশন করে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে টেকসই ভেগান চামড়া তৈরি করা হয়।
আমের পাল্প (Mango Leather): আমের এই চামড়া বা ‘ম্যাংগো লেদার’ (Mango Leather) তৈরির মূল কৃতিত্ব নেদারল্যান্ডসভিত্তিক স্টার্টআপ কোম্পানি Fruitleather Rotterdam-এর। ইউরোপের সবচেয়ে বড় বন্দর রটারড্যামে প্রতি সপ্তাহে টরে টনে আম আমদানি করা হয়। এর মধ্যে যেসব আম অতিরিক্ত পেকে যায়, গুণগত মান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে না কিংবা কসমেটিক ডিফেক্টের কারণে সুপারশপগুলো বাতিল করে দেয়, সেগুলো ফ্রিতে সংগ্রহ করে এই কোম্পানি। আমের বীজ ফেলে দিয়ে খোসা এবং সম্পূর্ণ পাল্প একসাথে ব্লেন্ড করে পেস্ট বানানো হয়। এরপর ক্ষতিকারক কোনো কেমিক্যাল ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে এটিকে ব্যাকটেরিয়ামুক্ত করে, কিছু প্রাকৃতিক উপাদান মিশিয়ে শিট আকারে শুকানো হয়। সবশেষে ওয়াটারপ্রুফ কোটিং ও ফিনিশিং দিয়ে পশুর চামড়ার মতো টেক্সচার দেওয়া হয়, যা দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জুতা, ব্যাগ ও মানিব্যাগ তৈরি হচ্ছে।
কমলা ও জাম্বুরার খোসা: সাইট্রাস জাতীয় ফলের খোসার সেলুলোজ ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে নরম ও ফ্লেক্সিবল বায়ো-লেদার। এই উদ্ভাবনের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক উদাহরণ হলো ইতালীয় ব্র্যান্ড Ohoskin। ইতালির সিসিলি অঞ্চলে প্রতি বছর জুস শিল্প থেকে লাখ লাখ টন কমলার খোসা ও বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এই বর্জ্য শুকিয়ে পাউডারে রূপান্তর করে এবং ক্যাকটাসের উপাদানের সাথে মিশ্রিত করে তারা একটি পেটেন্টেড লাক্সারি লেদার তৈরি করেছে, যা দেখতে ও স্পর্শে হুবহু আসল চামড়ার মতো নরম। এই চামড়া বর্তমানে বিশ্ববিখ্যাত গাড়ির ইন্টেরিয়র, ঘড়ির স্ট্র্যাপ এবং বিলাসবহুল ব্যাগ তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
নারকেলের বর্জ্য দিয়ে তৈরি হয় চামড়া/ ছবি: ফ্যাব্রিক অ্যান্ড গার্মেন্ট
নারকেলের পানি (Coconut Waste Leather): ভারতের কেরালাভিত্তিক বায়ো-মেটেরিয়াল স্টার্টআপ কোম্পানি Malai এই চমৎকার চামড়া তৈরি করে। নারকেল প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় যে ভেতরের সাদা অংশ সংগ্রহের পর কোটি কোটি লিটার পানি ফেলে দেওয়া হয়, তারা সেই পানি সংগ্রহ করে। এই পানিতে ব্যাকটেরিয়াল কালচার দিয়ে ফারমেন্টেশন বা গাঁজন করা হয়। কয়েকদিন পর ব্যাকটেরিয়াগুলো নারকেলের পানি থেকে পুষ্টি নিয়ে প্রাকৃতিকভাবে একটি ঘন ‘সেলুলোজ জেল’ তৈরি করে। এই জেলের সঙ্গে কলার আঁশ, উদ্ভিজ্জ আঠা ও প্রাকৃতিক তেল মিশিয়ে শুকানো হয়। এটি কোনো প্লাস্টিক বা ক্ষতিকারক রেজিন ছাড়া তৈরি হয় বলে ব্যবহারের পর মাটিতে ফেলে দিলে এটি সম্পূর্ণ মিশে যায়।
কলার কাণ্ডের আঁশ (Banana Leather): কলা চাষের পর গাছের কাণ্ড বা থোড় সাধারণত চাষিরা বর্জ্য হিসেবে কেটে ফেলে দেন। সুইজারল্যান্ড এবং ভারতের বেশকিছু পরিবেশবান্ধব কোম্পানি (যেমন Bananatex বা অন্যান্য স্টার্টআপ) এই কাণ্ড থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী প্রাকৃতিক আঁশ বের করে। এই আঁশগুলোকে জৈব উপাদানের সাথে যুক্ত করে যে টেকসই শিট বা মেটেরিয়াল তৈরি করা হয়, তা কেবল চামড়ার মতো মজবুতই নয়, বরং এটি পুরোপুরি কেমিক্যাল ফ্রি ও কম্পোস্টেবল (Compostable)।
ফলের খোসা থেকে কীভাবে তৈরি হয় চামড়া?
ফলের বর্জ্য ব্যবহারের উপযোগী চামড়ায় রূপান্তর করার প্রক্রিয়াটি বেশ চমৎকার
- সংগ্রহ ও ডিহাইড্রেশন: প্রথমে বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা থেকে ফলের খোসা ও ছোবড়া সংগ্রহ করা হয়। এরপর এগুলো ডিহাইড্রেটরের সাহায্যে শুকিয়ে সম্পূর্ণ জলীয় অংশ দূর করা হয়।
- মিহি গুঁড়া বা পাল্প তৈরি: শুকনো খোসাগুলো পিষে অত্যন্ত মিহি পাউডার বা পাল্পে রূপান্তর করা হয়।

আনারস থেকে ভেগান লেদার তৈরির প্রক্রিয়া/ ছবি: আনানাস আনাম
- অণুজীবের বিক্রিয়া ও আঁশ তৈরি: নারকেল বা কমলার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অণুজীব (যেমন বিশেষ ব্যাকটেরিয়া) ব্যবহার করা হয়, যা ফলের পুষ্টি উপাদান শুষে নিয়ে একধরনের ঘন সেলুলোজ নেটওয়ার্ক বা আঁশ তৈরি করে। এটি দেখতে হুবহু পশুর চামড়ার ভেতরের স্তরের মতো মজবুত হয়।
- বায়ো-পলিমার মিশ্রণ: ফলের এই গুঁড়া বা আঁশের সাথে পরিবেশবান্ধব উদ্ভিজ্জ আঠা বা বায়ো-পলিইউরেথেন মেশানো হয় নমনীয়তা বাড়াতে।
- ফিনিশিং ও টেক্সচারিং: সবশেষে এই মিশ্রণটি শিটের মতো বিছিয়ে উচ্চ তাপ ও চাপে রোলিং মেশিনের মাধ্যমে নিখুঁত ফিনিশিং দেওয়া হয় এবং কৃত্রিমভাবে চামড়ার মতো খাঁজকাটা টেক্সচার ফুটিয়ে তোলা হয়।
বিশ্বমঞ্চে বড় বড় ব্র্যান্ডের চমক
পরিবেশের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক ফ্যাশন জগতের শীর্ষস্থানীয় লাক্সারি ও স্পোর্টস ব্র্যান্ডগুলো এখন ফলের চামড়াকে আপন করে নিয়েছে:
স্টেল্লা ম্যাককার্টনি (Stella McCartney): এই ব্রিটিশ লাক্সারি ব্র্যান্ডটি টেকসই ফ্যাশনের অন্যতম পথপ্রদর্শক। তারা জুস শিল্পের বর্জ্য থেকে তৈরি আপেলের চামড়া দিয়ে লাক্সারি হ্যান্ডব্যাগ এবং স্নিকার্স তৈরি করছে।
হুগো বস (Hugo Boss): বিখ্যাত এই জার্মান ব্র্যান্ডটি ফিলিপাইনের আনারস চাষের বর্জ্য থেকে তৈরি ‘Piñatex’ চামড়া ব্যবহার করে পুরুষদের জন্য সীমিত সংস্করণের ক্যাজুয়াল স্নিকার্স বাজারজাত করেছে।

আনারসের চামড়া থেকে তৈরি জুতা ও ব্যাগ/ ছবি: আনানাস আনাম
এইচ অ্যান্ড এম (H&M): তাদের গ্লোবাল ‘কনসাস এক্সক্লুসিভ’ কালেকশনে ইতালিতে তৈরি আঙুরের চামড়া (VEGEA) ব্যবহার করে নজরকাড়া জ্যাকেট ও জুতা বাজারে এনেছে।
কার্ল লেগারফেল্ড ও ফসিল (Karl Lagerfeld and Fossil): ক্যাকটাস থেকে তৈরি মেক্সিকান ব্র্যান্ড ‘Desserto’-এর চামড়া দিয়ে কার্ল লেগারফেল্ড তাদের বিশেষ ব্যাগ কালেকশন এনেছে। পাশাপাশি বিখ্যাত ঘড়ি নির্মাতা ব্র্যান্ড ফসিল তাদের ঘড়ির টেকসই স্ট্র্যাপ তৈরিতে এই ক্যাকটাস লেদার ব্যবহার করছে।
হার্মিস (Hermès): প্যারিসের এই বিশ্বখ্যাত অতি-বিলাসবহুল ব্র্যান্ডটি মার্কিন বায়োটেক কোম্পানি মাইকোওয়ার্কসের সঙ্গে যৌথভাবে মাশরুমের শিকড় থেকে তৈরি চামড়া দিয়ে তাদের আইকনিক ‘Victoria’ ট্রাভেল ব্যাগের পরিবেশবান্ধব সংস্করণ তৈরি করেছে।
যেভাবে উপকৃত হতে পারে বাংলাদেশ
গার্মেন্টস ও ঐতিহ্যবাহী লেদার শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে একটি বড় নাম। সেক্ষেত্রে ‘ভেগান লেদার’ বাংলাদেশের জন্য হয়ে উঠতে পারে নতুন আশীর্বাদ।
বাংলাদেশ কীভাবে উপকৃত হতে পারে, তা নিচে তুলে ধরা হলো:
রপ্তানি আয়ের নতুন খাত: বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বড় আম, কাঁঠাল ও আনারস উৎপাদনকারী দেশ। প্রতি বছর টন টন ফলের খোসা ও বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনে ফেলে দেওয়া হয়। এই বর্জ্য দেশীয় প্রযুক্তিতে বা যৌথ উদ্যোগে ভেগান লেদারে রূপান্তর করতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের নতুন ও সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতের সৃষ্টি হবে।

চামড়া তৈরির জন্য শুকানো হচ্ছে আনারসের পাতা/ ছবি: আনানাস আনাম
পরিবেশ বিপর্যয় রোধ: পশুর চামড়া প্রক্রিয়াকরণের (ট্যানিং) সময় প্রচুর পরিমাণে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম ও রাসায়নিক নির্গত হয়, যা বিভিন্ন নদীর পানি ও বাতাসকে ভয়াবহভাবে দূষিত করছে। কিন্তু ফলের চামড়া তৈরিতে কোনো বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রয়োজন হয় না, যা পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানা (Green Factory) গড়তে ভূমিকা রাখবে।
কৃষকদের অতিরিক্ত আয়: আনারস কাটার পর পাতা বা কলা গাছের কাণ্ড সাধারণত চাষিরা পুড়িয়ে ফেলেন বা ফেলে দেন। যদি এগুলো দিয়ে চামড়া তৈরির বাণিজ্যিক কাঁচামাল বা আঁশ সংগ্রহ শুরু হয়, তবে প্রান্তিক চাষিরা বর্জ্য বিক্রি করে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জন করতে পারবেন।
তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল: বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাত বর্তমানে পরিবেশবান্ধব বা টেকসই সুতা (যেমন রিসাইকেলড জুট বা জুট-কটন ব্লেড) ব্যবহারে মনোযোগ দিচ্ছে। ফলের চামড়া দিয়ে তৈরি লেবেল, জ্যাকেট বা অ্যাক্সেসরিজ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশি পোশাকের মূল্য ও গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
ফলের খোসা থেকে জুতা বা ব্যাগ তৈরি এখন আর কেবল গবেষণাগারের কোনো পরীক্ষা নয়, বরং এটি বর্তমানের অন্যতম লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব ফ্যাশন ট্রেন্ড। বাংলাদেশ যদি এখন থেকেই এই সবুজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করে এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার সুযোগ করে দেয়, তবে বৈশ্বিক টেকসই ফ্যাশনের ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারে আমরাও শীর্ষস্থানে পৌঁছাতে পারব।
সূত্র: সায়েন্স ডিরেক্ট, এনআইএইচ, ভোগ, আনানাস আনাম, ভেগাটেক্স, ফ্রুট লেদার, ব্যানানাটেক্স
কেএএ/এমএফএ








