দেশে ফরমালিনের নামে যারা কৃষকের ফল নষ্ট করেছিল তাদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন ফল বিশেষজ্ঞ ও ‘বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন’ প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মেহেদী মাসুদ।
একইসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তিনি। ফলে ফরমালিন ও কার্বাইড নিয়ে জনমনে যে আতঙ্ক রয়েছে, তার বড় একটি অংশ ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গত শনিবার (২৭ জুন) সকালে রাজধানীর বাড্ডায় জাগো নিউজ কার্যালয়ে ‘ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ মন্তব্য করেন।
আরও পড়ুন
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা / প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে বছরে নষ্ট হয় ২৫-৫০ হাজার কোটি টাকার ফল
ড. মেহেদী মাসুদ বলেন, ‘এক সময় ফরমালিনের নাম করে কৃষকের প্রচুর ফল নষ্ট করা হয়েছে। যারা এ কাজটি করেছে তাদের বিচারের আওতায় আনা হোক ও ওই সব চাষিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক।
ফরমালিন ও এর ব্যবহার নিয়ে তিনি বলেন, ফরমালিনকে বলা হয় ফরমালডিহাইড, তার ব্যবহার আলাদা। ফরমালিন শুধু প্রোটিনের ওপরে কাজ করে। ফলে প্রোটিন থাকে ১ শতাংশের নিচে, তাহলে ফলে কি কাজ করবে ফরমালিন? করবে না। এজন্য ফলে কখনো ফরমালিন কেউ কখনো দেয়নি, দেবেও না। এটা যে সব ম্যাজিস্ট্রেটরা করেছে ওদের বিচারের আওতায় আনা উচিত।
‘বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন’ প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মেহেদী মাসুদ/ছবি: বিপ্লব দিক্ষিৎ
বাতাসের ফরমালিন মাপার মেশিন দিয়ে ফলের ভেতরে ঢুকিয়ে বলেছে ফরমালিন আছে জানিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, এসব অজ্ঞ অফিসার, সরকারি অফিসার তো তারা, অফিসাররা জানেনও না যে ফলের ভেতরে প্রাকৃতিকভাবেই কিছু ফরমালিন তৈরি হয়।
‘তৈরি হয় ও তার একটা সেফ ডোজ আছে। সেফ ডোজ বলা হয় যে ২ থেকে ৬০ পিপিএম পর্যন্ত এটা শরীরের জন্য কোনো ক্ষতি নাই। আমি ১০ পিপিএম আছে বলে দিলাম, ফরমালিন বলে টন কে টন ফসল ধ্বংস করলো। এটি শুধু অজ্ঞতার কারণে,’ বলেন তিনি।
মেহেদী মাসুদ বলেন, ‘সব ফল গাছ থেকে সংগ্রহের পর একইভাবে পাকে না। ফল সাধারণত দুই ধরনের- ক্লাইমেক্টেরিক ও নন-ক্লাইমেক্টেরিক। আম, কলার মতো ক্লাইমেক্টেরিক ফলে সংগ্রহের পরও স্টার্চ ধীরে ধীরে চিনিতে (সুগার) রূপান্তরিত হয়, ফলে ফল আরও পাকে ও মিষ্টি হয়। কিন্তু আনারস, কমলা বা মাল্টার মতো নন-ক্লাইমেক্টেরিক ফলে গাছ থেকে পাড়ার পর আর এ ধরনের পরিবর্তন হয় না। তাই এসব ফল গাছেই পরিপক্ব অবস্থায় সংগ্রহ করতে হয়।
আরও পড়ুন
সাতক্ষীরা / উপকূলে লবণের কাছে হার মানছে আম-কাঁঠাল
ফল দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য নিয়ন্ত্রিত বায়ুমণ্ডল (কন্ট্রোলড অ্যাটমোসফিয়ার) প্রযুক্তি কার্যকর জানিয়ে ড. মেহেদী বলেন, এ পদ্ধতিতে সংরক্ষণাগারের অক্সিজেন কমিয়ে তার পরিবর্তে নাইট্রোজেন বা কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করা হয়। এতে ফলের শ্বসন (রেসপিরেশন) প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায় এবং ফল দীর্ঘ সময় একই অবস্থায় সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।
তিনি জানান, ব্যক্তিগত গবেষণায় ১০ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে আম ২৫ দিন পর্যন্ত ভালো রাখা সম্ভব হয়েছে। ২০২৪ সালে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার আম নিয়ে পরিচালিত পরীক্ষায়ও দেখা গেছে, এ পদ্ধতিতে আম তিন থেকে চার সপ্তাহ ভালো থাকে।
কার্বাইড ও ইথিলিনের পার্থক্য
ফল পাকানোর ক্ষেত্রে কার্বাইড ও ইথিলিনের পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড নিষিদ্ধ। এটি পানির সংস্পর্শে এসে অ্যাসিটিলিন গ্যাস তৈরি করে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অন্যদিকে ইথিলিন একটি প্রাকৃতিক উদ্ভিদ হরমোন, যা ফলের ভেতর স্বাভাবিকভাবেই উৎপন্ন হয় এবং ফল পাকতে ভূমিকা রাখে।
গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকরা
তার ভাষ্য, প্রয়োজন হলে নির্ধারিত আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ইথিলিন ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ ফল একসঙ্গে নিরাপদভাবে পাকিয়ে বাজারে সরবরাহ করা যায়। বিশ্বজুড়ে এ পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয়।
ফল নিয়ে আতঙ্ক নয়
ফল নিয়ে অযথা আতঙ্ক না ছড়ানোর আহ্বান জানিয়ে ড. মেহেদী মাসুদ বলেন, কার্বাইড ব্যবহার নিষিদ্ধ, কিন্তু অনুমোদিত ইথিলিনকে অনেকেই ভুলভাবে একই কাতারে ফেলছেন। এতে মানুষের মধ্যে অযথা ভয় তৈরি হচ্ছে এবং ফল খাওয়ার প্রবণতা কমছে।
আরও পড়ুন
ফলের খোসা থেকে তৈরি হচ্ছে জুতা-ব্যাগ! ফ্যাশনে সবুজ বিপ্লব
ফরমালিন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ফলে ফরমালিন দেওয়া হয় এমন ধারণারও বাস্তব ভিত্তি খুবই দুর্বল। বাজার থেকে কেনা ফল পরিষ্কার পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে খেলে ভোক্তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। তাই গুজবে কান না দিয়ে নিয়মিত ফল খান।
জাগো নিউজের সম্পাদক কে. এম. জিয়াউল হকের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের সাবেক উপাচার্য, গবেষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী, রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান, বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক (খাদ্য ও কৃষি) এনামুল হক, প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইলিয়াছ মৃধা, হাসেম ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হাসেম, বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ইকতাদুল হক, ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, কাজু অ্যান্ড কফি অ্যাগ্রোর নির্বাহী পরিচালক মো. মাহাতাব আলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি উদ্যোক্তা ইসমাইল খান শামীম ও নওগাঁর কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা।
ইএইচটি/এএসএ/ এমএফএ








