আগামী অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের জন্য অর্থ বিল, ২০২৬ সংসদে তোলার পর জনমত যাচাই প্রস্তাব ও বিলের সাধারণ নীতি নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে ঘাটতি বাজেট, চীনা ঋণ ও বিনিয়োগের আশ্বাস, কর-ভ্যাট, বিনিয়োগের শর্ত, ব্যাংক খাতের দুর্নীতি এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংসদ সদস্যরা।
আজ সোমবার জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন কার্যাবলির শুরুতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থ বিল, ২০২৬ অবিলম্বে বিবেচনার প্রস্তাব তোলেন।
তিনি বলেন, ‘আমি প্রস্তাব করছি, সরকারের আর্থিক প্রস্তাবগুলো কার্যকরকরণ এবং কতিপয় আইন সংশোধন করতে আনীত বিলটি অর্থ বিল, ২০২৬ সংসদে অবিলম্বে বিবেচনার জন্য গ্রহণ করা হোক।’
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানান, বিলটির ওপর কয়েকজন সংসদ সদস্য জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব এবং বিলের সাধারণ নীতি সম্পর্কিত আলোচনা একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে বলেও জানান তিনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বাজেটের ঘাটতি ও রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর এই বাজেট দেওয়ার সময় আমরা নির্ঝরের মতন স্বপ্ন দেখি এবং সারা বছর ধরে সেই স্বপ্ন ভঙ্গের ফল আমাদের ভোগ করতে হয়।’
প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা এবং আয় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘এতে ঘোষিত ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। শুধু এই ঘাটতি থাকলেও কথা ছিল, রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়, তা কোনো বছরই পুরোপুরি আদায় করা যায় না। ফলে ঘাটতি বাড়তে থাকে এবং সেই ঘাটতি মেটাতে দেশি-বিদেশি ঋণ বা বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করতে হয়।’
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের প্রসঙ্গ তুলে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমি আপনার মাধ্যমে জানতে চাই, চীনের কাছ থেকে ঋণের কোনো আশ্বাস আমরা পেয়েছি কি না। পেয়ে থাকলে সেই ঋণের আশ্বাসের পরিমাণ কত, কিংবা বাংলাদেশে তারা কোনো বিনিয়োগ করবে কি না, এ রকম কোনো আশ্বাস এসেছে কি না।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেছেন—আমরা কি কেবলমাত্র চাইতে গেছি ভিক্ষার ঝুলি হাতে? আমরা কেউ আশা করি না যে, বাংলাদেশের মন্ত্রী-মিনিস্টাররা দেশের বাইরে ভিক্ষার ঝুলি হাতে ভিক্ষা করতে যাবেন। তবে বাস্তবতার ব্যাপারে চোখ বন্ধ করে থাকলেও তো হবে না।’
দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘গত চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীর গতি, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা, রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতি, ঋণখেলাপির বৃদ্ধি, ব্যাংকের তারল্য সংকট এবং জ্বালানি সরবরাহে সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।’
জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ‘জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে বাজেট এখন শেষ ধাপে এসেছে।’ সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা এবং সংসদ সদস্যদের আলোচনার ভিত্তিতে বাজেট সামনে এগোচ্ছে বলে তিনি ধন্যবাদ জানান।
শিক্ষা খাত নিয়ে তিনি বলেন, ‘মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি, কারিকুলামভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং বছরজুড়ে তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের বিষয়ে আরও কার্যকর পরিকল্পনা দরকার।’ শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিকেন্দ্রীকরণের কথাও বলেন তিনি। তাঁর প্রস্তাব—মেগা সিটি বা বিদেশকেন্দ্রিক প্রশিক্ষণের পরিবর্তে উপজেলা পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, ‘এতে শিক্ষকদের আর্থিক সুরক্ষা বাড়বে এবং জ্ঞানভিত্তিক অবকাঠামো তৈরি হবে।’
গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য উচ্চশিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা না হলে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।’
রাজশাহী-১ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান অর্থ বিলের আলোচনায় অংশ নিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহারে সতর্কতার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘মানুষের রিজিক হালাল হওয়া দরকার। জাতীয় জীবনেও অর্থ ব্যবহারে অপচয় এড়াতে হবে।’
মুজিবুর রহমান বলেন, ‘অর্থ বিল নিয়ে অনেকেই আলোচনা করেছেন, ভালো প্রস্তাবও দিয়েছেন।’ অর্থমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও সংসদ সদস্যদের প্রস্তাবের কিছু অংশ গ্রহণ করা হয়েছে, যা জাতীয়ভাবে উপকারে আসবে বলে তিনি মনে করেন।
অপচয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জাতীয় জীবনে টাকা-পয়সার অপচয় সব জায়গায়। অপচয় থেকে আমাদের সাবধান থাকতে হবে।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য জি এম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘একটি দেশের অর্থ বিল শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি ১৮ থেকে ২০ কোটি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।’ তাঁর মতে, সাধারণ মানুষের ওপর কিছু করের চাপ কমানোর উদ্যোগ থাকলেও সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতি ও বাজারের ওপর চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন বাধ্যতামূলক করার কিছু বিধান প্রত্যাহারের কথা শোনা গেলেও সঞ্চয় ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন কিছু শর্ত উদ্বেগ তৈরি করছে।’ সিকিউরিটিজ, ইউনিট ফান্ড ও মিউনিসিপ্যাল ফান্ডে বিনিয়োগ ধরে রাখার নতুন শর্ত নিয়ে তিনি বলেন, ‘এতে বিনিয়োগকারীর জরুরি অর্থ ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হতে পারে।’
তিনি বলেন, চাকরি পরিবর্তন, পারিবারিক জরুরি অবস্থা বা চিকিৎসার প্রয়োজনের মতো পরিস্থিতিতে কেউ মেয়াদ পূর্তির আগে টাকা তুলতে না পারলে সাধারণ বিনিয়োগকারী বিপাকে পড়তে পারেন। ব্যাংক খাতের সংস্কার ও দুর্নীতি প্রতিরোধকে জরুরি বলে মন্তব্য করেন জি এম নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং খাত সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। অর্থ বিলে রাজস্ব আহরণের কৌশল থাকলেও দুর্নীতি, অর্থপাচার রোধ এবং পাচার অর্থ ফেরানোর বিষয়ে আরও কঠোর দিকনির্দেশনা দরকার।’
প্রধানমন্ত্রী এর আগে পাচার অর্থ ফেরানোর উদ্যোগের কথা বলেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে দেখা দরকার।’
ময়মনসিংহ-৬ আসনের কামরুল হাসান মিলন বলেন, ‘জুন মাসে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এতে অপচয়, দুর্নীতি হয়। দুর্বল ব্যাংককে সহায়তার প্রস্তাবে আরও অপচয় হবে। বিনিয়োগ কমবে।’
কুষ্টিয়া-২ আসনের আবদুল গফুর বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে বাজেটে ব্যয় বরাদ্দের সক্ষমতা খুবই কম। ২-৩০ শতাংশ ফেরত আসে। তাই বরাদ্দ বৃদ্ধি অপচয় বৃদ্ধি করতে পারে। অনেক হাসপাতালে শিশুদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকলেও, প্রবীণদের জন্য নেই।’
নীলফামারী-২ আসনের আবদুল ফারুক আবদুল লতিফ বলেন, ‘করের বোঝা চাপানো হয়েছে। ২২ থেকে ৪৩ শতাংশ কর বৃদ্ধি জনগণের জন্য কল্যাণকর হবে কিনা ভেবে দরকার।’
বেকার ভাতার দাবি করে কিশোরগঞ্জ-৫ শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল বলেন, ‘জনকল্যাণে প্রস্তুত করা হয়েছে বাজেট। বাজেটে কী আছে, তা জনগণের জানা দরকার। বাজেট বাস্তবায়ন হোক, তা জনগণ চায়। তাই অধিকরতর বাছাইয়ে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব করছি।’
আমলারা জনবিচ্ছিন্ন অভিযোগ করে ফরিদপুর-১ আসনের ইলিয়াস মোল্লা বলেন, ‘বাজেট যারা বাস্তবায়ন করবে, তারা প্রশিক্ষণের পর হাবভাব আলাদা হয়ে যায়। মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দেখি তারা আলাদা। যেন এ দেশের মানুষ না।’
নীলফামারী-১ আসনের আবদুস সাত্তার বলেন, ‘শুধু সাধারণ করদাতার পকেট না কেটে, ঋণ খেলাপি ও লুটেরাদের ধরে এনে বাজেট ঘাটতি পূরণ করা
হোক।’
চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের মোহাম্মদ মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মদ ও মাদক বন্ধে রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। মাদক সমাজে ছেয়ে গেছে। সবাই এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। কিন্তু মাদক নিষিদ্ধ না করে, কর আরোপ করে আয় করছে।’
এ বিষয়ে সংসদে আরও বক্তব্য দেন খুলনা-৬ আসনের আবুল কালাম আযাদ ও বাগেরহাট-৪ আসনের আবদুল আলীম।








