ফরিদপুরের মধুখালীতে চুরির অপবাদ দিয়ে তাওহিদ শেখ নামে ১৪ বছর বয়সী এক শিশুকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় একটি মুড়ির কারখানার মালিক ও তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে। পরিবারের অভিযোগ, শিশুটির হাত-পা ও চোখ-মুখ বেঁধে লোহার পাইপ দিয়ে মারধর করা হয়েছে। আহত তাওহিদ ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
অভিযুক্তরা হলেন মধুখালী উপজেলার নওপাড়া এলাকার ‘মায়ের দোয়া’ মুড়ির কারখানার মালিক ও সাবেক সেনাসদস্য ইশারত মোল্যা (৫৫) এবং তাঁর ছেলে মুন্না মোল্যা (২২)। নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার না করে ইশারত মোল্যা বলেন, তাঁর ছেলে ও দুই ভাতিজা শিশুটিকে চড়থাপ্পড় দিয়েছেন।
তাওহিদ নওপাড়া ইউনিয়নের নওপাড়া কুরানিয়ার চর এলাকার রুবেল শেখের বড় ছেলে। সে স্থানীয় বাজারে একটি ফার্নিচারের দোকানে কাজ করে।
পরিবারের অভিযোগ, গত রোববার রাতে মায়ের দোয়া মুড়ির কারখানার দ্বিতীয় তলার ছাদে তাওহিদকে নির্যাতন করা হয়। রাত ৯টা থেকে ১২টা পর্যন্ত নির্যাতনের পর তাকে নিচে ফেলে রাখা হয়। রাত সাড়ে ১২টার দিকে পরিবারের সদস্যরা আহত অবস্থায় তাকে খুঁজে পান। পরদিন সকালে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
আজ মঙ্গলবার বিকেলে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, তাওহিদ ক্যাজুয়ালটি ও নিউরোসার্জারি বিভাগে চিকিৎসাধীন। তার দাদি রহিমা বেগম, বাবা রুবেল শেখ ও মা শম্পা বেগমকে পাশে বসে কাঁদতে দেখা যায়। শিশুটির কোমর থেকে নিতম্ব ও উরু পর্যন্ত কালশিটে দাগ হয়ে আছে। প্রচণ্ড ব্যথায় শিশুটি বসতে পর্যন্ত পারছে না। একপাশে কাত হয়ে থাকতে হচ্ছে তাকে।
তাওহিদ জানায়, ঘটনার দিন রাত ৯টার দিকে ফার্নিচারের দোকানের কাজ শেষে মুড়ির কারখানার সামনে দিয়ে বাড়ি ফিরছিল সে। এ সময় মুন্না মোল্যা তাকে ডেকে দ্বিতীয় তলার ছাদে নিয়ে যান। সেখানে ইশারত মোল্যাও যান। একপর্যায়ে রশি দিয়ে তার হাত-পা ও চোখ বাঁধা হয়। পরে লোহার রড চুরির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। চুরির কথা অস্বীকার করলে বাঁধা অবস্থায় লোহার পাইপ দিয়ে তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ তাওহিদের। চিৎকার করলে কাপড় দিয়ে তার মুখও বেঁধে দেওয়া হয় বলে জানায় সে।
শিশুটির দাদি রহিমা বেগম বলেন, ‘ওরে আমিই কোলেপিঠে বড় করছি, কোনো দিন কারও কিছু চুরি করে নাই। ওই দিন অনেক রাত পর্যন্ত বাড়িতে না আসায় আমরা খুঁজতে বাইর হই। রাত সাড়ে ১২টার দিকে ওই মিলের নিচে গোঙানির শব্দ পাইয়া দৌড়ায় যাই। তখন আমরা মনে করছিলাম, ছাদ থেকে পড়ছে। পরে জ্ঞান ফিরলে ও বলে, হাত-পা ও চোখ-মুখ বাইন্ধা ইশারত আর তাঁর ছেলে ওরে মাইরা ফেলায় রাখছে। আমরা গ্রামের মাতুব্বরদের বইলাও বিচার পাই নাই। তাই প্রশাসনের কাছে বিচার চাই।’
শিশুটির বাবা রুবেল শেখ বলেন, ‘ঘটনার পর এ নিয়ে কথা বলতে গেলে উল্টো হুমকি দিয়েছে। ইশারত মোল্যা বলেছে, “ওরে তো মারছি, তোরেও মেরে ফেলব, আমার কিছুই করতে পারবি না।” গ্রামের কেউ ওদের ভয়ে কথা বলে না, ওদের অনেক টাকা আছে। এতটুকু বাচ্চা মানুষকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে এমনভাবে কি কেউ মারে? আমি সুষ্ঠু বিচার চাই।’
অভিযুক্ত ইশারত মোল্যা বলেন, ‘ওই ছেলেটি এলাকায় বিভিন্ন মালামাল চুরি করে থাকে। আমার ঘরের কাজের রড চুরি করেছে, কিন্তু ধরতে পারি নাই। ওই দিন ছাদে গিয়ে হাতে-নাতে ধরেছি। তখন আমার ছেলে ও দুই ভাতিজা চড়থাপ্পড় দিয়েছে। মানবতা দেখিয়ে পুলিশে দিইনি, এখন দেখতেছি পুলিশে দেওয়াই ভালো ছিল।’
মধুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকদেব রায় বলেন, ‘শিশু নির্যাতনের কোনো অভিযোগ পাইনি। তবে এমন ঘটনা ঘটে থাকলে এবং পরিবার অভিযোগ দিলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’








