চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কর্তৃক ফেনী নদী থেকে বালু উত্তোলনে ফেনী নদীর দুটি ঘাট ইজারা দেওয়া হয়, কিন্তু বালু তোলা চলছে কয়েক কিলোমিটারের ডজনখানেক স্পটে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় দুবছর ধরে জেলা প্রশাসন বন্ধ রেখেছে নদীর বালুঘাট ইজারা। কিন্তু বন্ধ নেই বালু উত্তোলন। অন্তত শখানেক শ্যালো মেশিনে কখনো দিনে কখনো রাতভর চলছে বালু উত্তোলন। বালু উত্তোলনের খবর পেয়ে কদিন পরপর প্রশাসন নদীর পাড়ে এলেও খুঁজে পায় না কাউকেই। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সদলবলে এসে কয়েকটা মেশিন ভাঙচুর আর কিছু পাইপ নষ্ট করে চলে যায়। প্রশাসন এলাকা পেরিয়ে গেলেই আবার শুরু হয় বালু চুরি। এ যেন চোর-পুলিশ খেলা।
জানা গেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের রাজস্ব বিভাগ থেকে ফেনী নদীর চট্টগ্রাম জেলা অংশে মাত্র দুটি ঘাটের ইজারা দিলেও ফেনী নদীর ১০-১২টি পয়েন্টে বালু উত্তোলন চলছে দেদার। জানা গেছে, ফেনী নদীর মীরসরাই উপজেলা অংশের দুটি স্থানে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের রাজস্ব বিভাগ কর্তৃক মোল্লাঘাট ও শুভপুর ঘাট দুটি ৯৯ লাভ টাকা ইজারা হয়েছে সর্বশেষ ১৪৩১ সালে। কিন্তু এরপর গত দুবছর ধরে ইজারা বন্ধ থাকলেও বন্ধ নেই বালু উত্তোলন। ইজারা না থাকায় বড় বড় বোটগুলো চলে গেছে অন্যত্র। কিন্তু ছোট ছোট অন্তত শতাধিক শ্যালো মেশিন চলছে ফেনী নদীর মীরসরাই উপজেলার কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে। মোবারকঘোনা থেকে শুরু করে হিঙ্গুলী, অলিনগর পুরো কয়েক কিলোমিটার নদী তীরবর্তী এলাকায় চলছে এই বালু চুরি। মাঝেমধ্যে নামেমাত্র অভিযান চললেও ধরা পড়ে না কেউ। সবাই নাম জানে কিন্তু প্রশাসন থেকে এলে যেন সবাই একে অপরের অচেনা অজানা। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বালু উত্তোলনের দরুন এই নদী পারের শতশত মানুষের কৃষি জমি, ঘরবাড়ি পতিত হয় নদীগর্ভে। যে বালু এক সময় পাঁচশ থেকে হাজার টাকা গাড়ি ছিল। সেই বালু এখন ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা দেড়শ ফুটের গাড়ি। তাই নগদ টাকার লোভে যেই শক্তি দেখাতে পারছে সেই যেন বালু তুলতে নেমে যাচ্ছে। প্রশাসন যেন সেই শক্তির কাছে অসহায়! বর্তমান সময়ে এমন আকার ধারণ করেছে যে, বালুসংশ্লিষ্টরা কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যাচ্ছে রাতারাতি।
আবার প্রতিবছর ফেনী অংশে ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বালুমহাল ইজারা হয়। ফেনী নদীর দুটি ঘাটে। মোল্লাঘাট ও শুভপুর ঘাট। সেখানেও এই ইজারাকে পুঁজি করে দুটি ঘাটের বাইরেও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন হয়ে আসছে দীর্ঘ বছর ধরে। এছাড়াও ধুমঘাট, হিঙ্গুলী, ইসলামপুর, আজমনগর, অলিনগর, কয়লা ও জোরারগঞ্জসহ বিভিন্ন ছরা থেকেও বালু উত্তোলন করা হয়। বালু উত্তোলনের সময় কৃষকের শতশত একর জমি ড্রেজার দিয়ে কেটে বালু বানিয়ে নদীতে বিলীন করা হয়েছে। এসব নিয়ে একাধিক হামলা-পালটাহামলার ঘটনাও ঘটেছে। বিগত ১৪৩১-৩২ বাংলা সনে ফেনী ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন থেকে ফেনী নদীর মীরসরাই অংশে বালুর ইজারা দেওয়া হয়নি কোনো প্রতিষ্ঠানকে। কিন্তু থেমে নেই বালু উত্তোলন। অভিযোগ রয়েছে, কতিপয় অসাধু ব্যক্তি দলের নাম ভাঙিয়ে ফেনী নদীর বিভিন্ন অংশে এবং স্থানীয় কিছু ছরা থেকে বালু উত্তোলন করে আসছে। এই নিয়ে স্থানীয়ভাবে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। এই বিষয়ে বর্তমানে মীরসরাই উপজেলার সর্বাধিক প্রভাবশালী বিএনপি নেতা বর্তমান সংসদ-সদস্য নুরুল আমিন এমপির প্রধান নির্বাচনি সমন্বয়কারী দিদারুল আলম মিয়াজীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরাও বালু উত্তোলন বন্ধসহ দুর্নাম রোধ করতে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি। কিন্তু প্রশাসনের লোক মীরসরাই থেকে রওয়ানা হলেই কিভাবে চোরচক্র খবর পেয়ে মেশিনপত্র খুলে সরে যায়। আর প্রশাসন চলে গেলে আবার লাগিয়ে নেয়।
এসব বিষয়ে উপজেলার নির্বাহী ম্যজিস্ট্রেট সহকারী কমিশনার (ভূমি) আলাউদ্দিন কাদেরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অভিযোগ পেলেই আমরা অভিযান চালাতে পুলিশ নিয়ে যাই, কিন্তু এর মধ্যে কে বা কারা ওদের খবর পৌঁছে দেয় আমাদের সতর্কতা সত্ত্বেও তা বুঝতে পারি না। তবে এই বিষয়ে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব শাখাওয়াত জামিল বলেন, দেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ওই ফেনী নদী সরকার ইজারা দিচ্ছে না। বিশেষ করে পরিবেশ অধিদপ্তরের আপত্তি থাকায়। তাই আমরা ও সরকারের সঙ্গে সহমত।








