জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাককানইবি) নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবন থেকে পড়ে মো. রাসেল মিয়া (৩২) নামে এক নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যুর পর ফের প্রশ্ন উঠেছে নির্মাণপ্রকল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ উচ্চতায় কাজ করা অধিকাংশ শ্রমিকের শরীরে নেই ন্যূনতম ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই)। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি, শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ‘ইউটিলিটি-৪’ নামের ১০ তলা ভবনে কাজ করার সময় মো. রাসেল মিয়া নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন। পরে সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার রাতেই তার মৃত্যু হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মাণকাজ চলাকালে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৯ সালে নির্মাণাধীন একটি ভবনে কাজ করার সময় নিচে পড়ে এক নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যু হয়। পরে ২০২৫ সালের ২ মার্চ নির্মাণাধীন আরেকটি ১০ তলা ভবনে কাজ করার সময় নিচে পড়ে মো. ইব্রাহিম নামে আরো এক শ্রমিক নিহত হন। সর্বশেষ ২০২৬ সালে রাসেল মিয়ার মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণ প্রকল্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নির্মাণাধীন ভবন ঘুরে দেখা যায়, টেন্ডারপ্রাপ্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অধীনে কর্মরত অধিকাংশ শ্রমিকের শরীরে ছিল না কোনো ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম। ঝুঁকিপূর্ণ উচ্চতায় কাজ করলেও অনেকের শরীরে সেফটি বেল্ট ছিল না, মাথায় ছিল না সেফটি হেলমেট। অনেকেই লুঙ্গি, প্যান্ট-শার্ট কিংবা টি-শার্ট পরেই নির্মাণকাজে নিয়োজিত ছিলেন।
একটি ভবনে দেখা যায়, প্রায় ২২ জন শ্রমিক কাজ করছেন। তাদের মধ্যে মাত্র দুজনের মাথায় সেফটি হেলমেট ছিল। বাকি শ্রমিকদের কারো শরীরে সেফটি বেল্ট বা অন্য কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে এনএস এন্টারপ্রাইজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যানেজার ওয়াশিম বলেন, “আমরা শ্রমিকদের সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করেছি। ভবনের কাজ প্রায় শেষ হওয়ায় যারা ভবনের ভেতরে কাজ করছেন, তারা সেফটি বেল্ট ব্যবহার করছেন না। তবে যারা উঁচু স্থানে কাজ করছেন, তারা সেফটি বেল্ট পরেই কাজ করছেন।”
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খান কোম্পানির কর্মরত পরিদর্শক শাহ জামান বলেন, “আমাদের কোম্পানি শ্রমিকদের সব ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম দিছে। কিন্তু কেউ যদি না পরে, আপনি যদি না পরেন, আমি যদি না পরি, তাহলে তো আমাদের কিছু করার নাই। শ্রমিকরা নিজেরাই যদি সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার না করে, তাহলে তো দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ মুফাস্সিরুল ইসলাম বলেন, “আমরা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছি। নিরাপত্তার বিষয়েও নির্দেশনা দিয়েছি। শ্রমিকদের সেফটি বেল্ট ও হেলমেট দেওয়া হয়েছে বলেই জানি। তবে শ্রমিকরা সব সময় ওই নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করেন কি না, সে বিষয়ে আমার জানা নেই।”
যদিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবরাহের দাবি করেছে, সরেজমিনের চিত্রে তার প্রতিফলন মেলেনি। একাধিক শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনার পরও অধিকাংশ শ্রমিককে সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ উচ্চতায় কাজ করতে দেখা গেছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।








