ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনোর বিরুদ্ধে আবারও তীব্র সমালোচনা করে মুখ খুলেছেন স্প্যানের ফুটবল কর্মকর্তা হ্যাভিয়ের তেবাস। বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা ৪৮ থেকে বাড়িয়ে ৬৪ করার সম্ভাব্য পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করে ইনফ্যান্তিনোকে পদত্যাগেরও আহ্বান জানিয়েছেন স্প্যানিশ লা লিগার এই সভাপতি।

ইতালির প্রভাবশালী ক্রীড়া দৈনিক লা গ্যাজেত্তা দেলো স্পোর্ত-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তেবাস বলেন, ‘বিশ্বকাপে আরও দল বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই।‘ তার মতে, এমন সিদ্ধান্ত বিশ্ব ফুটবলের জন্য নয়, বরং পুরো ফুটবল শিল্পের জন্যই ক্ষতিকর।

৬৩ বছর বয়সী তেবাস বলেন, ‘জাতীয় দলের সংখ্যা বাড়ানোর কোনো অর্থ হয় না। ফুটবল শিল্প শুধু বিশ্বকাপকে ঘিরে নয়, যদিও এটি সবচেয়ে বড় আসর। কিন্তু সবকিছু বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে চলতে পারে না।‘

তিনি বলেন, ‘এই খেলাকে টিকিয়ে রাখে জাতীয় লিগগুলো। অথচ মাত্র ৪০ দিনের একটি টুর্নামেন্টের জন্য তারা পুরো ফুটবল শিল্পকে ধ্বংস করছে। যে শিল্প লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, সেটিকেই তারা ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।‘

তেবাসের মতে, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়ের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম। তাই গোটা ফুটবল ক্যালেন্ডারকে এই টুর্নামেন্টের জন্য বারবার পরিবর্তন করা উচিত নয়।

তার ভাষায়, ‘আমাদের আরও বেশি জাতীয় লিগকে সুরক্ষা দিতে হবে, জাতীয় দলের সংখ্যা বাড়াতে নয়। কিন্তু তারা দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।‘

২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপই ছিল প্রথম আসর, যেখানে ৪৮টি দল অংশ নেয়। এর আগে ১৯৯৮ সাল থেকে ৩২ দলের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল।

এরই মধ্যে ২০৩০ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে ৬৪ করার আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করবে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কো। এই সম্ভাবনাকেই বিপজ্জনক বলে মনে করছেন তেবাস।

ফিফা সভাপতির দায়িত্বে থাকা জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনোর আগামী বছর মার্চে অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসে চতুর্থ মেয়াদের জন্য পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তেবাস মনে করেন, এখনই তার সরে দাঁড়ানো উচিত। তিনি বলেন, ‘আমার মতে- হ্যাঁ, তার পদত্যাগ করা উচিত। আমার মনে হয় তার সময় শেষ হয়ে গেছে।‘

তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, বর্তমান ব্যবস্থায় ইনফ্যান্তিনোর অবস্থান বেশ শক্তিশালী। ‘তিনি পুরো ব্যবস্থার সমর্থন পাচ্ছেন। বিভিন্ন জাতীয় ফেডারেশন তার পাশে রয়েছে। তাই বাস্তবে তাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কেউ নেই।‘

আরও পড়ুন

পারেদেসকে কোনো লাল কার্ড দেওয়া হয়নি, ফিফার ভুল স্বীকার

তেবাসের মতে, ফিফার বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থায় প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। তিনি বলেন, ‘কোনো বিরোধী প্রার্থী নেই। কারণ সবাই জানে, নির্বাচনে হারবে। পুরো ব্যবস্থাটাই মূল থেকে অসুস্থ।‘

তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ চলাকালে অনেক ফুটবল কর্মকর্তার সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তাদের অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে ইনফ্যান্তিনোর সমালোচনা করেছেন, কিন্তু প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলতে চান না।

তেবাসের ভাষায়, ‘অনেকেই ইনফ্যান্তিনোর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। কিন্তু কেউ সামনে এসে কিছু করেন না।‘

তিনি আরও বলেন, ‘নীরবতা আর সহযোগিতার মধ্যে কোনটি বেশি ভয়ংকর, আমি জানি না। কারণ যারা চুপ করে আছেন, তারা সবাই জানেন ফুটবলের কী ক্ষতি হচ্ছে।‘

বিশ্বকাপ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন তেবাস। তার অভিযোগ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্র সরকার সরাসরি হস্তক্ষেপ করে বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা তুলে দিতে সহায়তা করেছিল।

তেবাস বলেন, ‘এটি অত্যন্ত গুরুতর একটি ঘটনা।‘ তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি শেষ ষোলো থেকে বিদায় না নিত, তাহলে এই ঘটনা ইনফ্যান্তিনোর জন্য বড় সংকট তৈরি করতে পারতো। তিনি বলেন, ‘বেলজিয়াম যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে দেওয়ায় বিষয়টি চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু এটি আসলে হিমশৈলের চূড়ামাত্র।‘

ফিফার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তেবাস। তার অভিযোগ, ‘ফিফা যেভাবে চায়, যেটা চায়, নিজেদের স্বার্থে সেটাই করে। ফুটবলের স্বার্থে নয়।‘

বিশ্বকাপে দীর্ঘ বিরতি এবং বাধ্যতামূলক ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ নিয়েও কড়া সমালোচনা করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘২৭ মিনিটের বিরতি দরকার হলে তারা সেটাই করে। হাইড্রেশন ব্রেকের যুক্তিটা মিথ্যা।‘

লা লিগার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের লিগেও হাইড্রেশন ব্রেক থাকে, কিন্তু সেটা কেবল প্রচণ্ড গরমে।’ তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস, লস অ্যাঞ্জেলেস ও আটলান্টার যেসব স্টেডিয়ামে ম্যাচ হয়েছে, সেগুলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ছিল।

‘স্ট্যান্ডে বসে আমাকে সোয়েটার পরতে হয়েছিল। সেখানে হাইড্রেশন ব্রেকের কোনো প্রয়োজনই ছিল না। ওটা ছিল বিজ্ঞাপনের জন্য অতিরিক্ত বিরতি,‘ বলেন তেবাস।

বিশ্বকাপের সম্প্রসারণ, টুর্নামেন্ট পরিচালনা ও বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ফিফা ও ইনফ্যান্তিনোর বিরুদ্ধে সমালোচনা বাড়লেও, বর্তমানে তাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তিশালী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় আগামী মেয়াদেও তার দায়িত্বে থাকার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।

আইএইচএস/একিউএফ