নতুন করে তাপপ্রবাহের পূর্বাভাসের মধ্যে ফ্রান্সে সাশ্রয়ী মূল্যের এয়ার কন্ডিশনার (এসি) কিনতে হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে। রাজধানী প্যারিস ও আশপাশের এলাকায় চেইন সুপারমার্কেট লিডলের সামনে আজ বৃহস্পতিবার শত শত মানুষের ভিড় দেখা গেছে। কোথাও কোথাও ধাক্কাধাক্কি, বাগ্‌বিতণ্ডা এমনকি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকেও হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।

বার্তা এএফপির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ফ্রান্সের বাজারে অধিকাংশ এসির দাম যেখানে এক হাজার ২০০ ইউরো (প্রায় এক হাজার ৪০০ মার্কিন ডলার) বা তার বেশি, সেখানে লিডল মাত্র ১৭৯ ইউরোতে সাধারণ মানের কুলিং ইউনিট বিক্রির ঘোষণা দেয়। এতে ওই চেইন সুপার মার্কেটে ক্রেতাদের ব্যাপক ভিড় সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে অন্তত দুটি দোকানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

উত্তর প্যারিসে লিডলের একটি ছোট শাখার সামনে ঘণ্টার বেশি সময় অপেক্ষা করা মুসা ত্রাওরে এএফপিকে জানান, সেখানে প্রায় ২০০ জন ক্রেতা লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের জানানো হয়েছিল, বিক্রির জন্য মাত্র দুটি ইউনিট রয়েছে।

তিনি হেসে হেসে বলেন, ‘পরে পুলিশ এলো, এরপর আমাদের জানানো হলো কোনো ইউনিটই নেই। আমার তো মনে হয় পুলিশ কর্মকর্তারাই সেগুলো নিয়ে গেছেন।’

চেইন সুপারমার্কেট লিডল শাখার এক ব্যবস্থাপক তাদের দোকানের সামনে থাকা ক্রেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা সরে না গেলে আমি দোকান খুলব না।’ এ সময় কয়েকজন ক্রেতা লাইন ভাঙার চেষ্টা করলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। দোকানের এক কর্মী জানান, সেখানে মাত্র দুটি এয়ার কন্ডিশনার সরবরাহ করা হয়েছিল। তবে সেগুলো ইতিমধ্যে বিক্রি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

প্যারিসের উপকণ্ঠ সেভরান ও লিভ্রি-গারগান এলাকাতেও একই চিত্র দেখা যায়। বিপুলসংখ্যক ক্রেতার কারণে সুপারমার্কেটের সামনে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা লোলো বলেন, ‘আমি শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়েছি। গাড়ি অনেক দূরে রেখে হেঁটে এসেছি, কিন্তু গাড়ি পার্কিং থেকেই বিশাল লাইন শুরু হয়েছে। কিছুই করার নেই।’

ফ্রান্সে দীর্ঘদিন ধরেই এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারের প্রতি অনীহা রয়েছে। গত মাসে এক হাজারের বেশি মানুষের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, প্রতি ১০ জনের মধ্যে আটজন মনে করেন, এসি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

তবে তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় সেই মনোভাব দ্রুত বদলাচ্ছে। ২২ জুন তাপপ্রবাহের মধ্যে হাইপারমার্কেট চেইন ক্যারেফোর একদিনেই ৩০ হাজার কুলিং ইউনিট বিক্রি করেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী আলেক্সান্দ্র বোমপার বলেন, এটি স্বাভাবিক দিনের তুলনায় প্রায় এক হাজার গুণ বেশি।

ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় পরিবেশ সংস্থা আদেমের তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সে এসি ব্যবহার করে এমন পরিবারের হার ২০২৩ সালের ১৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

এদিকে এয়ার কন্ডিশনারের ব্যবহার এখন দেশটির রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়েও পরিণত হয়েছে। প্রধান কট্টর ডানপন্থী বিরোধী দল সরকারকে তীব্র গরম মোকাবিলায় যথাযথ প্রস্তুতি না নেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে পরিবেশবাদীরা সতর্ক করে বলেছেন, ব্যাপক হারে এসির ব্যবহার বিদ্যুতের চাহিদা বাড়িয়ে দেবে।

সম্প্রতি ফ্রান্সে রেকর্ড তাপপ্রবাহে অতিরিক্ত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে, বহু স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি সংগীত উৎসব বাতিল করা হয়েছে। দেশটির আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহান্তে আবারও দেশজুড়ে তীব্র গরমের দাপট বাড়তে পারে।

ফ্রান্সে গ্রীষ্মকাল তুলনামূলক মৃদু হওয়ায় দেশটির অধিকাংশ বাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে, ফলে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে দেশটি এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।