কাতারের আল-বায়ত স্টেডিয়ামের রাতটি মরক্কোর ফুটবল ইতিহাসে আজও এক গভীর স্মৃতি। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ২-০ গোলে হেরে রূপকথার যাত্রা থেমে গিয়েছিল আটলাস লায়নদের। তবে সেই হার শুধু স্বপ্নভঙ্গই নয়, শিখিয়েছিল বড় মঞ্চে ছোট ছোট ভুলের মূল্য কতটা বড় হতে পারে।

চার বছর পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি হচ্ছে এই দুই দল। ২০২৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে মরক্কো এবার নামছে প্রতিশোধের আবেগ সঙ্গী করে অতীতের শিক্ষা কাজে লাগিয়ে নতুন ইতিহাস লেখার প্রত্যয়ে।

মরক্কোর এই আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন মিলেছে মিডফিল্ডার আজদিন উনাহির কথায়। ফিফা প্লাসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ২০২২ সালের সেই সেমিফাইনাল স্মরণ করে তিনি বলেছেন, ‘আমরা জানি আমরা কী কী ভুল করেছিলাম। সেই ম্যাচে আমাদের আরও ভালো ফল পাওয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু ছোট ছোট কিছু ভুলের খেসারত আমাদের দিতে হয়েছিল।’

উনাহির এই উপলব্ধি যেন বর্তমান মরক্কোর মানসিকতারই প্রতিচ্ছবি। চার বছর আগের দলটি এখন অনেক বেশি পরিণত। নিজেদের শক্তি-দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে সামনে এগোনোর মানসিকতা গড়ে উঠেছে দলের ভেতরে। সেই সঙ্গে বদলেছে স্কোয়াডও। কাতার বিশ্বকাপের অনেক ফুটবলার এখনো দলে আছেন, আবার নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের সংযোজনে বেড়েছে গভীরতা। কোচিং স্টাফেও এসেছে পরিবর্তন।

উনাহির বিশ্বাস, এই নতুনত্বই মরক্কোর সবচেয়ে বড় শক্তি। তাঁর ভাষায়, ‘এখন আমাদের দলে নতুন কোচিং স্টাফ এবং নতুন একঝাঁক খেলোয়াড় এসেছে। এই দলটার ভেতর একধরনের সতেজতা আছে, যা যেকোনো প্রতিপক্ষকে কাঁপিয়ে দিতে পারে।’

তবে সামনে যে প্রতিপক্ষ, তাদের শক্তির কথা মরক্কো ভালো করেই জানে। কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ঘিরে গড়ে ওঠা ফ্রান্স এখনো শিরোপার অন্যতম দাবিদার। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তাদের অভিজ্ঞতা ও স্কোয়াডের গভীরতা মরক্কোর জন্য বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। সেটিও স্বীকার করেছেন উনাহি, ‘যখন আপনি ফ্রান্সের মতো সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলবেন, তখন লড়াইটা কতটা কঠিন হতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে ফুটবলে অসম্ভব বলে কিছু নেই।’

এই বিশ্বাসই মরক্কোকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কাতার বিশ্বকাপে স্পেন ও পর্তুগালের মতো পরাশক্তিকে বিদায় করে তারা দেখিয়েছিল, সংগঠিত রক্ষণ, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং অদম্য মানসিকতা থাকলে যেকোনো দলকে হারানো সম্ভব। এবারও সেই কৌশলই তাদের মূল অস্ত্র হতে পারে। তবে আগেরবারের মতো নয়, এবার সেই পরিকল্পনার সঙ্গে যোগ হয়েছে অভিজ্ঞতার পরিপক্বতা এবং ভুল থেকে শেখার শিক্ষা।

ফ্রান্সও অবশ্য প্রতিপক্ষকে হালকাভাবে দেখছে না। এমবাপ্পে ইতিমধ্যেই সতীর্থদের সতর্ক করে দিয়েছেন, মরক্কোকে হারাতে হলে নিজেদের সেরাটা খেলতে হবে। কিন্তু মরক্কোর এখন অন্য সুর। চার বছর আগের আক্ষেপকে আর বয়ে বেড়াতে চায় না তারা। বরং সেই স্মৃতিকেই শক্তিতে রূপান্তর করে বিশ্বকাপের আরেকটি বড় মঞ্চে নিজেদের সামর্থ্যের নতুন প্রমাণ দিতে প্রস্তুত।

আল-বায়তের সেই রাত মরক্কোকে কাঁদিয়েছিল। এবার বোস্টনের কোয়ার্টার ফাইনাল কি তাদের হাসাবে? উত্তর মিলবে মাঠেই। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—এই মরক্কো শুধু অতীতের স্মৃতি নিয়ে খেলতে নামছে না, বরং সেই স্মৃতিকে ইতিহাস বদলে দেওয়ার প্রেরণায় রূপ দিতে চাইছে।