প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের (পিজিআর) ৫১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এমন নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করতে হবে, যাতে জনগণ নিজেদের সরকারপ্রধান থেকে বিচ্ছিন্ন মনে না করে।
রোববার (৫ জুলাই) ঢাকার সেবানিবাসে পিজিআরের ৫১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিসেবে আমি জনগণের বিশ্বাস এবং ভালোবাসার ওপর আমার আস্থা ও নির্ভরতা বজায় রাখতে চাই। সুতরাং নিরাপত্তা কৌশল যাতে সরকারপ্রধানকে জনগণ থেকে দূরে ঠেলে না দেয়, সেদিকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখার জন্য আমি আপনাদের প্রতি বিশেষভাবে আহ্বান জানাই।’
তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জনসভা এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে অংশ নিতে হয়। এসব অনুষ্ঠানে ব্যাপক জনসমাগমের মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিছুটা জটিল। তাই একদিকে সরকারপ্রধানের নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং অন্যদিকে, নাগরিক জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত রাখার মধ্যে ভারসাম্য রেখেই নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানের শুরুতে পিজিআরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বাহিনীর সাবেক ও বর্তমান সব কর্মকর্তা ও সদস্যকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, ‘নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাই গার্ডসের লক্ষ্য’ এই মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে পিজিআরের সদস্যরা আন্তরিকতা, পেশাগত দক্ষতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, সাহস ও দেশপ্রেমের শপথে বলীয়ান হয়ে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তার জীবনের ‘সবচেয়ে শোকাবহ ও হৃদয়বিদারক’ ঘটনা হিসেবে তার বাবা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শাহাদাত বরণ করার সময় কর্তব্যরত পিজিআরের কয়েকজন সদস্যও শহীদ হন। তাদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে আল্লাহর দরবারে মাগফিরাত কামনা করেন তিনি।
তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনকালে তাদের নির্মম মৃত্যু রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের নিরাপত্তায় অটল আনুগত্য, কর্তব্যপরায়ণতা এবং জীবন উৎসর্গের যে চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা পিজিআরের সদস্যদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
পিজিআরের ইতিহাস তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপতি ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার জন্য ১৯৭৫ সালের ৫ জুলাই ‘রাষ্ট্রপতির দেহরক্ষী ইউনিট’ নামে একটি নতুন রেজিমেন্ট আত্মপ্রকাশ করে। পরে ওই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ইউনিটটির নাম ‘প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট’ রাখেন। তার ভাষ্য, এই নতুন নামকরণ রেজিমেন্টের কার্যক্রমকে আরও আত্মপ্রত্যয়ী ও গতিশীল করেছে। তিনি বলেন, পিজিআর প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান একটি অবিস্মরণীয় ও অনুপ্রেরণামূলক নাম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার বাবা ও মা বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকায় কিশোর বয়স থেকেই পিজিআরের কার্যক্রমের সঙ্গে তিনি পরিচিত। তিনি বলেন, রাষ্ট্র ঘোষিত অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার দায়িত্ব পালনও পিজিআরের অন্যতম কর্তব্য। এসব দায়িত্ব পালনে সদস্যদের বিশ্বস্ততা, দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যপরায়ণতা বাহিনীটিকে একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তিনি জানান, সুশৃঙ্খলতার স্বীকৃতি হিসেবে চলতি বছর পিজিআর ‘ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড’ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে। এ জন্য বাহিনীর সদস্যদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তাদের ইস্পাত-কঠিন দায়িত্ববোধ প্রশংসনীয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বিশেষভাবে নির্বাচিত ও প্রশিক্ষিত সদস্যরাই পিজিআরে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচিত হন। অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট সেনাবাহিনীর অধীন একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। তাই পেশাদারত্ব, আনুগত্য ও শৃঙ্খলার সমন্বয়ে সদস্যদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমেই পিজিআরের দক্ষতা ও একনিষ্ঠতা ফুটে উঠবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, পিজিআরের সদস্যরা সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সদস্য হওয়ায় তারা বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত, যা বাহিনীটিকে আরও দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী ও গৌরবান্বিত করেছে। একটি দেশের সশস্ত্র বাহিনী দেশ ও জনগণের সাহস এবং গৌরবের প্রতীক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর সাহসী ভূমিকা সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত করেছে।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আর্থসামাজিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ বিকাশের ফলে সাইবার যুদ্ধ, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, ড্রোন যুদ্ধ ও তথ্যযুদ্ধের মতো বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু পিজিআর নয়, প্রতিটি বাহিনীকে আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকতে হবে। বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে সাহস, দক্ষতা, কৌশল ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে পিজিআরের পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর আগে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যে উপলব্ধির কথা তিনি বলেছিলেন, তা পিজিআরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তার মতে, রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এমন কৌশল নিতে হবে, যাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, আবার জনগণও সরকারপ্রধান থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ না করে।
তিনি বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি পিজিআর ও এসএসএফের মতো বিশেষায়িত বাহিনীগুলোকে আরও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা সরকার গ্রহণ করেছে এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সশস্ত্র বাহিনী যদি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ থেকে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা অনুসরণ এবং পেশাদারত্ব বজায় রাখে, তাহলে দেশের সার্বভৌমত্ব কখনো হুমকির মুখে পড়বে না।
তিনি বলেন, পিজিআরের মতো বিশেষায়িত বাহিনীর সর্বোচ্চ সফলতার জন্য আধুনিক নিরাপত্তা কৌশল ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি প্রতিটি সদস্যের সাহস, সততা, বিশ্বস্ততা, সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব, নিয়মানুবর্তিতা এবং সর্বোপরি ‘চেইন অব কমান্ড’ অনুসরণ কঠোরভাবে মেনে চলা অপরিহার্য।
পরে পিজিআরের গৌরবময় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বাহিনীর সব সদস্যের সুস্বাস্থ্য, মঙ্গল ও উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী।
কেএইচ/এসএনআর








