প্লাস্টিক নিজে কোনো খারাপ উপাদান নয়। বরং এর সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবই পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল কাদের ইবনে কামাল। তিনি বলেন, প্লাস্টিক ছাড়া আমরা এক মুহূর্তও চলতে পারবো না। প্লাস্টিক আসলে খারাপ না, খারাপ হচ্ছে এর ব্যবস্থাপনা।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে ‘বাংলাদেশে টেকসই প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: চ্যালেঞ্জ ও অংশীদারদের দায়িত্ব’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে। এর মিডিয়া পার্টনার ছিল জাগোনিউজ২৪.কম।

অধ্যাপক আব্দুল কাদের ইবনে কামাল বলেন, প্লাস্টিক নিয়ে অযথা আতঙ্কের প্রয়োজন নেই। সঠিকভাবে সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করতে পারলে প্লাস্টিক একটি মূল্যবান সম্পদে পরিণত হতে পারে।

করোনা মহামারির উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, অনেকেই কাচের বোতল বা জগ ব্যবহারের কথা বলেন। কিন্তু কোভিড-১৯ এর মতো মহামারির সময় স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার কারণে একবার ব্যবহারযোগ্য (সিঙ্গেল-ইউজ) প্লাস্টিকের বিকল্প ছিল না। তাই প্লাস্টিকের ব্যবহার নয়, বরং এর দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অধ্যাপক আব্দুল কাদের বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের ল্যান্ডফিলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে কম মূল্যমানের লো-ডেনসিটি পলিথিন। অন্যদিকে পিইটি বোতল, এইচডিপিইসহ অধিকাংশ মূল্যবান প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করে পুনর্ব্যবহারের আওতায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এসব উপকরণের অর্থনৈতিক মূল্য থাকায় সেগুলো দ্রুত সংগ্রহ হয়ে যায়।

প্লাস্টিক ছাড়া চলা সম্ভব না, দরকার সঠিক ব্যবস্থাপনা: অধ্যাপক কাদেরগোলটেবিল বৈঠকে কথা বলছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুল কাদের ইবনে কামাল/ছবি: জাগো নিউজ

অধ্যাপক আব্দুল কাদের বলেন, যদি লো-ডেনসিটি পলিথিনেরও অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করা যায়, তাহলে সেটিও আর পরিবেশে পড়ে থাকবে না। যে কোনো সমজাতীয় (হোমোজেনিয়াস) উপাদান বর্জ্য নয়, বরং একটি সম্পদ।

তিনি জানান, দেশের সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) ঘুরে তার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সেখানে বর্জ্যের বড় অংশই প্রাথমিক পর্যায়ে আলাদা করা হয় ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণগুলো রিসাইক্লিং চেইনে চলে যায়। তাই বাসা থেকে আলাদা করার পাশাপাশি এসটিএসগুলোকে আরও কার্যকর করা গেলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব।

প্লাস্টিক থেকে জ্বালানি উৎপাদনের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরে অধ্যাপক আব্দুল কাদের বলেন, বাংলাদেশে পাইরোলাইসিস প্রযুক্তির মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের কাজ এগোচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও এ ধরনের তেলের চাহিদা রয়েছে। কৃষি, শিল্প ও অন্যান্য খাতে এর ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্লাস্টিক নিয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে সমন্বিত শিক্ষার অভাব রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা নিজ নিজ পদ্ধতিতে প্লাস্টিক বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই জাতীয় পর্যায়ে অভিন্ন শিক্ষা উপকরণ ও বার্তা প্রয়োজন।

প্লাস্টিক ছাড়া চলা সম্ভব না, দরকার সঠিক ব্যবস্থাপনা: অধ্যাপক কামালগোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত অতিথিরা/ছবি: জাগো নিউজ

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বর্জ্য ও কেমিক্যাল ব্যবস্থাপনা) রাজিনারা বেগমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (আইন) খালেদ হাসান, পরিচালক (প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা) এ কে এম রফিকুল ইসলাম, পরিচালক (পরিকল্পনা শাখা) মো. হাসান হাসিবুর রহমান, পরিচালক (আইটি) মো. সাদিকুল ইসলাম, উপ-পরিচালক (বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবস্থাপনা) ড. আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ পরিবেশ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা, বাংলাদেশ পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের (বিপিসিএল) প্রধান নির্বাহী খাদেম ইউসুফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিব আহমেদ, বুয়েটের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাকিল আক্তার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল কাদের ইবনে কামাল, বিইউপির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আরিফুর রহমান ভূঁইয়া, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল ও হেড অব সাসটেইনেবিলিটি সুমাইয়া তাবাসসুম আহমেদ, জাতিসংঘ শিল্প উন্নয়ন সংস্থা (ইউনিডো) বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর সত্য ভট্টাচার্য, ইউনিলিভার বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রকিউরমেন্ট লিড দিলরুবা আহমেদ চৌধুরী, ব্র্যাকের পরিচালক ড. মো. লিয়াকত আলী, ব্র্যাকের বাংলাদেশ সাসটেইনেবিলিটি অ্যালায়েন্সের প্রধান সমন্বয়কারী সংকলিতা সোম, লাফার্জ হোলসিমের ডেপুটি ম্যানেজার (জিওসাইকেল) তামরিন চৌধুরী, নেসলে বাংলাদেশের এইচআর ডিরেক্টর হোসনে আরা লোমা, ম্যারিকো বাংলাদেশের ডিরেক্টর (লিগ্যাল অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স) রাশেদ এহসান, ওয়েস্ট কনসার্নের কো ফাউন্ডার ও ডিরেক্টর ইফতেখার এনায়েতুল্লাহ, জাগো নিউজের সম্পাদক কে এম জিয়াউল হক, সমকালের সিনিয়র রিপোর্টার জাহিদুর রহমান প্রমুখ বৈঠকে অংশ নেন।

ইএইচটি/এএমএ/এমএফএ