প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হেড অব সাসটেইনেবিলিটি সুমাইয়া তাবাসসুম আহমেদ বলেছেন, দেশে বিভিন্ন খাতে প্লাস্টিকের ব্যবহার ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় প্লাস্টিক পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। তাই এর অপব্যবহার রোধ করে দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

তিনি বলেন, প্লাস্টিকের দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই পরিবেশ সুরক্ষার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে। এজন্য নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি, উৎসে বর্জ্য পৃথকীকরণ, শিল্প ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার এবং দ্রুত এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি (ইপিআর) নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরে বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে টেকসই প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: চ্যালেঞ্জ ও অংশীদারদের দায়িত্ব’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে সমাপনী বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি। যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। এর মিডিয়া পার্টনার ছিল জাগোনিউজ২৪.কম।

অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্যের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে সুমাইয়া তাবাসসুম আহমেদ বলেন, বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রায় সব পক্ষই একমত হয়েছেন যে, প্লাস্টিকের নানা উপকারিতা রয়েছে এবং বর্তমান বাস্তবতায় এটি পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। তাই প্লাস্টিকের অপব্যবহার রোধ করে এর দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হেড অব সাসটেইনেবিলিটি বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্লাস্টিক বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা। এ সমস্যা সমাধানে শুধু সরকার বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; সাধারণ নাগরিকসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বিত ও সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, গৃহস্থালি পর্যায় থেকেই বর্জ্য আলাদা (সোর্স সেগ্রিগেশন) করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এতে পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সহজে সংগ্রহ করা সম্ভব হবে এবং রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে আরও উন্নতমানের পণ্য উৎপাদন করা যাবে।

বৈঠকে একাডেমিক প্রতিনিধিরা একবার ব্যবহারযোগ্য (সিঙ্গেল-ইউজ) ও পুনর্ব্যবহারে কঠিন প্লাস্টিক নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন বলেও জানান সুমাইয়া। একই সঙ্গে প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনায় নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী ধারণা নিয়ে গবেষণা এবং শিল্প-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে জ্ঞান বিনিময় বাড়ানোর আহ্বান জানান।

প্লাস্টিক পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়, সঠিক ব্যবস্থাপনাই সমাধানপ্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হেড অব সাসটেইনেবিলিটি সুমাইয়া তাবাসসুম আহমেদ, ছবি: জাগো নিউজ

সুমাইয়া তাবাসসুম আহমেদ বলেন, গাজীপুর, ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। এসব উদ্যোগ পরীক্ষামূলক পর্যায় থেকে বড় পরিসরে বাস্তবায়নের জন্য অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান বিনিময়ের প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি বলেন, বৈঠকে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, ইউনিলিভার, নেসলেসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম তুলে ধরেছে। আলোচনায় উঠে এসেছে, কেবল ভোক্তাদের নয়, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পরিবেশবান্ধব আচরণ গড়ে তোলা ও কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আচরণগত পরিবর্তন নিশ্চিত করা জরুরি।

রিসাইক্লিং খাতের প্রসঙ্গ তুলে সুমাইয়া তাবাসসুম আহমেদ বলেন, উচ্চমূল্যের প্লাস্টিক যেমন পিইটি সহজেই পুনর্ব্যবহার হচ্ছে। তবে কম মূল্যমানের প্লাস্টিকের জন্য কার্যকর বাজার ও শক্তিশালী মূল্যশৃঙ্খল (ভ্যালু চেইন) গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি (ইপিআর) নীতিমালা শিগগির কার্যকর হতে যাচ্ছে। প্রথম দুই বছর স্বেচ্ছাভিত্তিক বাস্তবায়নের সুযোগ থাকবে। এ সময়ের মধ্যে শিল্প, সরকার ও অন্যান্য অংশীজন একসঙ্গে কাজ করলে পরবর্তীসময়ে নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন সহজ হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘দেশে এরই মধ্যে সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট রুলস রয়েছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে তা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে একটি পরিচ্ছন্ন ও টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’

‘প্লাস্টিক পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়, সঠিক ব্যবস্থাপনাই সমাধান’গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত অতিথিরা, ছবি: জাগো নিউজ

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বর্জ্য ও কেমিক্যাল ব্যবস্থাপনা) রাজিনারা বেগমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (আইন) খালেদ হাসান, পরিচালক (প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা) এ কে এম রফিকুল ইসলাম, পরিচালক (পরিকল্পনা শাখা) মো. হাসান হাসিবুর রহমান, পরিচালক (আইটি) মো. সাদিকুল ইসলাম, উপ-পরিচালক (বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবস্থাপনা) ড. আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ পরিবেশ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা, বাংলাদেশ পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের (বিপিসিএল) প্রধান নির্বাহী খাদেম ইউসুফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিব আহমেদ, বুয়েটের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাকিল আক্তার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল কাদের ইবনে কামাল, বিইউপির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আরিফুর রহমান ভূঁইয়া, জাতিসংঘ শিল্প উন্নয়ন সংস্থা (ইউনিডো) বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর সত্য ভট্টাচার্য, ইউনিলিভার বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রকিউরমেন্ট লিড দিলরুবা আহমেদ চৌধুরী, ব্র্যাকের পরিচালক ড. মো. লিয়াকত আলী, লাফার্জ হোলসিমের ডেপুটি ম্যানেজার (জিওসাইকেল) তামরিন চৌধুরী, নেসলে বাংলাদেশের এইচআর ডিরেক্টর হোসনে আরা লোমা, ম্যারিকো বাংলাদেশের ডিরেক্টর (লিগ্যাল অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স) রাশেদ এহসান, ওয়েস্ট কনসার্নের কো ফাউন্ডার ও ডিরেক্টর ইফতেখার এনায়েতুল্লাহ, জাগো নিউজের সম্পাদক কে এম জিয়াউল হক, সমকালের সিনিয়র রিপোর্টার জাহিদুর রহমান প্রমুখ বৈঠকে অংশ নেন।

ইএইচটি/এমএএইচ/এমএফএ