প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই সফরের মাধ্যমে দুদেশের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হওয়া এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনায় সমীক্ষা ও সহযোগিতা, কুনমিং থেকে বাংলাদেশের বন্দর পর্যন্ত পরিবহণ সংযোগ এবং চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের সম্ভাবনা যাচাইয়ের মতো বড় উদ্যোগগুলো দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ভাবনায় এক নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। বিএনপি ঘোষিত ‘ফার্স্ট বাংলাদেশ’ নীতির আলোকে এ সফরকে কূটনৈতিক ও কৌশলগত বড় সাফল্য হিসাবে দেখা হলেও এই নতুন ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের ভেতরে যে গভীর কৌশলগত চ্যালেঞ্জ লুকিয়ে রয়েছে, তা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দূরদর্শী কূটনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হবে।
চীনের মতো বিশ্ব পরাশক্তি যখন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানের প্রশ্নে প্রকাশ্য দ্ব্যর্থহীন সমর্থন ঘোষণা করে, তখন তা যে কোনো উদীয়মান রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ও মনস্তাত্ত্বিক শক্তির উৎস। তবে এই অভূতপূর্ব ভূরাজনৈতিক নৈকট্যের একটি বহুমাত্রিক পিঠও রয়েছে, যা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অন্যান্যবারের তুলনায় এবারের ঘোষণায় কেবল অর্থনৈতিক সহযোগিতাই নয়, বরং পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষাসংশ্লিষ্ট ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের মতো স্পর্শকাতর কৌশলগত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কৌশলগত অংশীদারত্বের এই নতুন উচ্চতা যেন কোনোভাবেই বাংলাদেশকে বৈশ্বিক শক্তির টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত না করে, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব।
মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশকে নিজের জাতীয় ও অর্থনৈতিক স্বার্থকেই সবার ওপরে স্থান দিতে হবে। যে কোনো বড় অর্থনৈতিক করিডর বা আঞ্চলিক সংযোগের চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরির আগে কঠোরভাবে এর ফিজিবিলিটি অ্যানালাইসিস বা সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে, যাতে কোনো প্রকল্পই দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ঋণের ফাঁদ বা সার্বভৌমত্বের ওপর কৌশলগত চাপ সৃষ্টি না করে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের এই অভূতপূর্ব ঘনিষ্ঠতার অর্থ এ নয় যে, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো টানাপোড়েন তৈরি হতে দেওয়া যাবে। বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান এমন, এখানে বেইজিং ও নয়াদিল্লির স্বার্থের একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করেই আমাদের চলতে হবে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে চীনের সহায়তার আশ্বাসকে কেবল টেবিলের আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখা চলবে না। বরং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে একটি সময়াবদ্ধ রোডম্যাপ তৈরিতে কাজে লাগাতে হবে। তাছাড়া মালয়েশিয়ার পেট্রোনাসের সঙ্গে তেল-গ্যাস অবকাঠামো এবং চীন থেকে এলএনজি ও ডিজেল আমদানির যে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে, তা দ্রুত কার্যকর চুক্তিতে রূপান্তর করা দরকার, যাতে দেশের চলমান শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ খাতের স্থবিরতা দূর করা যায়।
আমরা মনে করি, বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রতি বিশ্বশক্তিগুলোর এই গভীর আস্থা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় সুযোগ। তবে মনে রাখতে হবে, কূটনীতি কোনো আবেগ বা একমুখী বন্ধুত্বের জায়গা নয়, এটি চূড়ান্তভাবে জাতীয় স্বার্থের দরকষাকষি। চীন ও মালয়েশিয়া সফরের এই ঐতিহাসিক অর্জনগুলো যেন কেবল রাজনৈতিক প্রচারণায় সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সার্বভৌমত্বকে সুরক্ষিত করার টেকসই হাতিয়ারে পরিণত হয়-এটাই প্রত্যাশা।








