রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘বালিশ-কাণ্ড’ একসময় জাতীয়ভাবে আলোচিত হয়েছিল। তখন প্রশ্ন উঠেছিল, কীভাবে সাধারণ বাজারদরের বহুগুণ বেশি দামে বালিশ, আসবাব বা নির্মাণসামগ্রী কেনা সম্ভব হলো। কিন্তু নতুন নিরীক্ষা প্রতিবেদন দেখাচ্ছে, সেটি ছিল বৃহত্তর দুর্নীতির কেবল একটি ক্ষুদ্র অংশ। এখন একের পর এক বেরিয়ে এসেছে আরও ভয়াবহ তথ্য।

রূপপুর প্রকল্পের ‘গ্রিন সিটি’ আবাসনের ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম ও জেনারেটর কেনায় সরকারি দরের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। যেখানে সরকারি হিসাবে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল প্রায় ২৭ কোটি টাকা, সেখানে খরচ দেখানো হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ১৮৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।

একটি ভবনের উদাহরণই চিত্রটি স্পষ্ট করে। ৭ নম্বর ভবনে উচ্চ ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের সরকারি দাম ছিল ১০ লাখ টাকার কিছু বেশি, অথচ বিল করা হয়েছে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। একটি ট্রান্সফরমারের জন্য যেখানে সরকারি দর ৪০ লাখ টাকা, সেখানে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। একইভাবে নিম্ন ভোল্টেজ সরঞ্জাম, পাওয়ার ফ্যাক্টর প্যানেল ও জেনারেটরের দামও কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। এতে মাত্র একটি ভবনেই প্রায় ১৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।

এখানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় শুধু অর্থের অঙ্ক নয়, বরং এই দুর্নীতির পদ্ধতি। দরপত্র এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে মোট ব্যয় দাপ্তরিক প্রাক্কলনের কাছাকাছি থাকে। কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে কিছু পণ্যের দাম কম দেখিয়ে সামগ্রিক হিসাবকে ‘গ্রহণযোগ্য’ রাখা হয়েছে। এটি একটি পরিকল্পিত কারসাজি।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় সরকারি ক্রয় বিধিমালার মৌলিক নিয়মগুলো কার্যত উপেক্ষা করা হয়েছে। কোনো দরদাতা অস্বাভাবিক মূল্য প্রস্তাব করলে তার ব্যাখ্যা চাওয়ার কথা ছিল, অতিরিক্ত ঝুঁকি থাকলে জামানত বাড়ানোর সুযোগ ছিল, অনুমোদিত প্রাক্কলন কমিটি থাকার কথা ছিল। কিন্তু নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসবের কোনোটিরই প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা শুধু অবহেলা করেননি, বরং এমন ধারণা শক্তিশালী হয়েছে যে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সচেতনভাবে ঠিকাদারদের আর্থিক সুবিধা দিয়েছে।

এই ঘটনায় তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে মোট প্রায় ১৮৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অতীতে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তারও হয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, যাঁরা আগে থেকেই বিতর্কিত ছিলেন, তাঁরা কীভাবে আবার একই ধরনের সরকারি প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হলেন?

এর আগে প্রকাশ পায়, এই প্রকল্পে মোট ৪ হাজার ৭০২টি বালিশ কেনা হয়েছিল। যার মধ্যে অনেক বালিশের দাম ছিল প্রতিটি ৯০ হাজার টাকা। একটি ড্রেসিং টেবিলের বাজারদর ৩০ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু সরকারি প্রকল্পের নথিতে সেই টেবিলের দাম দেখানো হয়েছে সর্বোচ্চ ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হচ্ছে, এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রকল্পগুলোর একটি। এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, সেখানে যদি প্রকল্পের আবাসন খাতেই এমন লুটপাট ঘটে, তাহলে মূল প্রকল্পের অন্যান্য অংশে কী ঘটেছে বা ঘটছে, সেই প্রশ্ন অবধারিতভাবেই উঠবে।

নিরীক্ষা বিভাগ যে সুপারিশ করেছে অর্থাৎ দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত আনা, তা অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে, কিন্তু সেটিই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, দুর্নীতি দমন কমিশনের সক্রিয় ভূমিকা এবং এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, যা ভবিষ্যতের সব মেগা প্রকল্পের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়ায়।