বেঙ্গল শিল্পালয়ের চারতলার বারান্দায় পা রাখতেই কোলাহল কানে এলো। একদল যূথবদ্ধ মানুষ আলাপচারিতায় মত্ত। আমরা সবাই এসেছি ‘সহাবস্থানের স্থাপত্য’ নামের প্রদর্শনীতে। এটিকে নিছক একটি প্রদর্শনী বলে মনে হয়নি। সায়কা ইকবাল মেঘনা ও শুভ্র শোভন চৌধুরীর স্থাপত্যকর্মগুলো কিছু গভীর ও জরুরি দার্শনিক প্রশ্ন তৈরি করেছে : যে গঠিত পরিবেশ বা ‘বিল্ট এনভায়রনমেন্টে’ আমরা দিনযাপন করি, তা কি চিরস্থায়ী? এ আলয় কি প্রাণহীন, প্রভাবশূন্য স্থাপনা? পরিবেশ কি আমাদের চিন্তা বা মানবিক সত্তাকে তৈরি করে? যদিও প্রদর্শনীটি উন্মুক্ত স্থান বা পাবলিক স্পেসকে ঘিরে একটি প্রস্তাব, তবু স্থপতিদের এ ভাবনা তৈরি থাকা অন্দরমহলকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, পূর্ব আফ্রিকার কৃষিবিপ্লবের পর, প্রায় ১৪ হাজার বছর আগে আশ্রয়ের আশায় ‘স্থায়ী’ আলয় তৈরি করতে থাকে মানুষ। এতে পরিবার বড় হয় ঠিক। তবে ঘর, দালান, এমনকি ছাউনি দিয়ে তৈরি গঠিত পরিবেশ কিছু ভ্রমের জন্ম দেয়। এক. স্থাপত্য স্থায়ী। অর্থাৎ, ইট-কাঠ-পাথরে গড়া ঘর বা দালানের বার্ধক্য আসে না। এদের মৃত্যু নেই। দুই. মানুষের সঙ্গে এ জড়ো স্থাপত্যের আত্মিক যোগাযোগ তৈরি হয় না। স্থাপত্য আমাদের মননকে প্রভাবিত করে না।

ভ্রম কেন বলছি? প্রকৃতির এমন একটি উপকরণ কি দেখানো যাবে, যা চিরস্থায়ী কিংবা স্থবির? পাহাড়ের চরিত্র বদলায়। মাটির পাহাড় একসময় পাথুরে হয়। তার গায়ে জন্মানো ঘাস আর গুল্মকে স্থানচ্যুত করে বহুবর্ষজীবী গাছ। এ গাছের বয়স বাড়ে, একসময় মৃত্যুও ঘটে। আবার এ পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসে গতিময় বৃষ্টিজাত কিংবা বরফগলা জল। ঝরনা থেকে তৈরি হয় নদী। স্বচ্ছ নদীর জল একসময় ঘোলা হয়। পললে জমে শ্যাওলা। স্থায়িত্ব বা স্থবিরতার চিহ্নমাত্র নেই প্রকৃতিতে। আর সেই প্রকৃতিকে বশে আনবার প্রত্যাশায় আমরা আজন্ম বিভ্রমে তৈরি করি স্থাবর দালানকোঠা।

স্থপতিরা যখন নির্মাণসামগ্রী বেছে নেন, তখন আর যাই হোক, একটি অস্থায়ী স্থাপনা গড়ার স্বপ্ন দেখেন না। প্রতিটি বাড়ি, সব দালান, হবে কমপক্ষে শতবর্ষী। তাই দেওয়ালে নোনা ধরলে এর রং ফিকে হতে থাকলেই পুনরায় রং চড়াই আমরা। দালানের প্রাচীরে শ্যাওলা ধরতে দেওয়া চলবে না। জানালার কাচ অস্বচ্ছ হয় কী করে? এখানেই প্রকৃতির সঙ্গে প্রথম বিচ্ছেদরেখা টানা হয়। অনিত্যতার প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে মানুষ। দেখাবে আপাত স্থায়িত্বের আস্ফালন। এ অসম সম্পর্কে লাভ কতটুকু রয়েছে জানি না, তবে ক্ষতি আছে বিস্তর। এর কয়েকটি লক্ষণের কথা বলি।

আমাদের সমাজ এখন অসহিষ্ণুতার একটি চারণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আমার মত আপনার অপছন্দ। আপনার ধর্ম আমার কাছে ভালো ঠেকে না। আপনার রাজনীতি আমার চক্ষুশূল। আমার জীবন আপনার জন্য ঈর্ষণীয়। এ অসহিষ্ণু, অস্থিরতার পেছনে অর্থনীতি, শিক্ষা আর সমাজনীতির হাত তো রয়েছেই। তবে ঘর আর দালানের প্রভাব? প্রত্যক্ষভাবে হয়তো স্থাপত্যের সঙ্গে মনস্তত্ত্বের সম্পর্ক বোঝা কঠিন। তবে গঠিত পরিবেশের সঙ্গে আমাদের আচরণের অন্তরালে একটি নিয়ন্ত্রণমুখিতার প্রশিক্ষণ চলছে যেন। ঘরে আমার মা থাকেন, থাকে আমার স্ত্রী-সন্তান। এ ঘরের স্থায়িত্ব তাই আপসহীন। নোনা, মরচে, আর বিবর্ণ দেওয়ালকে তাই পরিশোধন করতে হবে। ঘর হতে হবে অপরিবর্তনশীল, অনমনীয়, অনড় দুর্গবিশেষ। যে মাঠে সমাবেশ হয়, যে পার্কে কাটে মূল্যবান অবসর, সেই উন্মুক্ত অঙ্গনে স্থাপত্যের ঘাটতি কিংবা প্রকৃতিবিচ্ছিন্ন স্থাপনার উপস্থিতি আমাদের চিন্তাকে নিশ্চয়ই প্রভাবিত করবে।

তবে ঘর বা তার উপকরণ, দালান বা তার ভেতরকার উপঢৌকন, অর্থাৎ যে কোনো স্থাপনার ভিত্তি যদি প্রকৃতিবিচ্ছিন্ন না হতো, তবে কেমন হতো? বাড়ির ভেতর প্রবেশ করলে যদি দিনের আলো কিংবা রাতের নিস্তব্ধতাকে স্পর্শ করা যেত, তবে কি মন্দ হতো? যদি পার্কের বিকালটা অনড় কাঠামোতে না কাটিয়ে প্রকৃতির স্পন্দনের সঙ্গে সমন্বয় রয়েছে-এমন একটি ছাউনিতে অতিবাহিত করা যায়, তবে কেমন হয়?

স্থবিরতার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে, প্রকৃতির ছন্দে অনুরণন খুঁজেছেন স্থপতি মেঘনা আর শোভন। পোড়ামাটির তৈরি টাইল দিয়ে বানানো প্ল্যাটফর্ম, বাঁশ দিয়ে তৈরি ছাউনি, আর কাঠ ও ধানের তুষের ব্যবহারে গড়া স্থাপত্যগুলোর বিশেষ শক্তি পরিলক্ষিত হয়। প্রথমত, স্থাপনাগুলো মডুলার; অর্থাৎ চিন্তাগত দিক থেকেই এগুলো অস্থায়ী, স্থানান্তরযোগ্য। দ্বিতীয়ত, নির্মাণসামগ্রীর বাছাই নিশ্চিতভাবে অনিত্যতার গল্প শোনায়। পোড়ামাটির টাইল চুয়ে বৃষ্টির জল পড়ে, খানিকটা বিশুদ্ধও হয়। আর মাটি তো মাটিতে মেশার জন্য আরাধনা করে। বাঁশও তেমনই পচনশীল বা বায়োডিগ্রেডেবল; অস্থায়িত্ব এর শরীরে শরীরে। আর এখানেই এ স্থাপনাগুলোর শক্তি।

প্রকৃতির সঙ্গে আবাসের দূরত্ব যতটুকু কমানো যায়, জীবন আর মননের সুস্থতা তত বাড়ে। অন্তরিন থাকার যন্ত্রণা কেবল কয়েদিরাই বোঝে। আমরা খানিকটা বুঝেছিলাম অতিমারির বছরগুলোয়। পড়ার ঘরের জানালা খুললে যদি সন্ধ্যার সমীরণ প্রবেশ না করে, বসার ঘরে যদি থাকে অন্ধকার গুমোট, আর শোয়ার ঘরে যদি খানিক আলো নাই-ই ঢোকে, তবে সে ঘরে আর যাই হোক রবীন্দ্রনাথের বেড়ে ওঠা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

মার্টিন হাইডেগার বলেছেন, আমরা কেবল একটি ঘরের দখলদারত্ব নেই না, ঘরই আমাদের চারণভূমি, বিশ্ব-আঙিনার একটুকরো উঠোন। ঘর তাই একটি নিরপেক্ষ চার দেওয়ালের বাক্স নয়, এর নকশা আমাদের মনকে গড়ে, এর চৌকাঠ পেরোলেই মস্ত পৃথিবী। তাই স্থবির আবাস আমাদের অন্তরের গতিকে স্তিমিত করে, মনকে করে তোলে অসহিষ্ণু। সমাজ বদলানোর বিমূর্ত ভাবনাকে বাস্তবায়ন করতে যদি চাই, নিজের ঘরের সীমানাকে পালটাতে হবে। গতিময় কোনো একটি নদীতে যদি দুবার অবগাহন করা না যায়, তবে স্থবির ঘরে কী করে বছরের পর বছর বাস করি আমি, আপনি? আর যদি প্রকৃতিবিচ্ছিন্ন এমনই ঘরে, এমনই মাঠে-ঘাটে জীবন কাটে আমাদের, সহিষ্ণুতার প্রত্যাশা হয়তো বাতুলতা মাত্র।

ড. নাভিদ সালেহ : যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিনে পুরঃস্থাপত্য ও পরিবেশ কৌশল অনুষদের অধ্যাপক