ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় সুমন শেখ (২৪) নামে এক কলেজ ছাত্র হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের বাড়িতে দফায় দফায় হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিপক্ষের বাড়ির সদস্যরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় অবাধে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব ঘটনা ঠেকাতে পুলিশের কার্যকর কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) বেলা ১১টা থেকে দুপুর ২টা পযন্ত টগরবন্দ ইউনিয়নের বড়ভাগ গ্রামে সরেজমিনে ঘুরে অন্তত ১০টি বাড়িতে নজিরবিহীন তান্ডবের চিত্র দেখা যায়। ওই গ্রামের এনায়েত শেখ, জনি শেখ, আলিম শেখ, শাহাদাৎ শেখ, আজগর শেখ, উজ্জল শেখ এবং রকিব শেখসহ আরও কয়েকটি বাড়িতে ধ্বংস যজ্ঞের স্বাক্ষর। প্রতিবাড়িতে তান্ডবের ধরন একই। এমনকি সেমি পাকা ভবনের চালের টিন পযন্ত লুটে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ঘরের অনেক সামগ্রী মেঝেতে তছনছ অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
গত ২৬ জুন সন্ধ্যায় বড়ভাগ পূর্বপাড়ায় উকিল শেখের বাড়ির সামনে পূর্বশত্রুতা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হামলায় নিহত হন কলেজছাত্র সুমন শেখ। তিনি বড়ভাগ গ্রামের আলাউদ্দিন শেখের ছোট ছেলে এবং কাশিয়ানী উপজেলার এম এ খালেক ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। হত্যার ঘটনায় নিহত সুমন শেখের ভাই শামীম শেখ বাদী হয়ে গত ২৭ জুন ১৭ জনকে আসামি করে আলফাডাঙ্গা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

সুত্র জানায়, এ হত্যাকান্ডের দিনগত রাতে (২৬ জুন) প্রথমে হামলা করে ভাঙচুর করা হয় উকিল শেখের বাড়ি। হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে এবং বিচার দাবিতে গত ২৯ জুন সন্ধ্যায় আলফাডাঙ্গা থানার সামনে এলাকাবাসী ও নিহতের স্বজনদের উদ্যোগে মানববন্ধন কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর থেকে ধারাবাহিক ভাবে বড়ভাগ গ্রামের বিভিন্ন মহল্লার বাসিন্দা প্রতিপক্ষের অন্তত ১০টি বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়। এ হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা রাতের অন্ধকারে যেমন ঘটেছে আবার দিনের আলোতেও ঘটেছে। এলাকাবাসী জানায়, হামলা ও লুটপাট এখনও অব্যাহত রয়েছে।
যে কারণে বিরোধ
স্থানীয় অধিপত্য নিয়ে ওই গ্রামের বাসিন্দা সাবেক ইউপি সদস্য কুদ্দুস শেখের ছেলে হুসাইন শেখ ও একই গ্রামের বাসিন্দা মুরাদ খানের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। বংশ পরম্পরায় চলে আসা এ বিরোধের জেরে মারধোর ও পাল্টা মারধোরের ঘটনা ঘটে। মুরাদ খানের পক্ষের লোকজন কয়েক বছর আগে প্রতিপক্ষ হুসাইন শেখ এর ডান হাত কব্জি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এ নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। এর জের ধরে প্রতিপক্ষ প্রতিশোধ নিতে মড়িয়া হয়ে ওঠে। গত ১৯ জুন শুক্রবার দুপুরে হুসাইন শেখের সমর্থক আলিম শেখ ও তার ছেলে জিসান শেখ একটি মোটরসাইকেলে করে স্থানীয় মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার পথে প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হন। এ ঘটনার এক সপ্তাহ পর সুমন শেখকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর ভাষ্য
টগরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি চেয়ারম্যান মিয়া আসাদুজ্জামান বলেন, স্থানীয় অধিপত্য নিয়ে ওই গ্রামের বাসিন্দা হুসাইন শেখ ও মুরাদ খানের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। বংশ পরম্পরায় চলে আসা এ বিরোধের জেরে মারধোর ও পাল্টা মারধোরের ঘটনা ঘটে আসছে। এ ঘটনার জেরে সুমনকে হত্যা করা হয়।
এলাকাবাসী জানায়, শত শত হামলাকারী মব সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষের প্রতিটি বাড়িতে চড়াও হয়। তারা প্রথম দফায় এসে ভাঙচুর ও লুটতরাজ চালায়। পরের দফা শাবল হাতুরি দিয়ে বাড়িতে বাড়িতে হামলা করে নির্মানাধীন বাড়িসহ এলাকার অন্তত ১০টি পরিবারের সেমি পাকা ও পাকা বাড়ি এবং নির্মাণাধীন বাড়ির দরজা, জানালা ভেঙ্গে লুটপাট করে নিয়ে যায়। দেওয়াল গুলি ভেঙ্গে ফেলা হয়। এমন কি প্রতিটা বাড়ির ছাদ হাতুরি শাবল দিয়ে ভেঙ্গে বড় বড় গর্ত করা হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ভাষ্য
হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিপক্ষের লোকজন এলাকা ছাড়া। বেশিরভাগ পরিবারের সদস্যদের মোবাইল নাম্বারও বন্ধ। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে আলিম শেখের স্ত্রী শাপলা বেগম বলেন, হামলাকারীরা আলমারি ভেঙে নগদ ৫ লাখ টাকা ও ১৫ ভরি স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে গেছে। এছাড়া তারা ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্রও নিয়ে গেছে। এসবের প্রতিবাদ করলে তারা হত্যার হুমকি দেয়। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার বিচার চাই এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
কলেজছাত্রকে কুপিয়ে জখম, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু
হত্যা মামলার বাদী ভাষ্য
হত্যা মামলার বাদী নিহত সুমনের ভাই শামীম শেখ বলেন, হত্যার ২১ দিন পাড় হয়ে গেছে। মামলার এজাহারভুক্ত মাত্র একজন আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অন্য আসামিরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। গ্রামে প্রতিপক্ষের বাড়িতে হামলা ভাঙচুরের ঘটনায় তারা জড়িত নন দাবী করে তিনি বলেন, আসামিরা এখনও হুমকি দিচ্ছে। বলছে একটি লাশ পড়েছে আরও পঁচ-ছয়টি লাশ পড়বে। তবে এ ব্যাপারে তিনি থানায় কোন সাধারণ ডায়েরি করেনি জানিয়ে বলেন, পুলিশকে এ হুমকির প্রমাণ সরবরাহ করা হয়েছে।
মামলার তদন্ত ডিবিতে
হত্যা মামলাটি প্রথমে তদন্ত করেছেন আলফাডাঙ্গা থানার এসআই সুমিত মজুমদার। জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে কিছু বলার নেই। বর্তমানে এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবেও নাই। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) এ মামলাটির তদন্তের ভার ফরিদপুর ডিবির কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে।

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
পুলিশ জানিয়েছে এ হত্যাকান্ডের পর ফরিদপুর পুলিশ লাইনস থেকে পুলিশের আট সদস্যকে ওই গ্রামে নিরাপত্তার দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই গ্রামে পুলিশ দলের সদস্যদের নিয়মিত টহল নেই। এছাড়াও বসত বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট ঠেকাতে পুলিশকে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখেনি গ্রামবাসী। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নাম প্রকাশে অনচ্ছিুক একাধিক গ্রামবাসী বলেন, পুলিশ যদি সত্যিই দায়িত্ব পালন করে তাহলে দিনের বেলা পরিত্যাক্ত ওই বাড়িগুলোতে কিভাবে হামলা ভাঙচুর ও লুটপাট চলতে পারে?
পুলিশের বক্তব্য
ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস) মো. শামসুল আজম বলেন, হত্যাকান্ডের ঘটনায় ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। ইতোমধ্যে এজাহারভুক্ত এক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। পাশাপাশি প্রতিপক্ষের বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। বাড়ি-ঘরে হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় কেউ মামলা করেননি, অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এন কে বি নয়ন/এসজেডএইচ/এএসএম








