গায়ে সাদা পোশাক, হাতে একতারা। মাথার উপরে পূর্ণিমার জ্যোৎস্নামাখা আকাশ। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সবুজ মাঠজুড়ে তখন ভেসে বেড়াচ্ছে বাউলের সুর। বিকালের শেষ আলো পেরিয়ে সন্ধ্যা-রাত-সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে ‘সাধুমেলা’। একতারা, দোতারা, খমক ও করতালের মূর্ছনায় যেন নগরের বুকে ফিরে আসে আবহমান বাংলার গ্রামীণ জনপদের আবহ। মাটির গন্ধমাখা গান আর মানবতার বাণীতে মুগ্ধ হয়ে শিল্পীদের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান অনেক দর্শক-স্রোতাও।
সোমবার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বাউলকুঞ্জে অনুষ্ঠিত হয় ‘সাধুমেলা’র ৭০তম আসর। লোকসংস্কৃতি, বাউল দর্শন এবং বাংলার গ্রামীণ সংগীতধারাকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যেই নিয়মিত এই আয়োজন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। এবারের আসরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা প্রায় ৫০ জন বাউল ও লোকশিল্পী অংশ নেন। তাদের পরিবেশনায় দর্শকরা উপভোগ করেন বাউল, ফকিরি ও লোকসংগীতের নানা ধারা। সন্ধ্যা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় শিল্পকলার সবুজ মাঠ যেন রূপ নেয় এক অনন্য লোকসংগীতের মিলনমেলায়।
আসরের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন বাউল সাধক ও লোকসংগীতশিল্পী টুনটুন ফকির, দিল আফরোজ রেবা, রাজ্জাক বাউল, লতিফ শাহ, আরিফ বাউল, শমির বাউল, চন্দনা মজুমদার ও শফি মণ্ডল। এছাড়া পরিবেশনায় অংশ নেন এলিজা পুতুল, শাহীন বাউল, লাভলী শেখ, রুমা আক্তার, উপমা আক্তার, আয়নাল হক বাউল, জাকারিয়া শেখ, করিম বাউল, আফসানা হক ইমু, আধারী মিলন, মুক্তার বাউল প্রমুখ।
পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয় বাউল দর্শন ও লোকসংস্কৃতির তাত্ত্বিক আলোচনা। এতে গবেষক আবু ইসহাক ও সৈয়দ জাহিদ হাসান বলেন, বাউলধারা কেবল সংগীতের একটি ধারা নয়; এটি মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং আত্মঅনুসন্ধানের এক অনন্য জীবনদর্শন। এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে নিয়মিত এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ?বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলা এই সাধুমেলায় লোকসংগীতপ্রেমী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় আলোকিত শিল্পকলার সবুজ মাঠে বাউলদের কণ্ঠে যখন ভেসে উঠছিল ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ কিংবা ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’র মতো কালজয়ী গান, তখন দর্শকদের অনেকেই শিল্পীদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে গেয়ে ওঠেন। নগরজীবনের ব্যস্ততার মাঝেও এক সন্ধ্যার জন্য শিল্পকলা একাডেমি হয়ে ওঠে প্রাণময়।








