ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দিতে প্যাকেজ ভ্যাট আরোপ করা থেকে সরে আসছে সরকার। ফলে আগের মতোই মাসে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত বেচাবিক্রি করলে টার্নওভার ট্যাক্স (ভ্যাট) দিতে হবে না। তবে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চলতি হিসাব খোলা, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন বা বিকাশ-নগদের মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে ব্যবসা শনাক্তকরণ নাম্বারের (বিআইএন) বাধ্যবাধকতা বহাল থাকছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বর্তমানে বার্ষিক ৩০ লাখ টাকার নিচে টার্নওভার থাকলে কোনো ব্যবসায়ীকে ভ্যাট দিতে হয় না। টার্নওভার ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা হলে ৪ শতাংশ হারে টার্নওভার ট্যাক্স দিতে হয়। টার্নওভার ট্যাক্সের সুবিধা হচ্ছে-এতে ইনপুট-আউটপুট ভ্যাটের জটিল হিসাব রাখতে হয় না। আর অসুবিধা হচ্ছে-লাভ-লোকসান নির্বিশেষে মোট বিক্রির ওপর নির্দিষ্ট হারে এই কর দিতে হয়। কোনো উপকরণ ক্রয়ের সময় পরিশোধিত ভ্যাটের রেয়াত বা সমন্বয় পাওয়া যায় না। বার্ষিক টার্নওভার ৫০ লাখ টাকার বেশি হলে সাধারণত ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট নিবন্ধন নিতে হয়।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এলাকা ও মার্কেটভিত্তিক ব্যবসার ধরন ও আর্থিক সক্ষমতাকে বিবেচনায় নিয়ে সীমিত পরিমাণে নির্দিষ্ট হারে কর (প্যাকেজ ভ্যাট) আরোপের প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী। গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে দেওয়া বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এই ব্যবস্থায় এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে ভ্যাটসংক্রান্ত কোনো দলিলাদি বা হিসাবের খাতাপত্র সংরক্ষণ করতে হবে না এবং রিটার্ন দিতে হবে না। এর ফলে হয়রানিমুক্ত ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে কর পরিশোধ সহজ হবে এবং জনগণ স্বপ্রণোদিত হয়ে গর্বিত করদাতা হিসাবে কর প্রদানে এগিয়ে আসবে। ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে সহজে ঘরে বসেই ভ্যাট পরিশোধ করার ব্যবস্থা থাকায় একদিকে যেমন ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি পাবে অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ীরা ভ্যাট প্রদানে উৎসাহী হবেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদে ১৬টি খাতকে প্যাকেজ ভ্যাটের আওতায় আনার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। খাতগুলো হচ্ছে-মুদি দোকান, তৈরি পোশাক বা কাপড় বিক্রেতা, কনফেকশনারি, প্রসাধন সামগ্রীর দোকান, প্লাস্টিক ও সিরামিকের গৃহস্থালি পণ্য, জুতার দোকান, হার্ডওয়্যার পণ্যের বিক্রেতা, ডেকোরেটর, মুঠোফোন, এসি, ফ্রিজ, ওভেন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিকস পণ্যের বিক্রেতা, পেইন্ট ও হার্ডওয়্যার, স্যানিটারি ও ফিটিংস, টাইলসের দোকান, ঢেউটিনের দোকান, রড ও সিমেন্ট, আসবাব, মিষ্টান্ন ভান্ডার ও রেস্তোরাঁ।
যদিও বাজেট ঘোষণার পর থেকেই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানদাররা প্যাকেজ ভ্যাট আরোপের বিরোধিতা করে আসছে। গত শনিবার বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সংবাদ সম্মেলনে জানায়, এ সিদ্ধান্তের ফলে সারা দেশের বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী ভ্যাট আদায়কারী কর্মকর্তাদের হয়রানির শিকার হবেন। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) ব্যবসা খাতে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি হতে পারে। সূত্র জানায়, নতুন সরকার প্রথম বাজেটেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাকে অস্বস্তিতে ফেলতে চাচ্ছে না। তাই প্যাকেজ ভ্যাট আরোপ থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে ভ্যাটের জাল বিস্তারে বাজেটে অন্যসব পদক্ষেপ বহাল থাকবে।
প্রসঙ্গত, ১৯৯১ সালে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে ভ্যাট ব্যবস্থার প্রবর্তন করে তৎকালীন বিএনপি সরকার। এর আওতায় ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণে ভ্যাট আদায় করা হতো, যা ব্যবসায়ী মহলে প্যাকেজ ভ্যাট নামে পরিচিতি পায়। এলাকাভেদে প্যাকেজ ভ্যাটে তারতম্য ছিল। যেমন-ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৪ হাজার টাকা, অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় ১০ হাজার টাকা, জেলা পৌর এলাকায় ৭ হাজার ২০০ টাকা এবং দেশের অন্য এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ৩ হাজার ৬০০ টাকা প্যাকেজ ভ্যাট দিতে হতো। আওয়ামী লীগ সরকার ২০১২ সালে নতুন ভ্যাট আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। যার মাধ্যমে প্যাকেজ ভ্যাট প্রথার বিলুপ্তির ঘটে। তবে ব্যবসায়ীদের তীব্র আপত্তির মুখে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে দেরি হয়। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে একটি সাধারণ আদেশের মাধ্যমে এনবিআর প্যাকেজ ভ্যাট পদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে দেয়। প্রস্তাবিত ভ্যাটের জাল বাড়াতে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলাসহ ৭ খাতে বিআইএন (ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর) বাধ্যতামূলক করা হয়। খাতগুলো হচ্ছে- ব্যাংক, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চলতি হিসাব খুলতে বা ঋণ নিতে হলে বিআইএন নিতে হবে। এছাড়া ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খুলতে, বাণিজ্য সংগঠনের সদস্য পদ গ্রহণ বা নবায়ন করতে, প্রতিষ্ঠানের নামে বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ গ্রহণ করতে এবং বিআরটিএ থেকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন নিতে চাইলে বিআইএন নিতে হবে।








