মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ প্যাকেজিং। সকালে ঘুম থেকে উঠে টুথপেস্টের টিউব থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগে ওষুধের পাতা সবই কোনো না কোনো মোড়কে বন্দি। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, এ মোড়ক বা প্যাকেজিংয়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে মানব সভ্যতার হাজার বছরের ইতিহাস ও বিবর্তনের গল্প? তরুণ গবেষক ও লেখক ফজলুল করিম হৃদয়ের নতুন বই ‘প্যাকেজিং ইতিহাস ও ডিজাইন তত্ত্ব’ আমাদের সে অজানা জগতের সন্ধান দেয়।
অদম্য প্রকাশ থেকে প্রকাশিত বইটি প্যাকেজিংকে শুধু ফেলে দেওয়া একটি মোড়ক হিসেবে নয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং নকশাগত অবজেক্ট হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ৪৫০ টাকা মূল্যের বইটি বাংলাদেশের ডিজাইনপ্রেমী, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ পাঠকদের জন্য এক মূল্যবান সম্পদ।
বইটির শুরুতে লেখক প্যাকেজিংকে মানব সভ্যতার একটি ‘নীরব প্রযুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, প্যাকেজিং ছাড়া সভ্যতার অগ্রযাত্রা সম্ভব হতো না। খাদ্য সংরক্ষণ ও এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পণ্য স্থানান্তরের প্রয়োজন থেকে প্যাকেজিংয়ের জন্ম। প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন কোনো সচেতন গ্রাফিক ডিজাইন ছিল না, তখনো মানুষ গাছের পাতা, পশুর চামড়া বা লাউয়ের খোসা ব্যবহার করতো খাবার ও পানি সংরক্ষণের জন্য। লেখক চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন কীভাবে শিকারি-সংগ্রাহক সমাজ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত প্যাকেজিংয়ের ধারণা বিবর্তিত হয়েছে।
আরও পড়ুন
বই আলোচনা / অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী: নারীবাদের দ্বন্দ্বময় সংলাপ
বইটির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে প্রাচীন সভ্যতাগুলোর প্যাকেজিং কৌশল। মেসোপটেমিয়া ও মিশরে কীভাবে মৃতদেহ বা মমি সংরক্ষণের মাধ্যমে প্যাকেজিংয়ের এক আধ্যাত্মিক রূপ দেওয়া হতো; সেটি পাঠককে চমৎকৃত করবে। মিশরের সেই মমি সংরক্ষণের ‘ফাংশনাল লেয়ারিং’ আজকের আধুনিক ফুড প্যাকেজিংয়ের স্তরীভূত সুরক্ষার আদিরূপ বলে লেখক দাবি করেছেন।
অন্যদিকে সিন্ধু সভ্যতার আলোচনায় উঠে এসেছে স্ট্যান্ডার্ডাইজেশনের ধারণা। তারা একই আকৃতির মাটির পাত্র ব্যবহার করতো, যা আধুনিক কন্টেইনার ডিজাইনের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ ছাড়া গ্রিক ও রোমান সভ্যতায় ‘অ্যাম্পোরা’ নামক পাত্রের ব্যবহার এবং ‘ফর্ম ফলো ফাংশন’ তত্ত্বের প্রয়োগ লেখক অত্যন্ত নিপুণভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
বইটিতে চীন, জাপান ও কোরিয়ার প্যাকেজিং সংস্কৃতির ওপর বিশেষ আলোকপাত করা হয়েছে। চীনে কাগজ আবিষ্কারের ফলে প্যাকেজিং কীভাবে হালকা ও তথ্যবাহী হয়ে উঠলো তার বর্ণনা রয়েছে এখানে। জাপানের ‘ফুরোশিকি’ (কাপড় দিয়ে মোড়ানো) এবং কোরিয়ার ‘বোজাগি’র মতো পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্যাকেজিংয়ের কথা লেখক এমন এক সময়ে তুলে ধরেছেন; যখন বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিংয়ের জয়গান চলছে। লেখক দেখিয়েছেন, এ প্রাচীন সংস্কৃতিগুলো শত শত বছর আগে ‘জিরো ওয়েস্ট’ বা বর্জ্যহীন ডিজাইনের চর্চা করতো।
আরও পড়ুন
বই আলোচনা / ধীরে এসো বসন্ত: অবেলায় বেজে ওঠা বেহালা
অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লব প্যাকেজিংয়ের ইতিহাসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। কায়িক শ্রমের বদলে যন্ত্রের মাধ্যমে যখন পণ্য উৎপাদন শুরু হলো; তখন প্যাকেজিং হয়ে উঠলো পণ্যের প্রধান সুরক্ষাকবচ। এ সময়েই ‘টিন ক্যান’ বা টিনের কৌটার উদ্ভাবন ঘটে, যা খাদ্য সংরক্ষণে আমূল পরিবর্তন আনে।
বিশ শতকে এসে প্যাকেজিং কেবল সুরক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে উঠলো শক্তিশালী বিপণন হাতিয়ার। বইটির নবম অধ্যায়ে লেখক আলোচনা করেছেন কীভাবে প্যাকেজিং ‘নীরব বিক্রয়কর্মী’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলো। লোগো, টাইপোগ্রাফি এবং রঙের ব্যবহার কীভাবে ক্রেতার মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করে তার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বইটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। লেখক ফিলিপ কোটলার ও মার্শাল ম্যাকলুহানের মতো তাত্ত্বিকদের উদ্ধৃতি দিয়ে দেখিয়েছেন যে, আধুনিক বাজারে ‘মিডিয়ামই হলো মেসেজ’ এবং প্যাকেজিং সে মেসেজ বা বার্তা বহন করে।
বইটির শেষদিকে লেখক বর্তমান বিশ্বের জলবায়ু সংকট ও প্যাকেজিংয়ের ভূমিকা নিয়ে আলোকপাত করেছেন। প্ল্যাস্টিক দূষণের এ যুগে তিনি আমাদের আবার ইতিহাসের সে প্রাকৃতিক উপকরণের দিকে ফিরে তাকানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ‘ক্লিন ডিজাইন’ এবং ‘সাসটেইনেবল ডিজাইন’ যে কোনো নতুন ফ্যাশন নয়। এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের চিরন্তন চর্চা ছিল; সেটি এ বই পাঠ করলে বোঝা যায়।
আরও পড়ুন
বই আলোচনা / শেষ: মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগময় উপন্যাস
‘প্যাকেজিং ইতিহাস ও ডিজাইন তত্ত্ব’ কেবল ডিজাইনারদের জন্য নয়। ফজলুল করিম হৃদয় সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় জটিল সব তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। বইটিতে প্রচুর চিত্র ও অলংকরণ ব্যবহৃত হয়েছে। এটি বিষয়বস্তুকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্যাকেজিংয়ের ইতিহাস ও তত্ত্ব নিয়ে এমন গবেষণাধর্মী কাজ বিরল। সভ্যতা ও নকশার মেলবন্ধনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে বইটি।
এসইউ








