হুমায়ূন আহমেদ বিলাস
ঢাকার মতো ব্যস্ত শহরে সময় বাঁচাতে এবং যানজট এড়াতে প্রতিদিন হাজারো মানুষ মোটরসাইকেলভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবা ব্যবহার করেন। উবার, পাঠাওসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম দ্রুত ও সহজ যাতায়াতের সুযোগ করে দিয়েছে। তবে এই সুবিধার আড়ালে একটি বড় নিরাপত্তা-ঝুঁকি দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সেটি হলো যাত্রীদের জন্য ব্যবহৃত নিম্নমানের হেলমেট।
রাইড শেয়ারিং ব্যবহারকারীদের অনেকের অভিজ্ঞতাই সুখকর নয়। তাঁদের অভিযোগ, চালকের নিজের জন্য একটি ভালো মানের হেলমেট থাকলেও যাত্রীর জন্য রাখা হয় পুরোনো, সস্তা বা নিম্নমানের হেলমেট। অনেক সময় হেলমেটের স্ট্র্যাপ নষ্ট থাকে, ভেতরের সুরক্ষা স্তর ক্ষয়ে যায় কিংবা বাইরের আবরণ দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রশ্ন হলো, যাত্রীর জীবনের মূল্য কি চালকের জীবনের চেয়ে কম?
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পাওয়া মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। একটি মানসম্মত হেলমেট আঘাতের শক্তি শোষণ করে মাথা ও মস্তিষ্ককে সুরক্ষা দেয়। ফলে প্রাণহানির ঝুঁকি অনেকটাই কমে। অন্যদিকে, নিম্নমানের হেলমেট দুর্ঘটনার সময় ভেঙে যেতে পারে এবং প্রত্যাশিত সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়া অংশই অতিরিক্ত আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই শুধু হেলমেট পরলেই হবে না, সেটি নিরাপদ ও মানসম্মত হওয়াও জরুরি।
বাংলাদেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৭ হাজার ৩৫৯ জন এবং আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ৪৭৬ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। বছরে ৩ হাজার ২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৬৭২ জন। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, মোটরসাইকেল নিরাপত্তাকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীর জন্য হেলমেট ব্যবহার আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী হেলমেট ছাড়া চলাচলের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। আইন কার্যকরের ফলে হেলমেট ব্যবহারের হারও বেড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আইনের উদ্দেশ্য কি শুধু হেলমেট পরা নিশ্চিত করা, নাকি কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা?
বাস্তবে হেলমেটের মান নিয়ে কার্যকর নজরদারি খুব একটা দেখা যায় না। ফলে অনেকেই শুধু আইন এড়ানোর জন্য যে কোনো হেলমেট ব্যবহার করছেন। সড়কে এমন অসংখ্য হেলমেট দেখা যায়, যেগুলো প্রকৃত অর্থে নিরাপত্তা-সরঞ্জাম নয়, বরং নিয়ম মানার আনুষ্ঠানিকতা। রাইড শেয়ারিং সেবায় এই সমস্যা আরও প্রকট। যাত্রীর জন্য দেওয়া হেলমেটের মান বা নিরাপত্তা নিয়ে খুব কম ক্ষেত্রেই গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) হেলমেটের জন্য নির্দিষ্ট মান নির্ধারণ করেছে এবং আমদানিকৃত হেলমেটের মান যাচাইয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বাজারে এখনও বিপুল পরিমাণ নিম্নমানের হেলমেট বিক্রি হচ্ছে। কম দামের কারণে অনেক চালক সেগুলো কিনছেন এবং যাত্রীদের ব্যবহারের জন্য রাখছেন। ফলে আইন থাকলেও কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোর। যাত্রী নিরাপত্তাকে শুধু প্রচারণার বিষয় না বানিয়ে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিটি নিবন্ধিত চালকের কাছে অনুমোদিত ও মানসম্মত দুটি হেলমেট রয়েছে কি না, তা নিয়মিত যাচাই করা উচিত। একই সঙ্গে অ্যাপভিত্তিক হেলমেট যাচাইকরণ ব্যবস্থা, যাত্রীদের অভিযোগ জানানোর সহজ সুযোগ এবং নিয়মিত পরিদর্শনের ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। যেসব চালক যাত্রীর জন্য নিরাপদ হেলমেট সরবরাহ করবেন না, তাঁদের বিরুদ্ধে সতর্কতা বা সাময়িক নিষেধাজ্ঞার মতো ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
সরকারের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বর্তমানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুধু হেলমেট আছে কি না, সেটিই দেখা হয়। ভবিষ্যতে হেলমেটের মান যাচাইয়ের বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বিএসটিআই-অনুমোদনহীন হেলমেটের উৎপাদন, আমদানি ও বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি নিরাপদ ও মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারে জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগও জোরদার করতে হবে।
তবে শুধু আইন বা শাস্তি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে। রাইড শেয়ারিং সেবা নেওয়ার আগে হেলমেটের অবস্থা দেখে নেওয়া, স্ট্র্যাপ ঠিকমতো বাঁধা আছে কি না নিশ্চিত হওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত হেলমেট ব্যবহার না করার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ নিজের নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত নিজেরই।
দুর্ঘটনা কখন ঘটবে, তা কেউ জানে না। কিন্তু দুর্ঘটনার ক্ষতি কতটা কমানো যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর। একটি মানসম্মত হেলমেট হয়তো দুর্ঘটনা ঠেকাতে পারবে না, কিন্তু একটি জীবন রক্ষা করতে পারে। তাই রাইড শেয়ারিং সেবায় নিরাপদ ও মানসম্মত হেলমেট নিশ্চিত করা আর বিলাসিতা নয়; এটি এখন সময়ের দাবি।
এইচআর/জেআইএম








