পরপারে পাড়ি জমালেন বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা, সাবেক স্পিকার, সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং দেশের অন্যতম প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার। রোববার (১২ জুলাই) সকালে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বিএনপিসহ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, সাংবিধানিক জ্ঞান এবং পরিমিত রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য তিনি ছিলেন সর্বমহলে সমাদৃত।

আরও পড়ুন

সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার মারা গেছেন

 জন্ম ও সংগ্রামী জীবন

তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে ১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন জমির উদ্দিন সরকার। তার বাবা মৌলভী মুহাম্মদ আজিজ বক্স এবং মা বেগম ফখরুন্নেছা। শৈশবে আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা জমির উদ্দিন ছোটবেলা থেকেই মেধাবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৬১ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যান। লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার অ্যাট ল ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে আইন পেশায় যোগ দেন। পরে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের একজন খ্যাতিমান আইনজীবী হিসেবে সুনাম অর্জন করেন।

jagonews24

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ফাইল ছবি

রাজনীতিতে পথচলা

১৯৪৫ সালে ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু। পরে ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) গঠন করলে তিনি এর ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হন। ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই তিনি দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ দশক ধরে তিনি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অন্যতম সদস্য ছিলেন।

নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নির্ভরতার প্রতীক

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সাংবিধানিক জ্ঞান, আইনি বিশ্লেষণ এবং পরিমিত রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে দলের ভেতরে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন। রাজনৈতিক সংকটের সময়ে তার মতামত গুরুত্ব দেওয়া হতো। বিএনপির একাধিক প্রজন্মের নেতার কাছে তিনি ছিলেন অভিভাবকসুলভ পরামর্শদাতা।

আরও পড়ুন

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিনের মৃত্যুতে বিরোধীদলীয় নেতার শোক

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি

আইন পেশায় দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে পাঁচবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে তাকে মনোনীত করেন। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক বোঝাপড়া ছিল। দলীয় সংকটের সময়ও তিনি সংগঠনের পাশে ছিলেন এবং নেতাকর্মীদের নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে গেছেন।

.jagonews24

জনসভায় বক্তব্য রাখছেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ফাইল ছবি

সংসদ সদস্য হিসেবে দীর্ঘ পথচলা

১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন দিনাজপুর-১ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জমির উদ্দিন সরকার। পরে ১৯৯১ সালে ঢাকা-৯ আসন থেকে সংসদ সদস্য হন। ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ ও সপ্তম এবং ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পঞ্চগড়-১ আসন থেকে নির্বাচিত হন তিনি। ২০০৯ সালে বগুড়া-৬ আসনের উপ-নির্বাচনেও বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব

রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের মন্ত্রিসভায় ১৯৮১ সালের ২৭ নভেম্বর থেকে ১৯৮২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রথমে ভূমি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় শিক্ষা খাতে বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগে ভূমিকা রাখেন। পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৯৬ সালের স্বল্পকালীন বিএনপি সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা-সংক্রান্ত বিল প্রণয়নে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়েছে।

jagonews24

প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ফাইল ছবি

মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালে হাইকোর্টের যে আইনজীবী দলটি স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল, তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম সদস্য।

স্পিকার ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি

২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন এবং ২০০৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালে রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী পদত্যাগ করলে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার হিসেবে ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। স্পিকার হিসেবে সংসদ পরিচালনায় বিধি-বিধানের প্রতি তার কঠোর আনুগত্যের কথা বিভিন্ন সময় আলোচিত হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও সংসদীয় কার্যক্রম সচল রাখতে তিনি সচেষ্ট ছিলেন বলে অনেকে মনে করেন।

 লেখক ও গবেষক

রাজনীতি ও আইনচর্চার পাশাপাশি লেখালেখিতেও আগ্রহী ছিলেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। আন্তর্জাতিক আইন, সমুদ্র আইন, জাতিসংঘ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠন নিয়ে তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তার বইগুলো গবেষক ও শিক্ষার্থীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র হিসেবে বিবেচিত হয়।

শিক্ষা বিস্তারে অবদান

নিজ জেলা পঞ্চগড়ে শিক্ষা বিস্তারে বিশেষ ভূমিকা রাখেন তিনি। তার প্রতিষ্ঠিত ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার কলেজিয়েট ইনস্টিটিউট উত্তরাঞ্চলের একটি পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এছাড়া সংসদ সদস্য থাকাকালে এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেছেন তিনি। স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য, সাহায্যের জন্য তার কাছে গেলে কাউকে খালি হাতে ফিরতে হতো না।

আরও পড়ুন

জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে সোমবার দেশব্যাপী শোক পালন করবে বিএনপি

যাদের রেখে গেলেন

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের স্ত্রী নূর আখতার ২০২৩ সালে মারা যান। এক মেয়ে নিলুফার জমির এবং দুই ছেলে নওশাদ জমির ও নওফেল জমিরকে রেখে গেছেন। তার বড় ছেলে নওশাদ জমির বর্তমানে পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য।

jagonews24

ছেলে নওশাদ জমিরের সঙ্গে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ফাইল ছবি

রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে দীর্ঘ সময় থাকলেও ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন নীরব, সংযত ও প্রচারবিমুখ। রাজনৈতিক সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং নিজ জেলা পঞ্চগড়ের মানুষের কাছে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন একজন সজ্জন, প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে।

কেএইচ/এসএনআর/ এমএফএ