‘এই জুলাই যোদ্ধাদের রক্তের গালিচার উপর পা দিয়ে তারা এসেছে। তারা এই সংসদে বসে আছে। তারা যদি কখনো জুলাইয়ের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করেন–তবে বেইমানদের পরিণতি কী হয় সেটা তো আমাদের হাদিসেও স্পষ্ট উল্লেখ আছে। স্বৈরাচারের পতন, ফ্যাসিস্টের পতন যে রকম হয় যদি কেউ বেইমানি করে বেইমানির পতনও হয়তো তেমনই হবে। আল্লাহ যেন এটা না দেখায়!’কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার জয়কুমর গ্রামের জুলাই শহীদ স্কাউটার রাজিব উল করিম সরকার রাব্বীর মা জান্নাতুল ফেরদৌস কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই বর্তমান সরকারের প্রতি তার আকুতি ও হুঁশিয়ারি ব্যক্ত করেন।বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় গত ৫ আগস্ট লালমনিরহাটে আওয়ামী লীগ নেতা সুমন খানের বাসভবন থেকে রাজিবের অগ্নিদগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মেধাবী রাজিব লালমনিরহাট সরকারি কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। সাতটি পরীক্ষায় অংশ নিলেও শেষ পর্যন্ত দেশ স্বাধীনের নেশায় রাজপথে নেমে আর ঘরে ফেরা হয়নি তার।রাজিবের বাবা রেজাউল করিম সরকার লালমনিরহাটের বেগম কামরুন্নেছা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক। মা জান্নাতুল ফেরদৌস কালীগঞ্জ উপজেলার সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিও)। তিন ছেলের মধ্যে সবার বড় রাজিবকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল তাদের।স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে রাজিবের মা বলেন, ‘৫ আগস্ট আন্দোলনে যাওয়ার পর রাত ১১টা থেকে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ছোট ছেলের কথামতো জায়নামাজে বসে দোয়া পড়ছিলাম। রাত দেড়টার দিকে দেবর ফোন করে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তখনই সব বুঝতে পারি। লাশ যখন পাই, দেখি ধোঁয়ায় আমার হিরের টুকরো ছেলেটা কালো হয়ে গেছে। কিন্তু ওর দাড়ি-চুল একটুও পোড়েনি। আল্লাহ ওকে শান্তিতে রেখেছেন।’রাজিব শুধু পড়াশোনায় নয়, স্কাউটিংয়েও ছিলেন অনন্য। অর্জন করেছিলেন মর্যাদাপূর্ণ ‘প্রেসিডেন্ট’স স্কাউট অ্যাওয়ার্ড’। তার স্বপ্ন ছিল প্রকৌশলী হওয়ার। শহীদ হওয়ার সাত দিন আগেও মাকে বলেছিলেন, নিজের বাড়ির সুন্দর একটি নকশা করে দেবেন।ছেলের স্মৃতি হাতড়ে বাবা রেজাউল করিম বলেন, ‘আমার বাবা একজন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। অথচ স্বাধীন দেশে আমাদের আবার স্বাধীনতার যুদ্ধ করতে হলো। রাজিব শুধু আমার ছেলেই ছিল না, ছিল বন্ধুর মতো। ওকে ছাড়া আমি একা হয়ে গেলাম।’পরিবারের দাবি, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ নেতার বাসায় আটকে পড়া বন্ধুদের উদ্ধার করতে গিয়ে সেখানে আটকা পড়েন রাজিব। পরে দুর্বৃত্তরা বাড়িতে আগুন দিলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছে পরিবারটি।রাজারহাট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আল মিজান বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে কুড়িগ্রামের অনেকে আহত হলেও রাজিবই এই অঞ্চলের একমাত্র শহীদ। প্রকৃত জুলাই যোদ্ধারা যেন যথাযথ সম্মান ও রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা পান, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।’/