হিমাগারের অতিরিক্ত ভাড়া কমানোর দাবিতে গায়ে সাদা কাফন পরে গণঅনশন কর্মসূচি পালন করেছেন রংপুরের আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা। আজ বুধবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এ কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা। পরে জেলা প্রশাসকের আশ্বাসে কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়।

রংপুর জেলা আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতি এবং রংপুর বিভাগীয় আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে এসে আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা অংশ নেন। এ সময় তারা হিমাগার মালিকদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ তুলে দ্রুত ভাড়া পুনর্নির্ধারণের দাবি জানান।

অনশনরত আলুচাষি আনিছুল ইসলাম বলেন, ‘সার, বীজ, কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ পড়েছে প্রায় ১৬ টাকা। হিমাগারে সংরক্ষণ ব্যয়সহ সেই খরচ দাঁড়ায় ২৫ থেকে ২৬ টাকা। অথচ বর্তমানে বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে ১৪ থেকে ১৫ টাকায়। আমরা চাষ করে লোকসান করছি, আর হিমাগার মালিকরা বসে থেকেই কোটি কোটি টাকা আয় করছেন। সরকার দ্রুত হিমাগার ভাড়া কমিয়ে কৃষকদের বাঁচানোর উদ্যোগ নিক।’

হাজীরহাট এলাকার আলুচাষি শাকিল মাহমুদ বলেন, ‘রাজশাহীতে কেজিপ্রতি হিমাগার ভাড়া ৬ টাকা হলেও রংপুরে নেওয়া হচ্ছে ৭ টাকা। আমরা চাই সর্বোচ্চ ৫ টাকা কেজি ভাড়া নির্ধারণ করা হোক। গত বছর আলুতে লোকসান হয়েছে, এবারও একই পরিস্থিতি হলে আগামী মৌসুমে অনেক কৃষক আলু চাষ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন।’

রংপুর জেলা আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি তৈয়বুর রহমান বলেন, ‘দুই বছর আগেও প্রতি বস্তা আলু সংরক্ষণের ভাড়া ছিল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। চলতি মৌসুমে তা বাড়িয়ে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা করা হয়েছে। একদিকে বাজারে আলুর দাম কম, অন্যদিকে সংরক্ষণ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সরকারের প্রতি অনুরোধ, হিমাগারের ভাড়া কমিয়ে আলু রপ্তানি উদ্যোগ নেওয়া এবং লোকসান হওয়া আলু চাষিদের তালিকা করে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হোক।’

সমিতির সহ-সভাপতি তসলিম উদ্দিন বলেন, ‘দেশের অন্যান্য আলু উৎপাদনকারী অঞ্চলের তুলনায় রংপুরে প্রতি বস্তায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এই বৈষম্য দূর করে দেশের অন্যান্য জেলার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে। প্রয়োজনে জেলায় জেলায় কমিটি করে ভাড়া নির্ধারণ করা হউক। অন্যথায় আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’

বিক্ষোভকারীরা জানান, চলতি বছর আলুর ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা এমনিতেই লোকসানের মুখে রয়েছেন। এর ওপর অতিরিক্ত হিমাগার ভাড়া তাঁদের সংকট আরও গভীর করেছে। হিমাগার মালিকদের সিন্ডিকেট ভেঙে প্রশাসনের মাধ্যমে যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণের দাবি জানান তাঁরা।

রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত প্রতি কেজি আলুর হিমাগার ভাড়া ৬ টাকা ৭৫ পয়সা। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের অনুরোধ ছিল এটা ৫ টাকার মধ্যে রাখা। পরে তাঁরা ৬ টাকা পর্যন্ত সহনীয় পর্যায়ে বলে জানিয়েছিলেন। আমরা সেই অনুযায়ী কৃষক, ব্যবসায়ী, হিমাগার মালিকদের সঙ্গে মিটিং করেছি। তারপর আমাদের একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে ও কৃষি বিপণন দপ্তরে পাঠিয়েছিলাম।’

তিনি আরও বলেন, ‘কৃষি বিপণন দপ্তর চাষী এবং ব্যবসায়ীদের চাহিদার ভিত্তিতে একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছে। যেই কমিটি আগামী ১৫ দিনের মধ্যে হিমাগারের যৌক্তিক একটি ভাড়া সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়ে ও কৃষি বিপণন দপ্তরে পাঠানোর নির্দেশনা রয়েছে। আমরা সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। ১৫ দিন নয়; আমরা এক সপ্তাহের মধ্যেই সুপারিশটা প্রেরণ করতে চাই। আশা করি আমরা সংবেদনশীল একটি ফলাফল পাবো।’

এর আগে, গত ১৭ জুন নগরীর মডার্ন মোড় এলাকায় তুলা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সামনে ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করেন আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা। সে সময় তারা মহাসড়কে আলু ফেলে বিক্ষোভ করেন। প্রায় এক ঘণ্টার অবরোধে রংপুর বিভাগের সাত জেলার সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় এবং উভয় পাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে।