রপ্তানি প্রণোদনা কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ সুদের ঋণ ও কাঁচামালের ব্যয় বাড়ার কারণে দেশের ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্প কঠিন সময় পার করছে বলে জানিয়েছেন হাসেম ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হাসেম।

তার মতে, নীতিগত সহায়তা ও প্রতিযোগিতামূলক প্রণোদনা না থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দুর্বল হবে।

শনিবার (২৭ জুন) সকালে জাগো নিউজের সম্পাদক কে. এম. জিয়াউল হকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন তিনি।

‘ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনায় মো. আবুল হাসেম বলেন, ‘বাংলাদেশকে কৃষিভিত্তিক দেশ বলা হলেও কৃষিখাত এখনো কাঙ্ক্ষিত সহায়তা পাচ্ছে না। বিশেষ করে আমের জুস উৎপাদন ও রপ্তানিতে ব্যয় এত বেশি যে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’

আরও পড়ুন

ফল উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ সারিতে, প্রক্রিয়াজাতকরণে নেই গতি

আগে রপ্তানিতে ২০ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হলেও এখন তা কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে জানিয়ে আবুল হাসেম বলেন, ‘একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় পাকিস্তান ও ভারতের তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া দেশের চিনির দামও ভারতের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। ম্যাংগো পাল্প ছাড়া প্রায় সব কাঁচামাল আমদানি করায় উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।’

আগে রপ্তানি প্রণোদনার মাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ সমন্বয় করা যেত। কিন্তু প্রণোদনা কমে যাওয়ায় শুধু জুস নয়, প্রায় সব ধরনের কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান আবুল হাসেম।

তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ করলে এসব প্রণোদনা পুরোপুরি বন্ধ হলে রপ্তানি আরও কমে যেতে পারে।’

আমরা সব প্রতিকূলতার মধ্যেও রপ্তানি চালিয়ে যেতে চাই। তবে এজন্য সরকারের কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন বলে জানান আবুল হাসেম।

নিজের আমবাগানের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে হাসেম বলেন, ‘বর্তমানে আম উৎপাদনের যে খরচ, বিক্রির মাধ্যমে তা অনেক ক্ষেত্রেই উঠে আসে না। কৃষক ও কৃষিপ্রক্রিয়াজাত উদ্যোক্তারা লাভ করতে না পারলে এ খাত টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।’

যুক্তরাষ্ট্রে মেক্সিকোর আম ব্যাপকভাবে বিক্রি হলেও বাংলাদেশের আম স্বাদে অনেক উন্নত জানিয়ে এই শিল্প উদ্যোক্তা বলেন, ‘উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যয় বেশি হওয়ায় সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে বিদেশে আম রপ্তানি করেও ব্যবসায়ীরা প্রত্যাশিত লাভ করতে পারছেন না।’

সরকারকে উদ্যোক্তাদের লাভজনক পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ভারতে ফলচাষি ও কৃষিপ্রক্রিয়াজাত শিল্পকে নানা ধরনের প্রণোদনা এবং সহায়তা দেওয়া হয়, ফলে তাদের উৎপাদন ব্যয় কম থাকে। বাংলাদেশেও একই ধরনের নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।’

আরও পড়ুন

ফলের উৎপাদন বেড়ে কমেছে আমদানি, স্থবির রপ্তানি

কৃষিপণ্যের নিরাপত্তা ও রপ্তানিযোগ্য মান নিশ্চিত করতে কৃষকদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন আবুল হাসেম।

তিনি বলেন, ‘সব দেশেই কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। কিন্তু অনেক কৃষক সঠিক মাত্রা সম্পর্কে না জানায় অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করেন, যা একদিকে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, অন্যদিকে রপ্তানির ক্ষেত্রেও বড় বাধা সৃষ্টি করে।’

উন্নত জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে বড় আকারের বাদাম উৎপাদন করা সম্ভব, যার আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো চাহিদা রয়েছে। পাশাপাশি কাজু ও অন্য বাদাম উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাত শিল্পেরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে,’ বলেন হাসেম।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য সহজ অর্থায়নের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশের শিল্পায়ন এগিয়ে নিতে এসএমই খাত শক্তিশালী করতে হবে। কিন্তু বর্তমানে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে কোনো শিল্প প্রতিযোগিতামূলকভাবে টিকে থাকা কঠিন। প্রতিবেশী দেশগুলোতে সুদের হার কম ও উদ্যোক্তাদের কর সুবিধাও দেওয়া হয়।’

বাংলাদেশে সুদের হার এত বেশি, আবার কর সুবিধাও নেই। এ অবস্থায় নতুন শিল্প কীভাবে গড়ে উঠবে, প্রশ্ন রাখেন মো. হাসেম।

রপ্তানি প্রণোদনা কমায় চাপে আছে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পজাগো নিউজ আয়োজিত ‘ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত অতিথিরা, ছবি: জাগো নিউজ

গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের সাবেক উপাচার্য, গবেষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী, বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও ফল বিশেষজ্ঞ ড. মো. মেহেদী মাসুদ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান, বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক (খাদ্য ও কৃষি) এনামুল হক, প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইলিয়াছ মৃধা, বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ইকতাদুল হক, ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, কাজু অ্যান্ড কফি অ্যাগ্রোর নির্বাহী পরিচালক মো. মাহাতাব আলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি উদ্যোক্তা ইসমাইল খান শামীম ও নওগাঁর কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা।

এসএম/এএসএ/এমএফএ