রাষ্ট্রীয় কোষাগারের টাকায় বিনিয়োগ পাইয়ে দিয়ে সেই কোম্পানিরই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বনে গেছেন স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেডের (এসবিএল) সদ্য সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামি আহমেদ। সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ বা নতুন উদ্যোগ দেখিয়ে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ‘হিসাব টেকনোলজিস (বর্তমানে ভারবেক্স)’ কোম্পানিতে দুই কোটি টাকা বিনিয়োগ চুক্তি করেন তিনি। অথচ জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ বাতিল হলেও সামি নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট হিসাব টেকনোলজিসকে তড়িঘড়ি করে এক কোটি টাকা ছাড় করে দেন। এছাড়াও নিয়ম ভেঙে রাজনৈতিক বিবেচনায় দিনের পর দিন তহবিল বণ্টনের অভিযোগ রয়েছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের আশীর্বাদপুষ্ট এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে।
ছাত্রজনতার আন্দোলনের মাঝেই সামি ‘স্টার্টআপ সামিট’ আয়োজনের উদ্যোগও নিয়েছিলেন। সাবেক প্রতিমন্ত্রী পলকের ভাবমূর্তি বাড়ানোই ছিল এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর তাকে এসবিএলের এমডি পদ থেকে অপসারণ করা হয়। কিন্তু আগে থেকেই পাকাপোক্ত করা সমঝোতার সুতো ধরে তিনি এখন সরকারি অর্থায়নপুষ্ট ‘হিসাব টেকনোলজিস’-এর শীর্ষ পদে বসেছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামির পদায়ন স্পষ্টতই কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট (স্বার্থের সংঘাত) এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির চরম বহিঃপ্রকাশ। স্টার্টআপ বাংলাদেশের বিনিয়োগ প্রক্রিয়া, অর্থ ছাড়ের সিদ্ধান্ত, হিসাব টেকনোলজিসের প্রকৃত ব্যবসায়িক সক্ষমতা, কোম্পানির নাম বদলের রহস্য এবং সামির ভূমিকা প্রতিটি বিষয়েই স্বচ্ছ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, সরকারি শীর্ষ পদে থেকে রাষ্ট্রীয় তহবিল বণ্টনে প্রভাব খাঁটিয়ে পরবর্তীতে সেই অর্থায়নপুষ্ট কোম্পানিতে লাভজনক পদে যোগ দেওয়া স্পষ্ট দুর্নীতির শামিল। এর পেছনে গোপন বোঝাপড়া ছিল কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে। উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে রাষ্ট্রীয় অর্থ তসরুফে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, স্টার্টআপ বাংলাদেশের এমডি হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে হিসাব টেকনোলজিসের বিনিয়োগ অনুমোদন ও অর্থ ছাড় প্রক্রিয়ায় প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন সামি। পরে তিনি ওই কোম্পানিতেই সিইও হিসাবে যোগ দেন। ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হিসাব টেকনোলজিস বিভিন্ন সময় নিজেদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসাবে উপস্থাপন করলেও প্রকৃত সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নিয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটির প্রচারিত অনেক সেবাই আদতে এআইভিত্তিক ছিল না; বরং প্রচলিত আইভিআর ও স্বয়ংক্রিয় কল সেবাকে এআই হিসাবে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হিসাব টেকনোলজিস পরবর্তীতে নিজেদের নাম পরিবর্তন করে ‘ভারবেক্স’ নাম ধারণ করে। কোম্পানির বর্তমান ও সাবেক একাধিক কর্মীর দাবি, নেতিবাচক ভাবমূর্তি থেকে বেরিয়ে আসতেই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জানা যায়, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে এসবিএলের এমডি হিসাবে নিয়োগ পান সামি আহমেদ। সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী পলকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে এর আগেও একাধিক লোভনীয় পদ বাগিয়ে নেন তিনি। সূত্র জানায়, এসবিএল রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হলেও বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত একাই নিতেন সামি। এমনকি বিনিয়োগে বিবেচিত হতো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। জুলাই আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় ‘টেন মিনিট স্কুল’-এর পাঁচ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব বাতিল করেন। একইভাবে এডটেক প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’-র প্রস্তাবও চূড়ান্ত পর্যায়ে বাতিল করেন তিনি। রাজনৈতিক বিবেচনায় বিনিয়োগ করারও নজির রয়েছে সামি আহমেদের। আওয়ামীপন্থি সাবেক মেয়র আনিসুল হকের ছেলে নাভিদুল হকের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘বঙ্গ’তে পাঁচ কোটি টাকার বিনিয়োগ করে এসবিএল। এমনকি বঙ্গ আয়োজিত ‘শার্ক ট্যাংক’ অনুষ্ঠানে এসবিএলের পৃষ্ঠপোষকতাও দেন সামি।
রিয়েলিটি শো শার্ক ট্যাংকের প্রথম সিজনে অন্তত ১৪টি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের ঘোষণা দেন সামি। প্রায় ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা শেয়ারের বিনিময়ে বিনিয়োগ, সুদের বিনিময়ে লোন এবং অনুদান হিসাবে ঘোষণা দেন সামি। অথচ এসব অর্থ জনগণের টাকায় গঠিত স্টার্টআপ বাংলাদেশের। এ বিষয়ে হিসাব টেকনোলজিসের সহপ্রতিষ্ঠাতা মিও আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি এখন কথা বলতে পারছি না। আমাদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলুন।’ পরে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান জোবায়ের আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। তার হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও কোনো জবাব দেননি।
অভিযোগের ব্যাপারে সামি আহমেদের সঙ্গে মুঠোফোনে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠালেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
স্টার্টআপ বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল হাই যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখব এবং সংশ্লিষ্ট অন্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও কথা বলব। সামি আহমেদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো অনিয়ম বা অস্বাভাবিকতার প্রমাণ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।








