আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, রাত জাগা, মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘসময় কাটানো এবং অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে রাতের বেলা অতিরিক্ত খাওয়া এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।
আমাদের শরীরের একটি জৈবিক ঘড়ি (Biological Clock) রয়েছে, যা কখন খাব, কখন ঘুমাব এবং কীভাবে শক্তি ব্যবহার করব-এসব নিয়ন্ত্রণ করে। রাতে শরীর বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত থাকে। এ সময় অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করলে সেই ক্যালোরি সঠিকভাবে ব্যবহার না হয়ে চর্বি হিসাবে জমা হতে পারে। তাই একই পরিমাণ খাবার দিনে খাওয়ার তুলনায় গভীর রাতে খেলে ওজন বাড়ার ঝুঁকি বেশি।
অন্যদিকে, পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী দুটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন-ঘ্রেলিন (Ghrelin) ও লেপ্টিন (Leptin)-এর ভারসাম্য নষ্ট হয়। ঘ্রেলিন ক্ষুধা বাড়ায়, আর লেপ্টিন পেট ভরার অনুভূতি দেয়। কম ঘুম হলে ঘ্রেলিন বেড়ে যায় এবং লেপ্টিন কমে যায়। ফলে বারবার ক্ষুধা লাগে, বিশেষ করে মিষ্টি, ভাজাপোড়া ও উচ্চ-ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে। একইসঙ্গে ইনসুলিনের কার্যকারিতাও কমে যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
যারা নিয়মিত রাতে দেরিতে খাবার খান বা পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টার কম ঘুমান, তাদের মধ্যে স্থূলতা, উচ্চরক্তচাপ, ফ্যাটি লিভার এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বেশি। শিশু-কিশোর এবং তরুণদের মধ্যেও এ সমস্যা দ্রুত বাড়ছে।
সুস্থ থাকার জন্য কয়েকটি সহজ অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে রাতের খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন এবং ঘুমানোর অন্তত ২-৩ ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করুন। রাত জেগে অপ্রয়োজনীয় নাশতা খাওয়ার অভ্যাস পরিহার করুন। প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম নিশ্চিত করুন। শোওয়ার এক ঘণ্টা আগে মোবাইল, ট্যাব বা কম্পিউটারের ব্যবহার কমিয়ে দিন। নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম এবং সুষম খাদ্য গ্রহণও ওজন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মনে রাখতে হবে, স্থূলতা শুধু অতিরিক্ত খাওয়ার ফল নয়; কখন খাচ্ছি এবং কতটা ঘুমাচ্ছি-এ দুটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই স্থূলতা ও ডায়াবেটিস প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর উপায়। ছোট ছোট ইতিবাচক পরিবর্তন আজই শুরু করলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।








