বাংলাদেশে অভিবাসন নিয়ে আমরা সাধারণত দুই ভাষায় কথা বলি। একদিকে আছে গৌরবের ভাষা-প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির প্রাণ, তারা বৈদেশিক মুদ্রা আনে, সংকটে দেশকে বাঁচায়, রেমিট্যান্স দিয়ে রিজার্ভ ধরে রাখে। অন্যদিকে আছে দুঃখের ভাষা-দালালের খপ্পর, জমি বিক্রি, ঋণ, প্রতারণা, পাসপোর্ট আটকে রাখা, বেতন না পাওয়া, জেলে যাওয়া, লাশ হয়ে ফিরে আসা। কিন্তু এ দুই ভাষার মাঝখানে যে সবচেয়ে জরুরি ভাষাটি অনুপস্থিত, তা হলো নীতির ভাষা। বাংলাদেশ কি অভিবাসনকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন, শ্রমবাজার, কূটনীতি, মানবাধিকার ও জ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনার অংশ হিসাবে দেখছে, নাকি এখনো এটিকে মূলত ‘মানুষ পাঠানো’ ও ‘ডলার আনা’র প্রশাসনিক ব্যবসা হিসাবে চলছে?
এটি আর শুধু একাডেমিক প্রশ্ন নয়। এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদার প্রশ্ন। বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসন একদিকে বিশাল সম্ভাবনার ক্ষেত্র, অন্যদিকে গভীর সংকটের জায়গা। বাংলাদেশের অভিবাসন সংকটের মূল কথা হলো-আমরা মানুষ পাঠাচ্ছি, কিন্তু শ্রমবাজার তৈরি করছি না; আমরা রেমিট্যান্স পাচ্ছি, কিন্তু শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষা করছি না; আমরা বিদেশে কর্মসংস্থানের সংখ্যা নিয়ে গর্ব করছি, কিন্তু সেই কর্মসংস্থানের গুণগত মান, বেতন, দক্ষতা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে যথেষ্ট পরিকল্পনা করছি না। শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার আগের প্রতারণা, বিদেশে থাকার সময়ের সুরক্ষা এবং ফিরে আসার পর পুনর্বাসন-এ তিনটি স্তরকে একসঙ্গে না দেখলে অভিবাসন কখনো উন্নয়ন হয় না, সেটি দরিদ্র মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ রপ্তানি হয়ে থাকে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো উচ্চ অভিবাসন ব্যয়। একজন শ্রমিক মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা অন্য কোনো দেশে যেতে গিয়ে প্রায়ই এমন অঙ্কের টাকা দেন, যা তার সম্ভাব্য আয়ের তুলনায় অস্বাভাবিক। অনেক সময় জমি বিক্রি, এনজিও ঋণ, সুদের টাকা, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার-এসব দিয়ে অভিবাসন ব্যয় জোগাড় করতে হয়। ফলে শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার আগেই ঋণের জালে বন্দি হয়ে যান। চাকরি ভালো না হলেও তিনি প্রতিবাদ করতে পারেন না, কারণ প্রথম দুই-তিন বছর শুধু ঋণ শোধ করতেই চলে যায়। এটি ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়, এটি কাঠামোগত শোষণব্যবস্থা।
দ্বিতীয় সমস্যা হলো দালালনির্ভরতা। বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্র আছে, মন্ত্রণালয় আছে, বিএমইটি আছে, বোয়েসেল আছে, রিক্রুটিং এজেন্সি আছে; কিন্তু গ্রামের একজন সম্ভাব্য অভিবাসীর কাছে সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি প্রায়ই স্থানীয় দালাল। এ দালালই বলে কোন দেশে কাজ আছে, কত টাকা লাগবে, বেতন কত, ভিসা কবে আসবে, মেডিকেল কোথায় করতে হবে। অনেক সময় শ্রমিক জানেনই না তিনি কাগজে কোন চাকরির জন্য যাচ্ছেন, বাস্তবে কী কাজ করবেন, তার নিয়োগকর্তা কে, চুক্তি কী, অধিকার কী। এখানে রাষ্ট্রের তথ্যব্যবস্থা দুর্বল, আর দালালের তথ্যব্যবস্থা শক্তিশালী। এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, রাষ্ট্রীয় উপস্থিতির ব্যর্থতা।
তৃতীয় সমস্যা হলো বাজার সম্পর্কে অজ্ঞতা। বাংলাদেশ এখনো কমদক্ষ ও নিম্ন মজুরির শ্রমবাজারের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। কোন দেশে কোন খাতে শ্রমঘাটতি তৈরি হচ্ছে, কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে, কোন দেশে শ্রম আইন বদলাচ্ছে, কোথায় স্বয়ংক্রিয়ীকরণ কর্মদক্ষ শ্রমের চাহিদা কমাচ্ছে, কোথায় প্রবীণ পরিচর্যা, নির্মাণ প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য সহায়তা, কৃষি প্রযুক্তি বা ডিজিটাল সেবায় সুযোগ তৈরি হচ্ছে-এসব বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা ও পূর্বাভাস দুর্বল।
চতুর্থ সমস্যা হলো দক্ষতা উন্নয়নের নামে সনদ উৎপাদন। প্রশিক্ষণকেন্দ্র আছে, কোর্স আছে, সনদ আছে; কিন্তু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তি বিদেশি নিয়োগকর্তার প্রয়োজন মেটাতে পারছেন কি না, সেটিই আসল প্রশ্ন। ভাষা, কাজের সংস্কৃতি, শ্রম আইন, নিরাপত্তা মানদণ্ড, যন্ত্রপাতি পরিচালনা, ডিজিটাল সাক্ষরতা, আর্থিক সাক্ষরতা, অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা-এসব যদি প্রশিক্ষণের অংশ না হয়, তাহলে সেটি বাস্তব প্রস্তুতি নয়; কাগজের প্রস্তুতি।
পঞ্চম সমস্যা হলো অভিবাসনকে পররাষ্ট্রনীতির প্রান্তিক বিষয় হিসাবে দেখা। শ্রম অভিবাসন বাংলাদেশের অন্যতম বড় কূটনৈতিক সম্পদ। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপে বাংলাদেশি শ্রমিকদের উপস্থিতি আমাদের দরকষাকষির ক্ষমতা তৈরি করতে পারে। কিন্তু শ্রমিকের অধিকার, সামাজিক সুরক্ষার দেশান্তরযোগ্যতা, মজুরি সুরক্ষা, আইনি সহায়তা, আশ্রয়কেন্দ্র, বিমা, দক্ষতার স্বীকৃতি ও নৈতিক নিয়োগ বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় আমরা কতটা শক্তিশালী? অনেক সময় শ্রমবাজার হারানোর ভয় শ্রমিকের অধিকার দাবিকে দুর্বল করে।
ষষ্ঠ সমস্যা হলো তথ্যের দুর্বলতা। কতজন মানুষ কোথায় কাজ করছেন, কোন খাতে, কী বেতনে, কী ভিসায়, কতজন ফিরে আসছেন, কতজন প্রতারিত হচ্ছেন, কতজন কারাগারে, কতজন মৃত, কতজন অসুস্থ-এসব বিষয়ে সমন্বিত, নির্ভরযোগ্য, তাৎক্ষণিক হালনাগাদযোগ্য তথ্যভান্ডার প্রয়োজন। শুধু কতজন গেলেন এবং কত রেমিট্যান্স এলো-এ দুই তথ্য দিয়ে অভিবাসন বোঝা যায় না। অভিবাসন একটি জীবনচক্র : প্রস্থানপূর্ব প্রস্তুতি, নিয়োগ, যাত্রা, কর্মসংস্থান, সুরক্ষা, প্রবাসী আয় প্রেরণ, প্রত্যাবর্তন ও পুনঃকীকরণ। প্রতিটি ধাপে তথ্য দরকার।
বাংলাদেশের অভিবাসন নীতিতে তাই প্রথম বড় পরিবর্তন হওয়া উচিত সংখ্যা থেকে গুণগত মানে যাওয়া। কতজন গেলেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তারা কী কাজে গেলেন, কত বেতনে গেলেন, কত টাকা খরচ করে গেলেন, কত দিনে ঋণ শোধ করলেন, কতজন চুক্তি অনুযায়ী কাজ পেলেন, কতজন অভিযোগ করলেন, কতজন ক্ষতিপূরণ পেলেন।
দ্বিতীয় পরিবর্তন হওয়া উচিত নিয়োগ সুশাসনে। রিক্রুটিং এজেন্সি দরকার, কিন্তু তাদের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ আরও দরকার। প্রতিটি এজেন্সির প্রকাশ্য কর্মদক্ষতার নথি থাকা উচিত : কতজন পাঠিয়েছে, কত অভিযোগ, কত নিষ্পত্তি, কত ক্ষতিপূরণ, কত ভিসা জালিয়াতি, কত কাজের অমিল। যে এজেন্সির বিরুদ্ধে পুনরাবৃত্ত অভিযোগ আছে, তাকে শুধু জরিমানা নয়, বাজার থেকে সরানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
তৃতীয় পরিবর্তন হওয়া উচিত অভিবাসন ব্যয়ের স্বচ্ছতায়। কোন দেশে কোন চাকরির জন্য মোট খরচ কত, সরকারি অনুমোদিত ফি কত, নিয়োগকর্তা কী দেবে, শ্রমিক কী দেবে-এসব তথ্য ইউনিয়ন পর্যায়ে, অনলাইনে, মোবাইল অ্যাপে, ব্যাংকে, প্রশিক্ষণকেন্দ্রে ও বিমানবন্দরে প্রকাশ করতে হবে। সব লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে আনতে হবে।
চতুর্থ পরিবর্তন হওয়া উচিত দক্ষতা-কূটনীতিতে। বাংলাদেশকে শুধু নির্মাণ সহকারী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গৃহকর্মী বা কম মজুরির শ্রমিক পাঠানোর জায়গা থেকে বের হতে হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত মধ্যদক্ষ ও দক্ষ অভিবাসন: ধাতুঝালাই, বৈদ্যুতিক কাজ, পাইপ মেরামত, পরিচর্যা, নার্সিং সহায়তা, প্রবীণ পরিচর্যা, পরিবহণ ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক সেবা, আতিথেয়তা খাত, পরিবেশবান্ধব নির্মাণ, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, ভাষাভিত্তিক সেবা ও তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তা। জাপানে যেতে চাইলে জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতি; কোরিয়ায় যেতে চাইলে শিল্পক্ষেত্রের শৃঙ্খলা; জার্মানিতে যেতে চাইলে যোগ্যতার স্বীকৃতি; মধ্যপ্রাচ্যে যেতে চাইলে নিরাপত্তা ও চুক্তি-সাক্ষরতা-এসব বাস্তব প্রস্তুতি দরকার।
পঞ্চম পরিবর্তন হওয়া উচিত দূতাবাস ও শ্রম উইং শক্তিশালীকরণে। বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকের কাছে দূতাবাস অনেক সময় দূরের প্রতিষ্ঠান। প্রতিটি বড় শ্রমবাজারে ২৪ ঘণ্টার শ্রম সহায়তা হটলাইন, আশ্রয়কেন্দ্র, আইনি সহায়তার রেফারাল, মজুরি অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, নিয়োগকর্তার কালো তালিকা এবং চলমান কনস্যুলার সেবা থাকা উচিত। দূতাবাসের কর্মদক্ষতা শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যে নয়; শ্রমিক সুরক্ষার সূচক দিয়েও মূল্যায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশের অভিবাসী শ্রমিকরা দয়া চান না। তারা ফুলেল ভাষণ চান না; তারা সঠিক তথ্য, কম খরচ, নিরাপদ চাকরি, আইনি সুরক্ষা, দূতাবাসের সহায়তা, দেশে ফিরে সম্মানজনক পুনর্বাসন চান। কারণ শেষ পর্যন্ত অভিবাসন শুধু বিদেশে যাওয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের নাগরিকের প্রতি দায়িত্বের পরীক্ষা। বাংলাদেশ সেই পরীক্ষায় এখনো পুরোপুরি উত্তীর্ণ হয়নি। কিন্তু চাইলে পারে। আর এখনই সময়, রেমিট্যান্সের গৌরবের আড়াল সরিয়ে প্রবাসী অর্থনৈতিক নাগরিকের মর্যাদাকে নীতির কেন্দ্রে বসানোর।
ড. একেএম আহসান উল্লাহ : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা এবং অভিবাসন, ইউনিভার্সিটি অব ব্রুনেই দারুসসালাম, ব্রুনেই








