রিয়াল মাদ্রিদের সেই সোনালি দিনগুলোর কথা মনে আছে? যখন সাদা জার্সিতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগ উঁচিয়ে ধরেছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আর লুকা মদরিচ। সময়ের নিয়মে দুজনেই এখন ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে, কিন্তু নিজ নিজ দেশের ফুটবলে এখনো তাঁরা কতটা অপরিহার্য, টরন্টোর ম্যাচের আগে ফুটবল বিশ্ব যেন আরেকবার তা রোমন্থন করছে দুই তারকার শেষ দেখার জন্য।
বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশে কাল ভোর ৫টায় মুখোমুখি হচ্ছে পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া। এই মঞ্চে এর আগে কখনো দল দুটির দেখা হয়নি।
লড়াইয়ের আগে পরিসংখ্যানের খাতায় চোখ রাখলে অবশ্য ক্রোয়েশিয়ার জন্য তা এক বড় ভীতির নাম। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখন পর্যন্ত ১০ বারের দেখায় পর্তুগিজদের জয় যেখানে ৭টিতে, সেখানে ক্রোয়াটদের হাসি মাত্র একটি ম্যাচে, বাকি দুটি ম্যাচ শেষ হয়েছে ড্রয়ের অমীমাংসিত সমীকরণে।
ইউরোর মঞ্চে ১৯৯৬ সালে লুইস ফিগোর পর্তুগালের সেই ৩-০ গোলের জয় কিংবা ২০১৬ সালের শেষ ষোলোর অতিরিক্ত সময়ে রিকার্দো কারেসমার সেই হৃদয়ভাঙা গোলও মনে করিয়ে দিয়েছে ইতিহাস। ক্রোয়েশিয়ার জন্য সব সময় পর্তুগাল যেন এক চিরন্তন ধাঁধা। এমনকি সর্বশেষ ২০২৪ সালের নভেম্বরে নেশনস লিগের দেখাও শেষ হয়েছিল ১-১ ড্রয়ে।
তবে এবারের বিশ্বকাপে দুই দলের পথচলাই ছিল কিছুটা অম্লমধুর। ডিআর কঙ্গো ও কলম্বিয়ার সঙ্গে ড্র করে পর্তুগাল যখন গ্রুপ রানার্সআপ হিসেবে নকআউটে পা রাখল, তখন তাদের নিয়ে সমালোচকদের একটু নড়েচড়ে বসতেই দেখা গেছে। যদিও উজবেকিস্তানকে ৫-০ গোলে ওড়ানোর ম্যাচে রোনালদো দেখিয়েছেন নিজের চেনা ক্ষুধা, করেছেন জোড়া গোল। দলের ফরোয়ার্ড জোয়াও ফেলিক্স অবশ্য বাইরের এই আলোচনাকে গায়ে মাখছেন না একেবারেই। তিনি বলেন, ‘দুটি ম্যাচ ড্র করার মানে এই নয় যে আমরা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি। মানুষ শুধু শুধু অস্থির হচ্ছে, অথচ আমরা একদম শান্ত। ক্রোয়েশিয়ার শক্তি ও দুর্বলতাগুলো আমাদের ভালোই জানা, এখন শুধু সেগুলো মাঠে কাজে লাগানোর পালা।’ ফেলিক্স, ব্রুনো ফের্নান্দেস আর পেদ্রো নেতোদের নিয়ে গড়া পর্তুগিজ আক্রমণভাগ যেকোনো রক্ষণ ভাঙতে সক্ষম, যদি ভিতিনিয়া আর জোয়াও নেভেস মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেন।
প্রথম ম্যাচেই ইংল্যান্ডের কাছে হেরে টুর্নামেন্ট শুরু করা ক্রোয়েশিয়া যেন নকআউটের চেনা ঘ্রাণ পেয়েই জেগে উঠেছে। পানামা ও ঘানাকে হারিয়ে রানার্সআপ হওয়া ক্রোয়াটদের শক্তি এখনো সেই মাঝমাঠেই, যেখানে মদরিচের সঙ্গে আছেন মাতেও কোভাচিচ। ঘানার বিপক্ষে নিজের ২০১তম ম্যাচে মদরিচের সেই জাদুকরি অ্যাসিস্টই বলে দেয়, ৪০ বছর বয়সেও তিনি ফুরিয়ে যাননি। তবে দলের ওপর বয়ে যাওয়া সমালোচনার ঝড় কোচ জ্লাতকো দালিচকে কিছুটা ক্ষুব্ধ করেছে। ২০১৮ বিশ্বকাপে সেই রানার্সআপ হওয়ার সোনালি স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে দালিচ বলছেন, ‘মনে হয়, আমরা আট বছর আগের জায়গায় ফিরে এসেছি। তবে নকআউট পর্বে যাওয়ার প্রথম লক্ষ্য পূরণ করার জন্য এটি শুধু একটি ছোট পদক্ষেপ। হার বা জিত—যা-ই হোক না কেন, দেশের মানুষ ও দেশের জন্য এই ছেলেরা যা করেছে, তার জন্য তাদের ভালোবাসা উচিত। দল একটা ম্যাচ হারলেই তাদের বিপক্ষে চলে যাওয়া ঠিক নয়।’
ডালাসের টিকিট কেটে শেষ ষোলোয় স্পেন বা অস্ট্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার এই লড়াইয়ে কোনো পক্ষই এতটুকু ছাড় দেবে না। শক্তির বিচারে কিংবা ইতিহাসে পর্তুগাল এগিয়ে থাকলেও নকআউটের এই মঞ্চে পরিসংখ্যান শুধুই কিছু কাগুজে সংখ্যা। কারণ, খেলাটা যখন ফুটবল, তখন মাঠের ৯০ বা ১২০ মিনিটের গল্পটা তো কোনো জাদুকরি ছকে বাঁধা যায় না!








