চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাসিন্দা মোজাম্মেল হোসেন (৪৫)। ভাগ্য বদলাতে ১৯৯৯ সালে সৌদি আরবের মদিনা শহরে পাড়ি জমান। দীর্ঘ ২৭ বছরের প্রবাসজীবনে দেশে-বিদেশে দুই জায়গায়ই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। হয়েছেন বিত্তশালী। কিন্তু ২১ বছরের বিবাহিত জীবনে ছিলেন নিঃসন্তান। একে একে তিনটি বিয়েও করেছেন। সন্তানের বাবা হতে দেশ-বিদেশে ৩ স্ত্রীর চিকিৎসা করিয়েছেন। অবশেষে ফার্টিলিটিবিষয়ক চিকিৎসক এসএম খালিদুজ্জামানের অধীনে আইভিএফ পদ্ধতির চিকিৎসা নিয়ে ১২ জুন একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দিয়েছেন দ্বিতীয় স্ত্রী সুমী আক্তার।
মোজাম্মেল হোসেন মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, তিনি ২০০৫ সালে প্রথমে সাতকানিয়ার মেয়ে শামিমা আক্তারকে বিয়ে করেন। কিন্তু ২১ বছরেও কোনো সন্তান হয়নি। চিকিৎসকরা জানান, মোজাম্মেলের কোনো শারীরিক সমস্যা নেই। তাই স্ত্রী ও পরিবারের সম্মতিতে ২০১৫ সালে দাম্পত্য বিচ্ছেদ সুমি আক্তারকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এর আগে ২০০৫ সালে সুমির প্রথম বিয়ে হয়। বিয়ের ৯ বছরেও সন্তান না হওয়ায় ওই সংসার টেকেনি। মোজাম্মেলের সঙ্গে বিয়ের পর থেকে সন্তান নেওয়ার উদ্যোগ ওই দম্পতির। কিন্তু সফল হতে পারেননি। ২০২৫ সালে তৃতীয় বিয়ে করেন মোজাম্মেল। তৃতীয় স্ত্রী ময়না বেগম বিধবা কিন্তু দুই সন্তান আছে। তিন স্ত্রীর চিকিৎসা চলছে। এর মধ্যে গত বছর আইভিএফ পদ্ধতির চিকিৎসা নিয়ে গর্ভবতী হন দ্বিতীয় স্ত্রী সুমি। এতে ছেলেসন্তানের মা হতে সক্ষম হন।
মোজাম্মেল জানান, তিনি মদিনায় মসজিদে নববির পাশেই থাকেন। সেখানে নিজস্ব দোকান ও হোটেল ব্যবসা আছে। তিন স্ত্রী ছয় মাস করে বিদেশে তার সঙ্গে থাকেন। কোটি টাকার অর্থসম্পদ থাকলেও সন্তান না থাকায় ঘরটা অন্ধকার ছিল। স্বজনরা নানা কথা বলত। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। বর্তমানে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে সুখে আছেন। আরও সন্তানের আশায় অন্য দুই স্ত্রীও চিকিৎসা নিচ্ছেন।
জানা যায়, দেশে বন্ধ্যত্ব (ইনফার্টিলিটি) একটি ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসাবে দেখা দিলেও এ খাতে সরকারি উদ্যোগ এখনো সীমিত। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বর্তমানে ৪০ থেকে ৫০ লাখ দম্পতি কোনো না কোনোভাবে সন্তান ধারণে সমস্যার মুখোমুখি। দেরিতে বিয়ে, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, মানসিক চাপ, ধূমপান, জাঙ্কফুডের মতো অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নারী-পুরুষ উভয়ের শারীরিক জটিলতা বন্ধ্যত্ব বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, টানা এক বছর চেষ্টা করেও সন্তান ধারণে সক্ষম না হলে তাকে ইনফার্টাইল হিসাবে গণ্য করা হয়। নিঃসন্তান দম্পতিদের ৪০ শতাংশর ক্ষেত্রে স্বামী এবং ৪০ শতাংশের ক্ষেত্রে স্ত্রীর শারীরিক সমস্যা দায়ী। ১০ শতাংশের ক্ষেত্রে দুজনেরই সমস্যা থাকে। বাকি ১০ শতাংশের কারণ অজানা।
এ বিষয়ে গাজীপুরের শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ডা. উম্মে তানিয়া নাসরিন যুগান্তরকে বলেন, নারীদের ক্ষেত্রে বয়স বৃদ্ধি, টিউব ব্লক, পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ (পিআইডি), জরায়ুর টিউমার, পলিপ, অ্যান্ডোমেট্রিওসিস ও অ্যাডিনোমায়োসিস বন্ধ্যত্বের বড় কারণ। অন্যদিকে পুরুষদের ক্ষেত্রে শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া, গতি হ্রাস, গঠনগত ত্রুটি, এমনকি সম্পূর্ণ শুক্রাণুশূন্যতা (অ্যাজোস্পার্মিয়া) অন্যতম।
বিশেষজ্ঞদের অনুমিত হিসাব অনুযায়ী, দেশে বিবাহিতদের মধ্যে বর্তমানে বন্ধ্যত্বের হার ২০ শতাংশের বেশি। যদিও নিঃসন্তান দম্পতিদের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। দিন যত যাচ্ছে, এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
ভ্রূণতত্ত্ববিদ ও বাংলাদেশ ফার্টিলিটি হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. এসএম খালিদুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, দেশে অন্তত ১০ লাখ দম্পতি তথা ২০ লাখ নারী-পুরুষের আইভিএফ পদ্ধতির প্রয়োজন। বর্তমানে দেশে ১০০ জনকে আইভিএফ চিকিৎসা দেওয়া হলে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ সফল গর্ভধারণ হচ্ছে। আমাদের হাসপাতালে ফার্টিলিটি সমস্যা নিয়ে মাসে গড়ে পাঁচ হাজার দম্পতি আসে। যাদের বেশির ভাগ নারী পরবর্তী সময়ে গর্ভধারণ করেছেন। তিনি আরও বলেন, সরকারি ল্যাবের সংখ্যা ও সেন্টার বাড়ানো গেলে সহজেই চিকিৎসা নিয়ে সন্তানের মুখ দেখার সুযোগ পেত। এজন্য স্বাস্থ্য বিভাগের আরও বেশি উদ্যোগ দরকার।
তিন ধাপে চিকিৎসা : বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা সাধারণত তিন ধাপে দেওয়া হয়-মেডিকেশন, আইইউআই ও আইভিএফ। মেডিকেশন বা প্রাইমারি-এ ধাপে হরমোনাল ইঞ্জেকশন ও ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে গর্ভধারণের চেষ্টা করা হয়। ইন্ট্রা ইউটেরাইন ইনসেমিনেশন (আইইউআই)-এ প্রক্রিয়ায় ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির মাধ্যমে ওভারিয়ান ব্রিডিং করানো হয়। আইইউআই পদ্ধতিতে স্বামীর ক্ষেত্রে শুক্রাণুর পরিমাণ কম বা নিষ্ক্রিয় থাকলে শুক্রাণু সংগ্রহ করে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সক্রিয় করে স্ত্রীর গর্ভে স্থাপন করা হয়। বন্ধ্যত্বের সর্বাধুনিক চিকিৎসা হলো ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ)। বন্ধ্যত্ব নিয়েও নারীর মাতৃত্বের বাসনা পূর্ণ করার সুযোগ রয়েছে আইভিএফ-এর মাধ্যমে। এটি অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও সহজ পদ্ধতি। অনেকে আইভিএফকে টেস্টটিউব পদ্ধতি বলে থাকেন। আইভিএফ মাধ্যমে স্বামী থেকে নেওয়া শুক্রাণুর সঙ্গে ল্যাবরেটরিতে ডিম্বাণুর ফার্টিলাইজেশন করা হয়। এরপর উপযুক্ত সময়ে সেটি স্ত্রীর গর্ভে স্থাপন করা হয়।
সরকারি উদ্যোগ এখনো সীমিত : দেশে ৩৭টি সরকারি ও ৬৭টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রয়েছে। এছাড়াও প্রায় ছয় হাজার বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। যেখানে প্রজনন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত চিকিৎসাব্যবস্থা থাকলেও নিঃসন্তান দম্পতিদের জন্য আইভিএফ চিকিৎসাসেবা নেই বললেই চলে। এছাড়া প্রজনন সমস্যার চিকিৎসা ও পরামর্শের জন্য পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে রাজধানীতে পাঁচটি বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। এগুলো হলো-মোহাম্মদপুর ইনফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার, আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, মিরপুরে (লালকুঠি) মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (মাতুয়াইল) এবং শহীদ রমিজ উদ্দিন মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র (হাজারীবাগ)। তবে এগুলোর কোনোটিতেই আইভিএফ চিকিৎসাসেবা নেই। সরকারি পর্যায়ে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইনফার্টিলিটি সেন্টার চালু করা হয়েছে। এর বাইরে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) এবং সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) বন্ধ্যত্ব চিকিৎসা সেবা পাওয়া যায়। তবে চিকিৎসকদের অভিযোগ, অবকাঠামো থাকলেও ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে সরকারি আইভিএফ সেবার সফলতা প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞ সংকট : সংশ্লিষ্টদের মতে, সরাসরি এই খাতে কাজ করছেন এমন বিশেষজ্ঞের সংখ্যা ১০০ থেকে ১২০ জন। উচ্চতর প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসা পরিচালনায় অভিজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা আরও কম। এমবিবিএস পর্যায়ে বন্ধ্যত্ব বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা থাকলেও আধুনিক আইভিএফ, আইসিএসআই ও ক্লিনিক্যাল এমব্রায়োলজির মতো প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে চিকিৎসকদের বিদেশে প্রশিক্ষণ নিতে হচ্ছে।
পুরুষদের বন্ধ্যত্ব নিয়ে আলোচনা কম : ডব্লিইএইচও-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় প্রতি ৬ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন জীবনের কোনো-না-কোনো সময়ে বন্ধ্যত্বের সমস্যায় ভোগেন। সাম্প্রতিক সময়ে পুরুষদের মধ্যে ওবেসিটি, মানসিক চাপ, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, রাত জাগা এবং অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের কারণে বন্ধ্যত্বের ঝুঁকি বাড়ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
বিদেশমুখী চিকিৎসায় চলে যাচ্ছে কোটি টাকা : তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ বাংলাদেশি দম্পতি বন্ধ্যত্ব চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন দেশে যান। ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, জাপান এক্ষেত্রে জনপ্রিয় গন্তব্য। ব্যয়বহুল হওয়ায় খরচ সামলাতে পারে না ৬০ শতাংশ দম্পতি।
বেসরকারি খাতে বিস্তার : বর্তমানে দেশে ১৮ থেকে ২০টি বেসরকারি আইভিএফ সেন্টার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানে আইভিএফ চিকিৎসার সফলতার হার আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বলে দাবি করা হয়। তবে রোগীর বয়স, ডিম্বাণুর মান এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ওপর সফলতার হার নির্ভর করে।
প্রয়োজন সমন্বিত নীতি : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবার পরিকল্পনার পাশাপাশি বন্ধ্যত্ব সমস্যাকেও জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে বিবেচনা করা উচিত। নিঃসন্তান দম্পতিদের দিন কাটে মানসিক কষ্টে। সরকারি হাসপাতালগুলোয় বিশেষায়িত ইনফার্টিলিটি ইউনিট চালু, দক্ষ জনবল তৈরি, আইভিএফ সেবার সম্প্রসারণ এবং চিকিৎসা ব্যয় কমাতে কর সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে লাখো নিঃসন্তান দম্পতি উপকৃত হবে।








